রম্য রচনা

আমরা কি আসলেই এত স্লো?

এই পৃথিবীতে সবই হচ্ছে গতির খেলা। এক কথায়, পুরো বিশ্বটাই গতিশীল। এই যেমন ধরুন, পৃথিবী নিজেই তো ঘুরছে! ফলে কমলালেবুর মতো চ্যাপ্টা এই গ্রহে থাকা প্রাণিগুলোর পক্ষেও আর স্থির হয়ে বসে থাকার উপায় নেই। এমন এক অলটাইম দৌড়ের ওপর থাকা পৃথিবীতেই আমরা নাকি সবচেয়ে স্লো!

আমেরিকার ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর নাকি এখন ঢাকা। ১৫২ দেশের ১২০০টির বেশি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান এখন ধীরগতির দিক থেকে সবার ওপরে। ঢাকা ছাড়াও বাংলাদেশের দুই শহর—ময়মনসিংহ (৯ম) ও চট্টগ্রাম (১২তম) রয়েছে ধীরগতির শহরের তালিকায়। এই তালিকায় রয়েছে ভারতের কলকাতা, মুম্বাইসহ আটটি শহর। অর্থাৎ, বাঙালিদের প্রধান দুই শহরই আছে ধীরগতির শহরের তালিকায়। তবে কি গতির সমস্যা বাঙালিদের মজ্জাগত?

হতেও পারে। ভাত-ঘুমের মতো শব্দ যে বাংলায় এত বহুল প্রচলিত, সেখানে এই গতির সমস্যা হলেও হতে পারে। সত্যি বলতে কি, ভাত খেয়ে জব্বর একটা ঘুম দিতে কার না ইচ্ছে হয়! কিন্তু ওই, ভাত জোটাতে গিয়ে ঘুমই উবে যায়।

তা যতই ঘুম উবে যাওয়া নিয়ে দুঃখ করি না কেন, গবেষণা বলছে–ঢাকার আমরাই গতিতে সবচেয়ে পিছিয়ে। তাই দুঃখ করাটা আসলে জায়েজ না। যদিও গবেষণায় গাড়ির গতি নিয়েই আলোচনা হয়েছে। জানা গেছে, তিন লাখের বেশি মানুষের বসবাস রয়েছে, এমন সব শহরে গাড়িতে বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে কত সময় লেগেছে, সেই তথ্য গুগল ম্যাপ থেকে সংগ্রহ করে গবেষকেরা বিশ্লেষণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে যাতায়াতের তথ্য নেওয়া হয়েছে। তবে যতই গাড়ির গতির হিসাব নেওয়া হোক না কেন, গাড়ি তো মানুষই চালায়। যে চালায়, তার জন্যই তো গতি বেশি বা কম হবে– নাকি? যদি না গাড়ির ব্রেক ফেল হয়!

সুতরাং গাড়ির ওপর দোষ চাপিয়ে ঢাকা শহরের মানুষদের ‘তাইরে নাইরে না’ করার সুযোগ নেই একেবারেই। প্রথমেই তাই এই শহরের মানুষদের গতি কতটা, সেই সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়। এই তো কিছুদিন আগে এক বেসরকারি ব্যাংকে গিয়েছিলাম একটি কাজে। সেখানে গিয়ে জানলাম, একটি নির্দিষ্ট ডেস্কে ওই কাজটি করা যাবে। সেখানে যেতেই ব্যাংকের লোক বেশ ব্যস্ত হয়েই বসতে বললেন। এমন একটা ভাব, যেন দ্রুতই কাজটি সমাধা হয়ে যাবে। এটি ভেবে মনেও বেশ আনন্দ হলো। দ্রুত কাজ শেষ করতে কে না চায়! তবে এরপর বসেই থাকতে হলো প্রায় ৩০ মিনিট। তারপর ডেকে দেওয়া হলো নির্ধারিত ফরম। তা পূরণে গেল আরও ১৫ মিনিট। আর সেই ফরম পূরণ করার পর বলা হলো, ওই নির্দিষ্ট কাজটি করার জন্য যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিয়োগ করা আছেন, তিনি নাকি অফিসের বাইরে আছেন! আরও ৩০ মিনিট বা কয়েক ঘন্টা বসতে বলার অনুরোধ এলো কাঁচের ওপার থেকে। একবার ভাবুন এখন, কেমনটা লেগেছিল তখন!

ওই কাজটি যেকোনো ব্যাংকেই করা যায়। কিন্তু এক দোকানদার কি আর তার খদ্দেরকে অন্যের দোকানে পাঠাতে চায়? ফলে সত্য জানাতে এতটা গড়িমসি!

আমাদের দেশের এক মানুষ আরেকজনকে এভাবেই টেনে ধরেন। কমিয়ে দেন গতি। যদি মানুষের গতিই এভাবে কমে যায়, তবে গাড়ির কি অবস্থা হয় - তা তো সহজেই অনুমেয়। দোষ তবে কাকে দেবেন – মানুষ নাকি গাড়িকে?

সুবিধা হলো, গাড়ির ওপর দোষ চাপালেও তার পক্ষে প্রতিবাদলিপি পাঠানো কঠিন। জায়গা কম বলে রাস্তার ঘাড়েও দোষ চাপিয়ে দেওয়া যায় নির্দ্বিধায়। কিন্তু সবকিছুর নাটের গুরু মানুষ মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। আর যদি নাটের গুরুরা নেতাগোছের কেউ হন, তবে তো কথাই নেই।

তাই বলে, সব পরিস্থিতিতেই যে আমরা স্লো মোশনে চলি, বিষয়টি কিন্তু তেমন নয়। ধরুন, কোথাও দুই পক্ষে ঝগড়া বেঁধে গেল। সেক্ষেত্রে দেখবেন, অনেকেই ঝগড়াস্থলের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কোনো কাজ ছাড়াই। কেউ কেউ পক্ষে-বিপক্ষের আগুনে ঘি ঢালতে থাকে সময়ে-সময়ে। সেক্ষেত্রে কিন্তু কারও আলসেমি দেখাই যায় না। আসলে, আমরা সেই কাজকে কর্তব্যজ্ঞান করি কিনা!

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটি প্রচলিত গল্প। প্রচলিত কাহিনীর সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন। তবে আসল বিষয় হলো হোজ্জার গল্পে থাকা শিক্ষা। হোজ্জা নাকি একদিন একটা রাজহাঁস বেশ ভালোভাবে রান্না করে উপহার হিসেবে নিয়ে যাচ্ছিলেন বাদশার দরবারের দিকে। কিন্তু পথিমধ্যে রান্নার সুঘ্রাণে হোজ্জা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। খেয়ে ফেললেন রাজহাঁসের একটি পা। হাঁস-মুরগির লেগ পিস পেলে কে আর ফেলে রাখে!

কিন্তু সমস্যা হলো বাদশাহর দরবারে গিয়ে। হোজ্জা এনেছেন বলে বাদশাহ নিজেই ঢাকনা খুলে রান্না চাখতে গেলেন। আর পেলেন একটিমাত্র পা। হোজ্জাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাঁসের পা একটি কেন?’

হোজ্জা তো পড়লেন বিপদে। কিন্তু বিপদ বুঝে পালিয়ে যাওয়ার লোক তো তিনি নন। বুদ্ধি করে পাশের হ্রদে থাকা রাজহাঁসগুলোকে দেখিয়ে বললেন, ‘হুজুর দেখুন, এই হাঁসগুলোরও একটাই পা।‘

বাদশাহও কম যান না। ততদিনে হোজ্জার চালাকি চেনা হয়ে গেছে তাঁর। আসলে সে সময় হাঁসগুলো এক পা গুটিয়ে অন্য পায়ে ভর করে দাঁড়িয়েছিল। তাই বাদশাহ একজন প্রহরীকে বললেন, রাজহাঁসগুলোকে লাঠি দিয়ে তাড়া দিতে। আর লাঠির তাড়া খেয়ে রাজহাঁসগুলো দুই পায়ে ভর দিয়ে দৌড়ে পালাল।

বাদশাহ এবার বললেন, ‘হোজ্জা, দেখলে তো, ওদের দুটো করে পা।’

হোজ্জা কি আর থেমে যাওয়ার মানুষ? তাঁর ত্বরিৎ জবাব, ‘হুজুর, ওরা তো সামান্য হাঁস। এভাবে লাঠি দিয়ে তাড়া করলে আমারও দুই পায়ের জায়গায় গজাত চার পা!‘

আমাদের অবস্থাও একেবারে সেই রকমই। তাড়া খেলে আমরা সবাই সোজা। অর্থাৎ, পেছনে রকেট লাগালে আমরা চাঁদেও যেতে পারি নির্দ্বিধায়। প্রয়োজনে আলোর গতিতে ছোটাও আমাদের জন্য অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু উপযুক্ত তাড়া তো আর সব সময় আসে না। 

এই সবকিছু মাথায় নিলে বলতেই হয়, আমরা কিছুটা স্লো বটে। তবে সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ধীর কিনা, সেটি একটু বিবেচনা করা উচিত। এ নিয়ে মন খারাপেরও কিছু নেই। কারণ প্রবাদে তো আছেই, স্লো অ্যান্ড স্টেডি উইনস দ্য রেস। রেস জেতা নিয়ে হলো কথা। স্লো হয়ে যদি রেস জেতা যায়, তবে মন্দ কী!

সমস্যা একটাই। স্লো মোশনে চলে কোন রেসে আসলে আমরা জয়ীর তকমা পাচ্ছি, সেটা খুঁজে বের করাই আসল চ্যালেঞ্জ। ওই খোঁজাখুজিতেও নিশ্চয়ই আমাদের গতি ধীর। অবশ্য সাহায্য নেওয়া কোনো বদভ্যাস নয়। কোনো জ্ঞানী-গুণী এ ব্যাপারে আমাদের চোখ খুলে দিলেই, এখন রক্ষা।