সব কথা সব সময় প্রকাশ্যে বলা যায় না। আবার হয়তোবা যায়, কিন্তু মানুষই চায় না বলতে। তখন প্রয়োজন হয় একটু আড়ালের, কেউ ডাকে একটু তফাতে। কারও থাকে গোপন আলাপ, কারও আবার থাকে শুধুই প্রলাপ। কেউ কেউ অবশ্য টুপিও পরাতে চায়! কারণ ওয়ান টু ওয়ান আলাপে মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া যায় সহজে।
এসব থেকেই শুরু নতুন বাহাস। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন বিতর্ক উঠেছে। বলা হচ্ছে বা প্রকারান্তরে কেউ কেউ দাবি করছেন, বেচাকেনার পেজে নাকি ‘ইনবক্সে আসুন’ বলা বেআইনি! অর্থাৎ, দাম জানতে চাইলে ক্রেতাকে নাকি ইনবক্সে আসতে বলা যাবে না। যদিও সংবাদমাধ্যমের খবর পড়ে যতটুকু বোঝা গেল যে, এ ধরনের বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে আইনে উল্লেখ নেই। তারপরও এ নিয়ে আলোচনা চলছেই।
ইনবক্সে আসা নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ হলো, কমেন্টে দাম জানিয়ে দিলে তাদের ইনবক্স ভারী হয় না। নইলে আবার মেসেঞ্জার বা হোয়্যাটসঅ্যাপে যেতে হয়, বক্সে আলাপ বাড়ে। নতুন থ্রেডও তৈরি হয়। বিক্রেতারা সেটাই চান, তাতে তাদের এনগেজমেন্ট বাড়ে। ফেসবুকে ব্যবসা করতে নেমে, জাকারবার্গের নিয়মেই তো চলতে হবে। নইলে কি আর পাত্তা মিলবে?
সব মিলিয়ে দুই পক্ষেই যুক্তি আছে, যার যার কারণও আছে। আর এসবের মধ্যেই তৃতীয় পক্ষ ঢুকে সুন্দর বিতর্ক তুলে দিল। দাবি করল ‘ইনবক্সে আসুন’ বলা বেআইনি। তা নিয়ে বাহাস হলো, কার্ড শেয়ার হলো দেদারসে। আর ঠিক এভাবেই সুযোগ বুঝে জাকারবার্গের নিয়ম মেনেই লাইক, শেয়ার, কমেন্ট কামিয়ে নেওয়া হলো! এ যেন দুই বন্ধুর মাঝখানে বাম হাত ঠেলে দেওয়া সেই তৃতীয় পক্ষ, যে কিনা দুই বন্ধুর মধ্যে ঝামেলা বাঁধিয়ে কামিয়ে নেয় অশেষ মুনাফা।
এ প্রসঙ্গে বীরবলের একটি গল্প বলা যায়। প্রচলিত আছে, সম্রাট আকবর একদিন বীরবলকে এক অদ্ভুত আদেশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর রাজ্যের সব বেকুব মানুষের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে। বীরবল ছিলেন অনুগত রাজকর্মচারী। তাই ‘যথা আজ্ঞা মহারাজা’ বলে সে তালিকা তৈরি করা শুরু করে দিল।
ক্যাঁচাল শুরু হলো এর পরই। কারণ সেই তালিকায় সবার ওপরে লেখা আছে সম্রাটের নাম। আর তা দেখেই বিষম রেগে গেলেন সম্রাট। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার নাম সবার ওপরে কেন?’ তখন বীরবলের তাৎক্ষণিক উত্তর ছিল, ‘যে বেকুব খুঁজতে যায়, সে হলো সবচেয়ে বড় বেকুব!’
তো, আমাদের অবস্থাও অনেকটা তেমনই। ইনবক্সে যাওয়া ও না যাওয়া—উভয় পক্ষের মানুষই অন্যদের বেকুব ভেবে তৃতীয় পক্ষের কাছে বেকুব হয়ে গেল। এভাবে আমরা প্রায়শই বেকুব বনে যাই। কখনো বুঝি, আবার কখনো বুঝতেই পারি না। বেকুবের ধর্মই অবশ্য এটা!
তাহলে কি ‘ইনবক্সে বসুন’ বলা যাবে? দেখুন, এই বিকল্প প্রস্তাব কিন্তু মন্দ নয়। এতে অতিথিকে সম্মান করাও হলো, আবার ক্রেতাকে একটু তোয়াজও করা গেল। সেক্ষেত্রে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে বা হোয়্যাটসঅ্যাপে ইনস্ট্যান্ট মেসেজ হিসেবে শুরুতেই একটি টুলের ছবি দিয়ে রাখতে হবে। অর্থাৎ, ইনবক্সে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে যেন টুল পেয়ে যান একজন ক্রেতা। ফুলের স্টিকারও দিয়ে রাখা যায় কমপ্লিমেন্ট হিসেবে। আর আলাপচারিতার পর যদি উপহার হিসেবে পরিবেশ রক্ষাকারী গাছের স্টিকার দেওয়া যায়, তবে তো মার ডালা!
সুতরাং, আজ থেকে না হয় ‘ইনবক্সে আসুন’ বলা বন্ধ করে ফেলুন। এর বদলে চালু হোক—‘ইনবক্সে বসুন’। এতে বিতর্কও কমবে, আবার নতুন এক ধরনের বসাবসির সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। তাতে হৃদ্যতা বাড়তেও পারে। আর কে না জানে, বাঙালি একবার বসে গেলে, তাকে দাঁড় করানো খুবই কঠিন!