১৮৫৭ সালে আমেরিকাতে সুতা কাটার কারখানার নারী শ্রমিকরা তাদের মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টায় সমমজুরির দাবিতে রাস্তায় নামেন। এমন আন্দোলন পরে একই দেশের নিউইয়র্কে হয়েছে ১৯০৯ সালে। এখনকার মতো তখনো শোষক শ্রেণি আন্দোলন বন্ধ করতে তাদের মিছিলে হামলা করে। পরবর্তীকালে সেই প্রতিবাদী নারীদের স্মরণেই মূলত নারী দিবসের ইতিহাস, নারী দিবসের সূচনা।
আমেরিকার মতো এ দেশের নারী শ্রমিকেরাও প্রতিনিয়ত মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তেমনি একজন রেহানা বেগম। তিনি সুতা কাটার কারখানার কাজ করেন। রেহানা বেগম কতটুকুই–বা জানেন নারী দিবস সম্পর্কে। নারী দিবসের প্রতিপাদ্য আর কতটুকু প্রভাব ফেলে রেহানা বেগমের কর্মময় জীবনে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্চানগরে জন্ম রেহানার। ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে বড় বোনের কাছে মানুষ হন। রেহানার কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়, যখন তাঁর বড় বোন বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির অত্যাচারে আত্মহত্যা করেন। শুরু হয় রেহানার জীবনের কঠিন লড়াই।
বেঁচে থাকার তাগিদে ১৯৯৩ সালে বাঞ্চানগরের আয়নাল হককে বিয়ে করে ঢাকায় আসেন। ঢাকার গোড়ানে থাকা শুরু করেন। সে সময় রামপুরার সুয়িং ফ্যাক্টরিতে তিনি কাজ পান। সেখানে সুতা কাটার কাজ দিয়ে শ্রম বিক্রি শুরু করেন। তাঁর স্বামী আয়নাল হকও হেল্পার হিসেবে যোগ দেন একই কারখানায়। কিন্তু এত স্বল্প বেতনে সংসার চালানো কষ্টকর বলে স্বামী আয়নাল হেল্পারের কাজ ছেড়ে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন।
রেহানা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ থেকে দক্ষতর হয়ে ওঠেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেহানা বেগমের দক্ষতা বাড়লেও বাড়েনি তাঁর শ্রমের মজুরি। ছোট সোয়েটার ফ্যাক্টরি রূপান্তরিত হয় বিশাল কারখানায়। কারখানারও অনেক উন্নতি হয়, নতুন নামকরণ হয়। ছোট সুয়িং কারখানা একপর্যায়ে বড় ড্রাগন সোয়েটার কারখানায় পরিণত হয়। শুধু অপরিবর্তিত থাকে রেহানার মতো শ্রমিকদের জীবন।
এই কারখানায় রেহানা যখন প্রথম সন্তানসম্ভবা হন, তখন তিনি জানতেন না মাতৃত্বকালীন ছুটি কী। কারণ তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি পাননি। প্রথম সন্তানকে বাঁচাতেও পারেননি। পরে সন্তান হারানোর শোক নিয়ে আবারও কাজে যোগ দেন। এত বড় কারখানায় তিনি একদিনও বোনাস পাননি। বরং নারী হওয়ার কারণে পেয়েছেন কম মজুরি। কম আয়ের কারণে সন্তানদের বেশি দূর পর্যন্ত পড়াতে পারেননি। বড় ছেলে স্কুলে না গিয়ে রাজমিস্ত্রীর কাজ শুরু করেন। আর বড় মেয়ে সংসার চালানোর জন্য ছোট ছোট কারখানা থেকে পোশাক এনে সুতা কাটার কাজ করেন।
২০১৮ সালে রেহানা বেগমের স্বামী আয়নাল হক ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হন। তাই সংসারের সবাই কারখানায় কাজ করা শুরু করেন। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় ২০২০ সালের করোনা মহামারি। অনির্দিষ্টকালের লকডাউনে অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষের মতো অভাবে পড়ে রেহানা বেগমের সংসার। বাধ্য হয়ে তিনিসহ ড্রাগনের শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। কিন্তু মালিকপক্ষ পাওনাই বুঝিয়ে দেননি। দীর্ঘ সাতাশ বছর শ্রম বিক্রি করে সে কারখানা থেকে পান মাত্র চার হাজার টাকা!
রেহানা দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকার পর নন্দীপাড়ার ছোট্ট পোশাক কারখানায় নতুন করে সুতা কাটার কাজে যোগ দেন। একই সময়ে তাঁর ছোট মেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করে। সেই মেয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর পড়াশোনার পাশাপাশি সুতা কাটার কাজ শুরু করে। এক শ জামার সুতা কেটে দুই টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও আয় হয় এক টাকা! বাকি অর্ধেক টাকা মালিক রেখে দেয়।
রেহানা বেগমের বয়স এখন ৪৩ বছর। বয়সের কারণে এখন সুতা কাটতে কাটতে দু–হাত ভার হয়ে আসে। তবু এখনো সুতা কেটে যাচ্ছেন। কিন্তু অভাব–অনটনের সুতার বাঁধন কাটতে পারেনি। তাঁর এই দীর্ঘজীবনে গতবছর এক অনুষ্ঠানে গিয়ে নারী দিবস সম্পর্কে জানেন। তাঁর মতে এই দিবসটা তো তাঁদেরই। কিন্তু করপোরেট বা মধ্যবিত্ত নারী সমাজে ঘটা করে নারী দিবস পালিত হলেও, যাদের হাত ধরে, যাদের অধিকারের জন্য, যারা মূলত প্রথম নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়েছিল, তাঁদের নারী দিবস কেটে যায় আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই।