সমাজ গঠন বা সমাজ পরিবর্তন এবং ইতিহাসের নানা বাঁকে নারীরা বরাবরই রেখে গেছেন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। আমাদের সমাজব্যবস্থা মূলত পুরুষতান্ত্রিক। জাতিসংঘের উদ্যোগে বছরে একটি দিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। হ্যাঁ, দিনটি আমাদের অনেকেরই জানা—‘৮ মার্চ,আন্তর্জাতিক নারী দিবস’। এ দিনটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পালিত হয়ে এলেও জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা মারফত স্বীকৃত হয়েছে ৪৯ বছর হলো।
এই দিনে অনেক দেশের অফিস এবং অন্যান্য পাবলিক স্থানে গোলাপি এবং বেগুনি রং শোভা পায়। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নারীর সমঅধিকার, সমসুযোগ, এগিয়ে নিতে হোক বিনিয়োগ’। তবে, অনেকেই জানেন না কার হাত ধরে এসেছিল দিবসটি।
শ্রেণি সংগ্রামের লড়াইয়ে নারী নেতৃত্বের এক অসাধারণ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন ‘ক্লারা জেটকিন’। তিনি ছিলেন জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক এবং ‘নারী অধিকার’ আন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী। তিনিই মূলত আজকের এই নারী দিবসের প্রবক্তা।
চলুন জেনে নেওয়া যাক এই কিংবদন্তি নারী সম্পর্কে কিছু কথা—
জার্মানির ছোট গ্রাম সাক্সসনায় ১৮৫৭ সালের ৫ জুলাই জন্ম হয় ক্লারা জেটকিনের। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। বাবা গটফ্রেড আইজেনার ছিলেন স্কুলশিক্ষক ও ধর্মপ্রাণ প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ সংগঠক ও দক্ষ বেহালা বাদক। মা জোসেকিন ভেইটালে আইজেনার একজন প্রগতিশীল নারী। এমন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই ক্লারা জেটকিন বড় হয়েছেন।
স্কুল কলেজের পড়ার ফাঁকে তিনি নানা রকম বই পড়তেন। বায়রন, ডিকেন্স, শেক্সপিয়র, শিলার, প্যাটে, হোমারসহ আরও অনেকের লেখা তিনি নিয়মিত পড়তেন। এরই মধ্যে ১৮৭৪ সালের দিকে জার্মানির নারী আন্দোলন ও শ্রম আন্দোলনের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়েন। মাত্র ২১ বছর বয়সেই তিনি জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভ্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
এরপর ১৮৭৮ সালে বিসমার্ক জার্মানিতে সমাজতান্ত্রিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে জেটকিন প্রথমে সুইজারল্যান্ড ও পরে প্যারিসে নির্বাসিত হন। সেখানে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সংগঠন গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৮৯০ সালে তিনি আবার জার্মানিতে ফিরে এসে যুক্ত হন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে প্রকাশিত নারীদের অধিকারবিষয়ক ডাই গ্লাইসাইট (সমতা) পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে।
পত্রিকাটি খুব দ্রুতই নারীদের অধিকার আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সমাজ ও পরিবারে নারীদের ভঙ্গুর অবস্থান ও নানান বৈষম্য, পুরুষের সমানতালে কাজের অধিকার ও সমান মজুরি, রাজনৈতিক অধিকার, নারীর প্রতি নির্যাতন-নিপীড়ন ইত্যাদি বিষয়ে পত্রিকাটিতে নিয়মিত লেখা প্রকাশ হতে থাকে।
এরপর ১৯১০ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কর্মজীবী নারী সম্মেলন হয় কোপেনহেগেন শহরে। এ সভায় ১৭টি দেশের শতাধিক নারী-প্রতিনিধি যোগ দেন। সম্মেলনে জেটকিনসহ অন্যান্য নারী নেত্রীরা নারীদের অধিকার ও মুক্তির লড়াইয়ের প্রতি সম্মান জানাতে বছরের একটি দিন ছুটি রাখার আহ্বান জানান। সেখানে ক্লারা আন্তর্জাতিক নারী দিবসের একটি খসড়া প্রস্তাব দেন।
এই প্রস্তাবেরও ছিল প্রেক্ষাপট। সেটা আমেরিকার নিইউয়র্কে। সেখানকার পোশাক কারখানার শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিলেন নারী। এর মধ্যে অনেকেই আবার শিশু–কিশোরী। শুধু নারী হওয়ার কারণেই তাদের মজুরি ছিল কম। সঙ্গে কারখানার কর্মপরিবেশ ছিল ভয়াবহ। পাশাপাশি ছিল না কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা। এমনই এক প্রেক্ষাপটে শ্রমিক সংকট নিয়ে চলমান এক সভায় নেতৃবৃন্দের মুখস্ত বক্তৃতার মধ্যেই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এক নারী। তাঁর নাম—ক্লারা লেমলিখ। সময়টা ছিল ১৯০৯ সালের ২২ নভেম্বর। তিনিই ডাক দেন ধর্মঘটের। এ ডাকে সাড়া দেন হাজার হাজার নারী শ্রমিক। তাঁদের মিছিল, সমাবেশে চলে পুলিশি নিপীড়ন। এক ক্লারা লেমলিখই বহুবার গ্রেপ্তার হন। এ আন্দোলন চলে একটানা। ১৯১০ সালেও এই আন্দোলন জারি ছিল।
এমনই এক প্রেক্ষাপটে ক্লারা জেটকিন প্রস্তাব করলেন, ‘প্রতি বছর একই দিনে প্রত্যেকটি দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্যাপন করতে হবে।’ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বর্তমানে সারা বিশ্বে ১৯১১ সাল থেকে ৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে। তবে শুরুতে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো; অর্থাৎ, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে এই দিবস পালিত হতো। পরে ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষে দিবসটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘ।
এদিকে ক্লারা ইকুয়ালিটি নামের নারী বিষয়ক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৯২০ সালে তিনি কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামে নারীর ভূমিকা ও তার শ্রেণিসংগ্রাম এবং নারীমুক্তি ইত্যাদি সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করেন। উত্তরও পেয়েছেন যথাযথ। ১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানিতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করলে ক্লারা জেটকিন মস্কোতে নির্বাসিত হন। ১৯৩৩ সালের ২০ জুন তিনি মস্কোতেই মারা যান। মস্কোর ক্রেমলিনে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
নারী মুক্তির জন্য ক্লারা জেটকিন আজীবন লড়াই করে গেছেন। নারীদের যে সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে, সেটিকে তুলে ধরে তা প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে একটি সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। আর সে লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল মেহনতি মানুষের মুক্তির সঙ্গে নারীর মুক্তিও যে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, সেই বার্তা ও সংগ্রামকে ছড়িয়ে দিতে আজীবন লড়াই করেছেন সুদৃঢ়ভাবে।


রেহানা বেগমের নারী দিবস
সাড়ে ৪ লাখ নারী উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন বুনছেন যিনি
বাংলাদেশে ৮ মার্চ : যে কারণে আজও প্রাসঙ্গিক
লড়াইটা নারীর একার নয়
