সম্প্রতি পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ বড় আকার ধারণ করেছে। গত সপ্তাহে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার ফি বাড়ানোর প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে বেলুচিস্তান স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স। বেলুচিস্তান প্রদেশে চীন-সমর্থিত বিমানবন্দর প্রকল্পের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষদের অসন্তোষ বাড়ছে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
তবে, অনেক আগে থেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জেরে ফুঁসে উঠে বেলুচ সমাজ। সেখানে প্রতিবাদ করলেই গুম করা হতো। এই দমবন্ধ সমাজে অন্ধকারে ডুবে থাকা লাখো মানুষকে সংঘবদ্ধ করার জন্য যারা এগিয়ে এসেছেন, তাদেরই একজন মাহরাং বালুচ।
সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে বলছে, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের একটি বন্দরনগরীতে চালু হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এটি নির্মাণে সরাসরি চীন যুক্ত। দুই দেশের অর্থনৈতিক করিডরের অংশ হিসেবেই এটি বানানো হয়েছে। কিন্তু এই এলাকার অনেকেই প্রকল্পটির বিরোধিতা করছেন। সম্প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগত বেলুচরা প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের অভিযোগ তুলে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করেছে।
এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানবাধিকার সংস্থা বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (বিওয়াইসি) বলছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয়দের সম্পদ নষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে সরকার। এ জন্য সবাই রাস্তায় নেমেছে।
বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটির (বিওয়াইসি) নেতা মাহরাং বালুচ বলেন, ‘পাকিস্তান সরকার হাজার হাজার বেলুচকে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আমরা এসব গণহত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছি।’
মাহরাং মনে করেন, এটি তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। অবশ্য মাহরাংয়ের নিজের পরিবারও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভুক্তভোগী। ফলে এই আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সংশ্লেষ রয়েছে। তবে, পাকিস্তানের পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ৩১ বছর বয়সের এই অ্যাক্টিভিস্টের নেতৃত্ব দেওয়াটা খুব একটা সহজ ছিল না।
আন্দোলনের যুক্ত থাকার কারণ হিসেবে মাহরাং বালুচ বলেন, ‘আমি নিজেও এই দমনপীড়নের অন্যতম বলি। ২০০৬ সালে আমার বাবাকে অপহরণ করা হয়। এরপর ২০০৯ সালে মুক্তি দেওয়া হলেও ছয় মাস পর আবার তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর দুই বছর পর ২০১১ সালে আমরা বাবার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পাই।’
পাকিস্তানের সাংবাদিক নাজির মাহমুদ। তিনি সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতৃত্ব বদল প্রসঙ্গে বলেন, ‘নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বেলুচিস্তান একটি পরিবর্তন দেখেছে। গত ২৫ বছরে একের পর এক গুমের ঘটনার পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। এই ক্ষেত্রটিতে নারীদের চেয়ে পুরুষদের অনেক বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।’
নাজির মাহমুদ বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, এখানকার নারীরা অনেক বেশি অসহায়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ নারীরই দাবি, তাঁদের স্বামীর অপহরণ শিকার কিংবা তাদের জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। তাই আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক নারী অংশ নিয়েছে।
নাজির মাহমুদের বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট করে জানা যায় সেটি হলো, পাকিস্তানের সাবেক স্বৈরশাসক মুহাম্মদ জিয়া-উল-হকের সামরিক শাসনামলেও অনেক নারী ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন একটি উইমেন অ্যাকশন ফোরামও ছিল। আশির দশকের শুরুতে সামরিক স্বৈরতন্ত্র এবং নারীদের দমিয়ে রাখার যেসব আইন ছিল, সেসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন নারীরা। প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদও করেন তারা।
এই সাংবাদিক মনে করেন, মাহরাংও অধিকারবঞ্চিত নারীদের প্রেরণা যোগাবে। এখানকার নারীরা মাহরাংকে দেখে প্রতিবাদ করতে শিখেছে। মাহরাং তাদের প্রেরণায় কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এখন পর্যন্ত তিনি বহু নারীকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। শুধু বেলুচিস্তানেই নয়, আমার মনে হয় মাহরাং অন্যান্য প্রদেশের নারীদের জন্যও অগ্রদূত হয়ে উঠছেন। মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও সম্মুখে এসেছেন মাহরাং। তাই তাকে অভিবাদন জানায়। তিনি সাহসী, আমাদের সমাজে এমন সাহসী নারীদেরই প্রয়োজন।’
মাহরাংয়ের প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে কারিমা বালোচের নামও চলে আসে। বেলুচিস্তান প্রদেশে জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন এই মানবাধিকার কর্মী। সরকার কর্তৃক সন্ত্রাসের অভিযোগ দায়ের হলে প্রাণ বাঁচাতে তিনি কানাডায় আশ্রয় নেন।
২০২০ সালে নিখোঁজ হয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন কারিমা। টরোন্টো লেক থেকে উদ্ধার করা হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও সরকারের কঠোর সমালোচক ৩৭ বছর বয়সী কারিমাকে। সমর্থক ও পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ উঠলেও টরোন্টো পুলিশ এমন কোনো প্রমাণ পায়নি বলে জানায়।
তবে, মাহরাং বালুচের প্রতিবাদের সঙ্গে একমত পোষণ করেন না সাউথ এশিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্ট্যাবিলিটি ইনস্টিটিউশনের মহাপরিচালক মারিয়া সুলতান।
তাঁর মতে, মাহরাং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। অভিযোগ, ভুল ভ্রান্তি, রাষ্ট্রীয় ত্রুটির সংশোধন দরকার। কিন্তু তিনি এজন্য যে পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। মাহরাং বালোচেরও এটি বোঝা উচিত যে, নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে সাধারণ মানুষের জীবনকে তিনি ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন না। আর যদি তিনি তা করেই থাকেন, তাহলে এর দায়ও নিতে হবে।
অবশ্য মাহরাং তাঁর প্রতিবাদ আর বিক্ষোভ অব্যাহত রাখবেন বলে ডয়েচে ভেলেকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বেলুচিস্তানের প্রতিটি পরিবার স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে চায়, তারা জীবনে উন্নতি করতে চায়। আমরা পাকিস্তান সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছি। আমরা বেলুচদের প্রতি চলমান সমস্ত দমনপীড়ন, হত্যা, আর গুমের অবসান চায়।’
আরও পড়ুন: