বেগম রোকেয়া দিবস

কালি দিয়ে কি ইতিহাস মুছে ফেলা যায়?

আজ ৯ ডিসেম্বর, বেগম রোকেয়া দিবস। নারী জাগরণে অগ্রদূত বেগম রোকেয়া। তাঁর পুরো নাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তবে, তিনি সবার কাছে বেগম রোকেয়া নামেই বেশি পরিচিত। আজ এই মহীয়সী নারীর জন্ম ও মৃত্যুদিন। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন। এর ঠিক ৫২ বছর পর, ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। ইতিহাসে একই দিন জন্ম ও মৃত্যুর ঘটনা বিরল। যে ঘটনা বেগম রোকেয়া ক্ষেত্রে ঘটেছিল।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলের সামনের দেয়ালে ছিল বেগম রোকেয়ার গ্রাফিতি। গত ১৯ নভেম্বর সে গ্রাফিতির চোখ ও মুখ কালো রঙের স্প্রে দিয়ে ঢেকে দেন ওই হলেরই একজন শিক্ষার্থী।

এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলে সমালোচনা। বিভিন্ন মহলে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাড়াঁয় শামসুন নাহার হলের এ ঘটনা। একপর্যায়ে ঘটনা কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এর পর কর্তৃপক্ষের কাছে ওই শিক্ষার্থী ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

বেগম রোকেয়াকে কেন্দ্র করে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলেই ঘটনা ঘটেনি। এর কয়েকদিন আগে রংপুরে আরেকটি ঘটনা ঘটে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) নাম পরিবর্তন করে ‘রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ করার দাবি জানায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি দেশে ঘটে যাওয়া এই দুটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সমাজের কিছু মানুষের নৈতিক অবনতি ও অবক্ষয় এ ঘটনার জন্ম দিয়েছে। কথা হলো, কালি দিয়ে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্ত করলেই কি বেগম রোকেয়ার ইতিহাস বা দর্শন মুছে ফেলা সম্ভব?

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের মতে, ‘বেগম রোকেয়া নারীদের ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে স্কুল-কলেজে যেতে শিখিয়েছেন। শামসুন নাহার হলের যে শিক্ষার্থী, আজ হলে অবস্থান করে পড়ালেখা করছেন, সেটা কিন্তু বেগম রোকেয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে। আসলে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের অসম্মান করলে নিজেকেই অসম্মানিত হতে হয়, এর সঙ্গে নিজের মূর্খতাও প্রকাশ পায়। উপরের ঘটনা দুটি সে রকমের ঘটনা।’ 

প্রতীকী ছবিডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘সমাজের এই অবক্ষয়ের পেছনে রাজনীতির ভূমিকা আছে। দেশে যে রাজনীতির ধারা চালু থাকবে, সে ধারা অনুযায়ী দেশের মানুষ পরিচালিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের পরে আমরা গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, সেটা কিন্তু গড়ে উঠেনি। দেশ স্বাধীনের পর থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, ক্ষমতা দখল, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিহিংসার রাজনীতির চর্চা চালু ছিল। কিন্তু এর পাশাপাশি মানুষ গঠনের যে শিক্ষাকাঠামো চালু থাকার কথা ছিল, সেটা দৃশ্যমান ছিল না। এর ফলে মানবিক সমাজ গড়ে ওঠেনি। আর এর প্রভাব যুগ যুগ ধরে দেশের মানুষের ভোগ করছে। বলা যায় গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক দেশ গড়ার রাজনৈতিক চর্চার অভাবেই আজকের সমাজের এই পরিণতি।’

এ কথা ঠিক যে, আজকের যুগে নারীরা নিজেদের অধিকারের বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। নারীরা এখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, সমাজে নিজের অবস্থানের জন্য লড়াই করে, তাদের সঙ্গে কোনো অন্যায় আচরণ হলে আইনের শরণাপন্ন হচ্ছেন। নারীদের এই সাহস কিন্তু আগে ছিল না। আগের দিনে নারীর নিজের অধিকারের কথা বলা তো দূরে কথা, ঘর থেকেই বের হতেন না। সে সময় নারীরা ঘরে বন্দি থাকতেন। আর সকল অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন মুখ বুঁজে সহ্য করতেন। 

তবে, নারীরা এই জায়গা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এই অঞ্চলের নারীরা সমাজের বাধা পেরিয়ে যে জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছেন, এর কৃতিত্বের অনেকটাই বেগম রোকেয়ার। তিনি চার দেয়ালে বন্দি থাকা নারীদের মুক্তির স্বাদ দিয়েছেন। সমাজে নারী শিক্ষার দ্বার প্রশস্ত করেছেন। নারীদের অন্ধকার থেকে বের করে এনে আলোর পথ দেখিয়েছেন। তাঁর দেখানো পথ ধরেই নারীরা এগিয়ে চলছেন। আজকের নারীরা পাহাড়-পর্বত চষে বেড়াচ্ছেন, বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থেকে হাজারো সমস্যা সমাধান করছেন। এমনকি যে খেলাধুলা থেকে একসময় নারীদের বঞ্চিত করা হতো, দূরে রাখা হতো, সেখানেও এখন নারীরা সাফল্যের চিহ্ন রাখছেন। এসব সম্ভব হয়েছে বেগম রোকেয়ার মতো মানুষদের লড়াইয়ের কারণে।

বিহারের ভাগলপুরে স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিয়ের পর বেগম রোকেয়ার জীবনে এক নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। যেটা সে যুগে চিন্তার বাইরে ছিল। তিনি স্বামীর মৃত্যুর পর মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে ভাগলপুরে একটি বালিকা বিদ্যালয় তৈরি করেন। পরে ১৯১১ সালে কলকাতায় গিয়ে তিনি আরও একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়টির নাম ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’। 

প্রতীকী ছবিযে দাসত্বের কারণে নারীরা পিছিয়ে পড়েছিল, সেই দাসত্ব থেকে নারীকে মুক্ত করার পথ দেখিয়েছেন বেগম রোকেয়া। বেগম রোকেয়া সমাজের অচলায়তন ভেঙে নারীদের আলোর পথের সন্ধান দিয়েছেন। তিনি রক্ষণশীল সমাজের কাঠামো ভাঙার লড়াই করেছেন। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি প্রথাগত মুসলিম নারীর মতো হননি। তিনি তাঁর লেখনিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কথা বলে গেছেন। পুরুষশাসিত সমাজে অবরুদ্ধ নারীর যন্ত্রণা তিনি অনুভব করেছেন, আর সেটা প্রকাশ করেছেন তাঁর লেখনিতে। তিনি তাঁর  লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে নারীদের প্রতিবাদী চিত্র তুলে ধরার চেষ্টে করেছেন।

মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের বলেন, ‘বেগম রোকেয়া শুধু নারীর অধিকারে কথা বলেননি, তিনি প্রগতির কথাও বলেছেন। তিনি সমাজের অবরোধ ভাঙার জন্য, নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য, নারীর মুক্তির জন্য লড়াই করে গেছেন। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে কুসংস্কারসহ নানা প্রথা ভেঙে নারীদের মুক্ত হওয়ার পথের সন্ধান দেন। বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে। নারীর ওপর আঘাত মানে, সমাজের ওপর আঘাত। এই আঘাত কেবল নারীর জীবনকেই বিপন্ন করে না, বরং রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে বাধা দেয়। এ কারণে নারী আন্দোলনকে শক্তাশালী করতে হবে। বেগম রোকেয়াকে মনে রাখা মানে, তাঁর দর্শনকে মনে রাখা। আর এই দর্শন মানুষকে মানবিক সমাজ গড়ে তোলার কাজে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’