আজ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধে ১০ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়। এ বছরে এই দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আত্মহত্যাবিষয়ক ধারণার পরিবর্তন জরুরি’ (Changing the narrative on suicide)। ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (IASP) মিলিতভাবে ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ (WSPD) প্রতিষ্ঠা করে। প্রতি বছর এই দিবস পালনের মূল বাণী থাকে আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে প্রতি বছর ৭ লাখ ২০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর তৃতীয় কারণ হলো আত্মহত্যা। এ ছাড়া বিশ্বে আত্মহত্যার ৭৩ শতাংশ ঘটনা ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘মায়ের সঙ্গে অভিমানে নারী শ্রমিকের আত্মহত্যা’। ঘটনাটি ঘটেছিল রাজধানীর আদাবরে। মায়ের সঙ্গে অভিমানে এই নারী পোশাক শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন বলে জানান তাঁর স্বজনেরা। ঝুমুর আদাবরে ভাড়া বাসায় বাবা‑মায়ের সঙ্গে থাকতেন।
মারা যাওয়া ঝুমুরের বড় বোন নাসরিন বলেন, ‘ঝুমুর আদাবরের শেখের টেকে একটি গার্মেন্টস কাজ করত। আমার বৃদ্ধ বাবা একজন রিকশাচালক। তবে বয়স হওয়াতে বাবা প্রতিদিন রিকশা চালাতে পারত না। এই ছোট বোনের আয়ের ওপরেই আমাদের সংসারটি চলত। রাতে গার্মেন্টস থেকে বাসায় এলে মায়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় ঝুমুরের। এরপর কাউকে কিছু না বলে গোসলখানায় গিয়ে বিষপান করে ঝুমুর।’
এ দেশে ঝুমুর শুধু একা নন। বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার কারণে মারা যাচ্ছেন বহু মানুষ। আত্মহত্যার কিছু কিছু ঘটনা হয়তো পত্রিকার পাতা বা অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু অনেক ঘটনা আবার ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারী ও কন্যা নির্যাতন বিষয়ক প্রতিবেদন (জানুয়ারি‑আগস্ট) থেকে জানা যায়, গত ৮ মাসে ১৪৬ জন কন্যাশিশু ও নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
‘আত্মহত্যা’ শব্দের ব্যাপকতা অনেক বেশি। ‘আত্ম’ মানে নিজ, আর ‘হত্যা’ মানে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নিজেকে শেষ করে দেওয়াকে বলা হয় ‘আত্মহত্যা’। আত্মহত্যার বিষয়টি কিন্তু খুব একটা সহজ ব্যাপার না। যে মানুষ হয়তো কোনো একদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে ভয় পেতেন, আজ তিনি নির্ভয়ে আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে দ্বিধাবোধ করছেন না।
মানুষ বিভিন্ন কারণে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে। যেমন–পরিবারে অশান্তি, কাছের বা প্রিয় মানুষের কাছ থেকে অবহেলা, অসম্মান, পরীক্ষার পাস না করা, বেকারত্ব, জীবনের প্রতি হতাশা, বিষণ্নতা, সমাজের অবক্ষয়সহ আরও নানা কারণে মানুষ নিজেকে মৃত্যু দিকে সঁপে দেন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষ কেন নিজেকে শেষ করে দিতে চান। পরিবার, কাছের বা প্রিয় মানুষের বন্ধন ছেড়ে কেন তারা পৃথিবী ছেড়ে দূরে চলে যেতে চায়। তাহলে কি এই পৃথিবী তাদের স্বপ্ন দেখাতে ব্যর্থ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আঙুল তুলতে হবে চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থার দিকে। সমাজে মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান আজ অনেক নিচে নেমে গেছে। পরিবার থেকে হারিয়ে গেছে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটুকু।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সিনিয়র আইনজীবী নাহিদ শামস্ ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘বাংলাদেশের আইনে আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে তার জন্য শাস্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করলে বা আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে স্বীয় শরীরের ওপর কোনো ধরনের আঘাত করলে তাকে পেনাল কোড ৩০৯ ধারা অনুসারে ১ বছর বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এ ছাড়া পেনাল কোড ৩০৬ ধারায় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে আত্মহত্যার সহায়তা বা প্ররোচনা করার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কেউ আত্মহত্যার প্ররোচনা দিলে সে ব্যক্তি আত্মহত্যা করে মৃত্যুবরণ করলে, প্ররোচনাদানকারীর শাস্তি পেনাল কোড ৩০৬ ধারা মোতাবেক ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং বিনাশ্রম বা সশ্রম কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।’
এই আইনজীবীর আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রচলিত সাক্ষ্য আইন ১৮৭২‑এর ৩২ ধারা অনুযায়ী, আত্মহত্যাকারীর রেখে যাওয়া সুইসাইড নোট প্ররোচনাদানকারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু সুইসাইড নোটের ওপর ভিত্তি করে কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। সুইসাইড নোটের সমর্থনে আরও সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। যেমন–সুইসাইড নোট আদৌ আত্মহত্যাকারীর কি না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার সঙ্গে বিষণ্নতা বা হতাশার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে, তাদের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন। তরুণদের আত্মহত্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন। আঁচল ফাউন্ডেশনের চলতি বছরের শুরুর দিকে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে মোট ৫১৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর হার বেশি, ৬০ দশমিক ২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করা নারীদের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা গেছে, ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ আত্মহত্যা করে অভিমানে, ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রেমঘটিত কারণে, ৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানসিক ভারসাম্যহীনতায়, ৭ দশমিক ১ শতাংশ পারিবারিক কলহে, ৩ দশমিক ৯ শতাংশ যৌন হয়রানি, ৪ দশমিক ২ শতাংশ পড়ালেখার চাপে ও অকৃতকার্য হয়ে, ১ দশমিক ৬ শতাংশ পারিবারিক নির্যাতনে, শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ অপমানে এবং ২ দশমিক ৯ শতাংশ কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে আত্মহত্যা করে।
আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত মানুষ একদিনে নেয় না। তিলে তিলে জমতে থাকা হতাশা, ক্ষোভ, দুঃখ, বেদনা, মানসিক অশান্তি থেকে মানুষ এই গুরুতর সিদ্ধান্তের দিকে পা বাড়ায়। আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে কিন্তু তার আশপাশের মানুষ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অনেকাংশে দায়ী।
আইনজীবী নাহিদ শামস্ মনে করেন, পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, নারী হওয়ার কারণে সামাজিক অবদমন, আত্মবিশ্বাসের অভাব, একাকীত্ব, পরীক্ষা কিংবা প্রেমে ব্যর্থতা, যৌন নিপীড়নসহ বিভিন্ন কারণে নারীরা আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ক্ষেত্রে বিষণ্নতা বা হতাশায় পড়লে মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া খুব জরুরি। পরিবারে নারীদের বৈষম্যের শিকার হতে দেওয়া যাবে না। তাদের দুঃখকে জয় করার, নিজেকে ভালোবাসতে শেখাতে হবে, এটা পরিবারের কাছ থেকে শেখানো প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে নারীকে দোষী ভাবার প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। আবার পরিবারের কোনো সদস্যের আত্মহত্যার ঘটনা থাকলে সে বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। আত্মহত্যা বন্ধে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন, জনসচতনামূলক কার্যক্রম, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন জরুরি মনে করে এই আইনজীবী।


অবন্তিকার আত্মহত্যা যে বার্তা দিচ্ছে
ধর্ষণের শাস্তির বিষয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন যা বলে
সব ধরনের অসমতার বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার হোক
