ফিটনেস মডেল হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ট্রেসি, নিজেকে তৈরিও করছিলেন সেভাবে। কিন্তু একটি আঘাতে বদলে যায় সবকিছু।
সম্প্রতি ২০২৪ সালের বিশ্বের সবচেয়ে অনুপ্রেরণা জাগানো এবং প্রভাবশালী নারীদের তালিকা প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। সেখানেই নাম এসেছে মার্কিন তীরন্দাজ ট্রেসি অটোর।
চলতি বছর ট্রেসি প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্যারা অলিম্পিক গেমসে অংশ নেন। শারীরিক অক্ষমতার কারণে হাতের পরিবর্তে মুখ ব্যবহার করে তীর ছোঁড়েন তিনি।
ট্রেসির গল্প জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০১৯ সালে। সে বছরের সেপ্টেম্বরে প্রেমিকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের ইতি টানেন তিনি। মাত্র এক মাস আগেই নিজ বাড়িতে সেই প্রেমিকের হামলার শিকার হয়েছিলেন ট্রেসি। পুলিশ ধরেও নিয়ে গিয়েছিল ছেলেটিকে।
এই ঘটনার পর ট্রেসি নিজের জীবন নতুন করে গোছাতে শুরু করেন। তাঁর জীবনে আসে নতুন বসন্ত।
ইনজুরির জন্য আর কখনোই আগের মতো ফিট হতে পারবেন না তিনি। পারবেন না আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক কোনো চাকরি করতে। কিন্তু অলস বসে থাকতে চান নি ট্রেসি।
২০২১ সালের মার্চে ট্রেসি নতুন করে আশায় বুক বাঁধেন। হুট করেই একদিন মনে হলো আর্চারির কথা। সৌভাগ্যক্রমে তাঁদের এলাকাতেই ছিল বিশেষায়িত আর্চারি কোর্স শেখার ব্যবস্থা।
ট্রেসি অটোর জন্য বিশেষভাবে হারনেস নির্মাণ করা হলো। প্রথম প্রথম ডান কাঁধ থেকেই তীর ছুঁড়তেন ট্রেসি, কিন্তু এখন মুখের মাধ্যমে করেন। হ্যাট, গ্লাভস সব কিছুই আলাদাভাবে নকশা করে হয়েছে তাঁর ব্যবহারোপযোগী করে।
জীবনে ছোঁড়া প্রথম তীরটিই লক্ষ্যবস্তুতে গিয়ে বিঁধে ট্রেসির। তখনই ট্রেসি বুঝে গিয়েছিলেন যে, এটি হতে যাচ্ছে তাঁর গন্তব্য।
নানান টুর্নামেন্ট শেষে একমাত্র নারী মার্কিন তীরন্দাজ হিসেবে স্বপ্নের প্যারালিম্পিকে নিজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন এই অ্যাথলেট।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রেসি বলেন, ‘বিচ্ছেদের পর সাবেক প্রেমিককে আমি বাসা থেকে বের করে দেই। এরপর আমার বাসার সব লকও বদলে দেই। একটা সময়ের পর রিকির সঙ্গে পরিচয় হয়, যা পরবর্তীতে প্রেমে রূপ নেয়।’
এরপরই আসে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর, অভিশপ্ত সে রাত থেকেই এই অ্যাথলেটের পুরোটা জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। সেদিনের নিজের জীবনের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ট্রেসি বলেন, ‘সেদিন বাড়ি ফিরেই আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ বিকট এক শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আমার। মুখের ওপর ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় চমকে উঠি। গলার স্বরে বুঝতে পারি, ঘরে উপস্থিত সাবেক সেই প্রেমিক।’
সেদিনের ভয়াবহ আক্রমণ এবং যৌন নির্যাতনের ফলে ট্রেসি অটোর শরীরের নিচের অংশ পুরোপুরি অবশ হয়ে যায়, হারাতে হয় বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি। আঘাত শুকিয়ে এলেও ট্রেসিকে এর মূল্য দিতে হবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। রিকিকেও দুইবার গুলি করা হয়, পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়।
আদালতের নির্দেশে ৪০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন ট্রেসিদের ওপর আক্রমণকারী সেই ব্যক্তি।
দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ট্রেসি বলেন, ‘আমাকে বাইরে থেকে দেখলে শুধু একটি হুইলচেয়ার চোখে পড়বে, কিন্তু আমার ভেতরের সব দুমড়ে-মুচড়ে গেছে! আমার শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়েছে। যেহেতু তাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সেহেতু আমার শরীরে এখন আর স্বাভাবিকভাবে ঘাম উৎপন্ন হয় না!’
তবে কোনো শারীরিক জটিলতাই ট্রেসির মা হওয়ার পথে বাধা হতে পারে নি। আগামী বছরের জানুয়ারিতে তাঁদের প্রথম সন্তানের মুখ দেখার জন্য দিন গুনছেন ট্রেসি অটো এবং রিকি রিসেল।
বর্তমানে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের পক্ষে অ্যাডভোকেসি করছেন ট্রেসি। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময়ই পৃথিবীর জন্য কিছু করতে চেয়েছি; চেয়েছি আলো হয়ে উঠতে। চারপাশ ক্ষত–বিক্ষত হয়ে উঠেছে অন্ধকার আর ঘৃণায়; চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থেকে আমি একে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিতে পারি না’।
তথ্যসূত্র: বিবিসি