প্যারিস প্যারালিম্পিকে মেয়েদের ৪০০ মিটার টি-টোয়েন্টি বিভাগের দৌড়ে ভারতকে ব্রোঞ্জ এনে দিয়েছেন দীপ্তি জীভানজি। যদিও নিজের সেরা টাইমিং করতে পারেননি, এরপরও ইউক্রেনের অ্যাথলেট ইউলিয়া শুলিয়ার (৫৫.১৬ সেকেন্ড) ও এ বিভাগে বিশ্বরেকর্ড ধারী তুর্কি অ্যাথলেট আয়সেল ওন্দেরের (৫৫.২৩ সেকেন্ড) পর সমাপ্তিরেখা স্পর্শ করে তৃতীয় হয়েছেন দীপ্তি (৫৫.৮২ সেকেন্ড)
প্যারালিম্পিকে ব্রোঞ্জ জিতলেন, ভারতকে গর্বের মুহূর্ত এনে দিলেন, অথচ ‘ভয়াবহ’ এক অতীত পার করে এ পর্যায়ে এসেছেন দীপ্তি। একদিকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিয়েছেন, দারিদ্রের সঙ্গে প্রতিনিয়ত চলেছে সংগ্রাম, তারপর দেখতে ‘সুন্দর’ ছিলেন না বলে প্রতিবেশীরা তাঁকে ‘বানর’ বলেও ডাকতেন। সেখানেই শেষ নয়, তারা দীপ্তির বাবা-মাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন দীপ্তিকে অনাথ আশ্রমে রেখে আসার।
টি-টোয়েন্টি বিভাগ মূলত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের জন্য। এর আগে ২০২২ সালে চীনে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের এ প্রতিযোগিতায় ৫৬.৬৯ টাইমিং করে সোনা জিতেছিলেন দীপ্তি। চলতি বছর জাপানের কোবেতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন ৫৫.০৭ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে। যা ২০ বছর বয়সী এ অ্যাথলেটের ক্যারিয়ার সেরা টাইমিং।

গত সপ্তাহে স্তাদ দঁ ফ্রান্সে প্যারালিম্পিকের ফাইনালে ভারতকে আরেকটি পদক এনে দেন তিনি। এরপরই নতুন করে আলোচনায় আসেন দীপ্তি। তবে সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-তে সাক্ষাৎকারে দীপ্তির সাক্ষাৎকারের পর এ আলোচনা নতুন মাত্রা পায়।
ইন্ডিয়া টুডে-কে দীপ্তি বলেছেন, ‘আমার জন্ম হয়েছিল একটা সূর্যগ্রহণের সময়। সে কারণে প্রতিবেশীরা আমার বিরুদ্ধে কথা বলত। তারা আমাকে ‘বানর’ বলে ডাকত এবং আমার বাবা-মাকে পরামর্শ দিয়েছিল আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। এমনকি আমাকে অনাথ আশ্রমে রেখে আমার পরামর্শও দিয়েছিলেন তারা।’
ছোটবেলা থেকে এমন প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে উঠলেও কখনো দমে যাননি দীপ্তি। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থনের কথাই জোর দিয়ে বলেছেন এই অ্যাথলেট, ‘আমি সব ধরনের নেতিবাচকতা এড়িয়ে চলতাম এবং আমার লক্ষ্যে অবিচল ছিলাম। এটা সম্ভব হয়েছিল আমার পরিবারের সমর্থনের জন্য। সে কারণেই আমি প্রতিকূলতা পাড়ি দিতে পেরেছি এবং এ পদক জিতেছি। তবে সেসব আমার ওপর প্রভাব ফেলেছিল।’
দীপ্তিকে যে শুধু এমন কটাক্ষের মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে তা নয়, লড়াই চালাতে হয়েছে দারিদ্রের সঙ্গেও। এমনকি অর্থনৈতিক দুর্দশার সময় জমিও বিক্রি করতে হয়েছিল তাঁর পরিবারকে। তবে এশিয়ান গেমসের পদক জিতে সে জমি আবার কিনে নিয়েছেন দীপ্তি, ‘অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে আমাদের জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। যখন আমি এশিয়ান গেমসে পদক জিতি, আমি সে জমিটা কিনে পরিবারকে আবার ফিরিয়ে দিই।’
দীপ্তির সংগ্রামের গল্প এর আগে গত মে মাসেও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল, তখন দীপ্তির বেড়ে ওঠার লড়াই নিয়ে কথা বলেছিলেন তাঁর মা জীভানজি ধনলক্ষ্মী। সে সময় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দীপ্তির মা বলেছিলেন, ‘ও সূর্যগ্রহণের সময় জন্মেছিল। জন্মের সময় ওর মাথাটা খুব ছোট ছিল। ঠোঁট ও নাকও ছিল কিছুটা অস্বাভাবিক। আমাদের আত্মীয়-স্বজন এবং গ্রামের যারা ওকে দেখতে এসেছিল, তারা প্রায় সবাই দীপ্তিকে দেখে পিচি (পাগল) এবং কোথি (বানর) বলেছিল এবং আমাদের বলেছিল ওকে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দিতে।’
তবে সাফল্য যে কেবল ইতিহাস পাল্টায় না, প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সুরও পাল্টে দেয়, সেটাই প্রমাণ করেছেন দীপ্তি। সে কারণে দীপ্তিকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই ধনলক্ষ্মীর, ‘এখন সে যখন এমন একটা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, এটাই প্রমাণ করে, ও একটা স্পেশাল গার্ল ছিল।’
দীপ্তির ছোট বেলা যে দারিদ্রের সঙ্গে কেটেছে, সেটা বলতে গিয়ে তাঁর মা বলেছেন, ‘যখন আমার শ্বশুর মারা গেলেন, তাঁর সৎকারের জন্য আমাদের কিছু কৃষি জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। আমার স্বামী প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ রুপি আয় করত। সে কারণে এমনও দিন গেছে, পরিবার চালাতে আমাকেও কাজ করতে হয়েছে। এমনকি দীপ্তির ছোট বোন আমুলিয়াও কাজ করেছে।’
ধনলক্ষ্মী যোগ করেন, ‘দীপ্ত ছোট বেলায় খুব শান্ত ছিল। তেমন কথা বলত না। কিন্তু যখন গ্রামের লোকেরা আজেবাজে বলত, সে সঙ্গে সঙ্গে বাসায় চলে আসত আর কান্না করত। আমি ওকে খুশি করতে পায়েস রান্না করে খাওয়াতাম। মাঝে মাঝে চিকেনও খাওয়াতাম। এসবে সে খুব খুশি হতো।’



