কর্মক্ষেত্রে নারীর মানসিক হেনস্তা একটি গুরুতর সামাজিক ও আইনি সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশে একাধিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব আইন ও নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করা, কর্মক্ষেত্রে একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা।
নারীর মানসিক হেনস্তা বলতে এমন আচরণ বোঝায়, যা তার মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে। কাজের ছুতোয় হেনস্তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অসম্মানজনক মন্তব্য বা এমন কোনো আচরণ যা একজন নারীর আত্মসম্মান ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, যা নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনের বিষয়গুলোও এই আইনের অন্তর্ভুক্ত। যদি প্রমাণিত হয় যে, কোনো নারী মানসিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা, ২০০৯ (শিল্পী সুলতানা বনাম বাংলাদেশ) এ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ২০০৯ সালে এক ঐতিহাসিক রায়ে কর্মক্ষেত্রে নারীর যৌন ও মানসিক হেনস্তা প্রতিরোধে নীতিমালা প্রদান করে। এই নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একটি অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। এই কমিটি হেনস্তার অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত করবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগ করবে।
মানসিক হেনস্তার কিছু উদাহরণ হলো, যে কাজের অজুহাতে অনবরত চাপ প্রয়োগ বা অসম্মানজনক আচরণ, সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, কর্মক্ষমতা নিয়ে অপমান বা ক্রমাগত সমালোচনা, কাজের অজুহাতে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হুমকি দেওয়া।
অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া
নারীর মানসিক হেনস্তার অভিযোগ জানাতে ভুক্তভোগীকে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
১. লিখিত অভিযোগ: ভুক্তভোগী তার প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিতে পারেন।
২. তদন্ত প্রক্রিয়া: অভিযোগ কমিটি যথাযথ তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে অভিযোগ তদন্ত করবে।
৩. আইনানুগ ব্যবস্থা: অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ শ্রম আইন বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
আবার মানসিক হেনস্তার মামলা প্রমাণের জন্য ভুক্তভোগীকে প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে হয়। এগুলো হতে পারে:
১. ই-মেইল বা মেসেজের লিখিত প্রমাণ।
২. প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য।
৩. কর্মক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ সম্পর্কিত নথি।
অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত হলে নিম্নলিখিত শাস্তি বা জরিমানা হতে পারে:
১. আর্থিক জরিমানা।
২. চাকরি থেকে বরখাস্ত।
৩. ফৌজদারি মামলা দায়ের।
কাজের ছুতোয় নারীর মানসিক হেনস্তা প্রতিরোধে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ। এভাবে একটি সুরক্ষিত ও সম্মানজনক কর্মক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব।তাই কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন:
১. প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে হেনস্তা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা।
২. অভিযোগ কমিটি সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করা।
৩. নারীর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে মানসিক সহায়তা প্রদান করা।
৪. হেনস্তা প্রতিরোধে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন।
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট