বোয়িংয়ের কারখানা ভরে গেছে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ উড়োজাহাজে 

মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সবচেয়ে বড় কারখানায় কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে শ্রমিক নেতারা। কারখানার ব্যবস্থাপক নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে কর্মীদের মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।   

গত জানুয়ারিতে একটি ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজের দরজায় বিস্ফোরণের পর থেকে বেশ চাপে আছে বোয়িং। এরপর থেকেই উড়োজাহাজের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের যেতে হচ্ছে কড়া তদন্তের মধ্য নিয়ে। 

বোয়িংয়ের সবচেয়ে বড় কারখানাটি ওয়াশিংটনের এভারেট এলাকায়। বলা হয় এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারখানা। এই কারখানাতেই ৭৪৭ ও ৭৬৭ সিরিজের উড়োজাহাজগুলো তৈরি করা হয়। পাশাপাশি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজটির ত্রুটি সারানো হয় এখানে। 

কারখানাটিতে প্রায় ৩ দশক ধরে কাজ করছেন এমন একজন কর্মী দাবি করেছেন, এটি এখন ত্রুটিপূর্ণ ৭৮৭ উড়োজাহাজ দিয়ে ভর্তি। এই উড়োজাহাজগুলোর একটি বড় অংশ বোয়িংয়ের সাউথ ক্যারোলাইনা কারখানা থেকে উড়িয়ে এখানে আনা হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ওই কারখানাতে ৭৮৭ উড়োজাহাজগুলো জোড়া দেওয়ার কাজ করা হয়। বোয়িং দাবি করে, এটি তাদের জন্য আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মী দাবি করেন, ‘আমি কোনো ভাবেই সাউথ ক্যারোলাইনায় পাইলট হতে চাইব না এবং এগুলোকে উড়িয়ে এখানে নিয়ে আসার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। কারণ যখন এগুলোকে এখানে আনা হয় আমরা এগুলোকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলি।’  

এভারেটের কারখানার ব্যবস্থাপকরা কর্মীদের নিরাপত্তা শঙ্কার বিষয়ে চুপ থাকতে বলেছে। ওই কর্মী বলেন, ‘বোয়িংয়ের আয়নায় নিজের মুখ দেখা উচিত, আমরা ভুল।’ 

নিরাপত্তা শঙ্কার বিষয়ে ওঠা দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়িং কোনো মন্তব্য করেনি। তাদের দাবি, ৭৮৭ উড়োজাহাজগুলো এই কারখানায় নিয়ে আসা যাচাই বাছাই প্রকল্পের অংশ। 


 
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) কর্মকর্তারা আস্থা ফেরাতে বোয়িংকে পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনার তাগিদ দেন। ফলে সহসাই উড়োজাহাজের উৎপাদন বাড়াতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি বোয়িংয়ের প্ল্যান্টগুলোতে মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন আরও বাড়ানো হতে পারে বলে জানানো হয়। 

অবশ্য নিরাপত্তা প্রশ্নে বোয়িংয়ের জন্য এমন পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। গত প্রায় ৫ বছর ধরেই এই মডেলের উড়োজাহাজগুলো নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের দুটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ৩৪৬ জন মারা যান। এ সময় প্রায় ২০ মাস বোয়িংয়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া এই মডেলের উড়োজাহাজ সিরিজটি গ্রাউন্ডেড ছিল।

২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুটি ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের পর এফএএ–এর একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল, ৫৩টি সুপারিশ করেছিল। জানুয়ারির ঘটনার পর এফএএ তদন্ত শুরু করে। প্রায় ৬ সপ্তাহের নিরীক্ষার পর বোয়িংয়ের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অনেকগুলো ক্রটি পাওয়া যায়। এ সময় বোয়িংকে ৯০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল যাতে করে এই ক্রটিগুলো দূর করা যায়। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে বোয়িং তাদের কর্মপরিকল্পনা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দিয়েছে। 

বিশেষজ্ঞ প্যানেলে থাকা অধ্যাপক নাজমেডিন মেসকাটি জানান, গত দুই দশকে বোয়িংয়ের নিরাপত্তা সংস্কৃতি খারাপ হয়েছে। তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর নিবেদিতপ্রাণ এবং দক্ষ কর্মীবাহিনী। আশার কথা হচ্ছে, কারিগরি যে ক্রুটিগুলো আছে সেগুলো ঠিক করা সম্ভব। বোয়িংয়ের করপোরেট ব্যবস্থাপনা এবং বোর্ডকে সংস্কার করা প্রয়োজন।’ 

এই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, বোয়িংয়ের সদর দপ্তর আবারও সিয়াটলে ফিরিয়ে আনা উচিত। পাশাপাশি প্যানেল যে পরামর্শগুলো দিয়েছে ধীরে ধীরে সেগুলো বাস্তবায়নে নজর দেওয়া উচিত। 

এই মাসে এফএএ বোয়িংয়ের ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের উৎপাদনের বিষয়ে আরেকটি তদন্ত শুরু করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো এটা দেখা যে সাউথ ক্যারোলাইনার কর্মীরা উড়োজাহাজগুলোর অত্যাবশ্যকীয় যাচাই বাছাইগুলো সম্পন্ন করছেন কিনা, নাকি এখানে কোনো জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। 

গত এপ্রিলে বোয়িংয়ের একজন সাবেক প্রকৌশলী স্যাম সালেহপর মার্কিন কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্য দেন, ৭৮৭ সিরিজটি ক্রটিপূর্ণ এবং বিশ্বে এই মডেলের যত উড়োজাহাজ আছে সবগুলো গ্রাউন্ডেড করে তদন্ত করা উচিত। অবশ্য বোয়িং এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, সিরিজটির নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো শঙ্কা নেই। 

গার্ডিয়ানের সাথে কথা বলা বোয়িংয়ের সেই কর্মী বলছেন, ৭৮৭ সিরিজের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ত্রুটির জন্য তীব্র চাপে থাকার কারণেই কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, এয়ারলাইনস ও যাত্রীদের বারবার আশ্বস্ত করতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই আতঙ্কিত অবস্থায় আছি। বোয়িং ব্যবস্থাপকরা বুঝতে পেরেছেন কি হচ্ছে। এ নিয়ে ধারণা আছে এমন কর্মীর চেয়ে ধারণা না থাকা কর্মীদের সংখ্যাই বেশি।’ 
 
বোয়িংয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা অনেকবার প্রকাশ্যেই বলেছি, সরবরাহ করা হয়নি এমন ৭৮৭ উড়োজাহাজগুলো ক্রেতাদের হাতে যাওয়ার আগে আমরা যৌথভাবে এগুলোর প্রকৌশলগত দিকগুলো যাচাই করে দেখব। ২০২২ সালের পর তৈরি উড়োজাহাজগুলোর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। 

মুখপাত্র আরও বলেন, ‘২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় আমরা ঘোষণা করেছি, আমরা যাচাই বাছাইয়ের কাজটি এভারেট থেকে করব যাতে সাউথ ক্যারোলাইনা টিম নতুন উড়োজাহাজ উৎপাদনের পর্যায়ে থাকে। এই পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং এভারেট যাচাই বাছাই প্রকল্প চলমান আছে।’ 

অবশ্য কয়েকজন কর্মীর দাবি, শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সক্রিয় না থাকায় ৭৮৭ উৎপাদন ওয়াশিংটন থেকে সাউথ ক্যারোলাইনাতে নিয়ে আসা হয়েছে। ওয়াশিংটনে কর্মীদের শক্ত ইউনিয়ন আছে কিন্তু সাউথ ক্যারোলাইনাতে তেমনটি নেই। 

এভারেটের আরেকজন বোয়িং কর্মী দাবি করেছেন, ৭৮৭ এর উৎপাদন সাউথ ক্যারোলাইনাতে নিয়ে আসার পর এখানে ইউনিয়নভুক্ত কোনো কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা মাসে ১০ থেকে ১২টি উড়োজাহাজ তৈরি করতাম। কিন্তু সাউথ ক্যারোলাইনাতে তৈরি হয় মাত্র দুটি বা তিনটি। মাসে ১০টি উড়োজাহাজ তৈরি করতে তাদের কখনও দেখিনি।’ 

এ বিষয়ে বোয়িংয়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।