যে মানুষটি প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে ভালোবাসেন, যিনি প্রতিটি আলোচনায় নিজেকে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরেন, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার যেন এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি, যার কাছে তাঁর প্রতিটি চালেরই পাল্টা চাল প্রস্তুত। একদিন হুমকি, পরদিন আলোচনার ঘোষণা। আবার কয়েক ঘণ্টা না যেতেই সেই আলোচনা অস্বীকার করে ইরান।
হরমুজ খুলতে চাপ, ইরানের জবাব—আমরা আমেরিকার সঙ্গে নয়, ওমানের সঙ্গে কথা বলছি। যুদ্ধের ময়দান থেকে কূটনীতির টেবিল—যেখানেই খেলাটা গড়াচ্ছে, সেখানে যেন প্রতিবারই নতুন সমীকরণ তৈরি করছে তেহরান। আর সেই কারণেই বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—ট্রাম্প কি জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের একটি পরিচিত কৌশল হলো—কখনও পরাজয় স্বীকার না করা। পরিস্থিতি যেমনই হোক, জনসমক্ষে সব সময় বিজয়ের গল্প বলাই তাঁর রাজনৈতিক ব্র্যান্ড। কিন্তু ইরান ইস্যুতে সেই কৌশল যেন বারবার ধাক্কা খাচ্ছে। কয়েক দিন আগেই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, খুব দ্রুতই ইরানের সঙ্গে নতুন আলোচনা শুরু হচ্ছে। এমনকি তিনি দাবি করেন, চুক্তির মূল কাঠামোও নাকি প্রায় ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই দাবিকে প্রকাশ্যে নাকচ করে দেয় তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি স্পষ্ট জানিয়ে দেন—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না। তিনি বলেন, ইরানের আলোচনা হচ্ছে ওমানের সঙ্গে, আর সেটিও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
এরপরই ক্ষোভ ঝাড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের নেতৃত্ব অবিশ্বাস্য।’
কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু কথার লড়াই নয়—মাঠের অবস্থানও এখনো বদলাতে পারেনি ওয়াশিংটন। হরমুজ প্রণালী এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আর সেই পথকে ঘিরেই এখনো সবচেয়ে বড় কৌশলগত চাপ ধরে রেখেছে ইরান।
বিশ্লেষকদের মতে, এটাই এখন তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী দর-কষাকষির অস্ত্র। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—সেই হামলায় কি সত্যিই ইরানের নীতি বদলানো সম্ভব? অনেক বিশ্লেষক বলছেন, দীর্ঘ কয়েক মাসের যুদ্ধের পরও ওয়াশিংটন এমন কোনো লক্ষ্য খুঁজে পায়নি, যেটিতে হামলা চালিয়ে তেহরানকে নিজেদের শর্তে আনতে পারবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প এখনো স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে পারেননি—এই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী। সামনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন। জ্বালানির দাম, যুদ্ধের ব্যয় এবং জনমত—সব মিলিয়ে সময় এখন ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক এই সময়েই ইরান কৌশল বদলেছে।
তেহরানের বর্তমান লক্ষ্য একটাই—যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর যতটা সম্ভব চাপ বাড়িয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, দ্রুত সমঝোতার বদলে পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর পথেই হাঁটছে ইরান।
একসময় মনে করা হতো, চাপ বাড়ালেই ইরান শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু কয়েক মাসের এই সংঘাত অন্য একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। এখন শুধু আমেরিকাই নয়, ইরানও নিজের শর্তে খেলতে চাইছে। প্রশ্ন এখন—কে বেশি শক্তিশালী, তা নয়; বরং বড় প্রশ্ন হলো, শেষ পর্যন্ত কার ধৈর্য আর কার কৌশল টিকে থাকে।