মিসাইল ছোড়া নয়, বোমা হামলাও নয়, এবার যেন যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক অধ্যায় শুরু করেছে ইরান। এমন এক কৌশল, যেখানে প্রতিটি হামলার লক্ষ্য শত্রুর সেনাবাহিনী নয়—বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতি। একটি প্রণালী বন্ধ, আরেকটি সমুদ্রপথ হুমকির মুখে, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আতঙ্ক। মনে হচ্ছে, সরাসরি যুদ্ধ জিতে নয়—বরং যুদ্ধের খরচ এতটাই বাড়িয়ে দিতে চাইছে তেহরান, যাতে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় ওয়াশিংটন। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি আর শুধু সামরিক লড়াই নয়—এটি এখন ধৈর্য, অর্থনীতি আর কৌশলের যুদ্ধ।
রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করার চেষ্টা করছে না। বরং তাদের লক্ষ্য একেবারেই ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ, জাহাজ চলাচলের রুট এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের অস্ত্রে পরিণত করা। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ এতটাই বেড়ে যাবে যে, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে।
এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। ইরান ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে, চাইলে এই পথের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু বিষয়টি এখন শুধু হরমুজে সীমাবদ্ধ নেই। তেহরান এখন লোহিত সাগর এবং সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাকেও সম্ভাব্য চাপের কেন্দ্র হিসেবে দেখছে। একটি নয়, একাধিক সামুদ্রিক রুটকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করাই এখন ইরানের নতুন কৌশল।
শুধু তাই নয়, শুরু থেকেই ইরান এমনভাবে উত্তেজনা বাড়িয়েছে, যাতে প্রতি সপ্তাহেই নতুন কিছু সামনে আনা যায়—কখনও নতুন ভৌগোলিক এলাকা, কখনও নতুন ধরনের অস্ত্র, আবার কখনও নতুন লক্ষ্যবস্তু। আর ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু আমেরিকা বা ইসরায়েলকে আঘাত করা নয়; বরং পুরো অঞ্চল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তোলাই তাদের আসল সুবিধা।
একটি সূত্রের দাবি, ইরানের সামরিক নেতৃত্ব বিশ্বাস করে ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চান না। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায়, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, রাজনৈতিক চাপও তত বাড়বে। এই কারণেই তেহরানের হিসাব—চাপ বাড়তে থাকলে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনই ছাড় দিতে বাধ্য হবে।
অন্যদিকে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আয়ার বলেন, ইরানের বর্তমান লক্ষ্য হলো—যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে ওয়াশিংটন আর পরিস্থিতির গতি নির্ধারণ করতে না পারে। অর্থাৎ খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চায় তেহরান। এ কারণেই হরমুজ নিয়ে বিরোধ এখন শুধু একটি জলপথের প্রশ্ন নয়; এটি এখন ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনার ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের লড়াই।
যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক আর যুদ্ধবিমান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, কখনও কখনও একটি সামুদ্রিক পথ তার চেয়েও বড় অস্ত্রে পরিণত হয়। ইরান এখন ঠিক সেই অস্ত্রই ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। লক্ষ্য—সরাসরি বিজয় নয়, বরং এমন এক বাস্তবতা তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর শুধু মিসাইলের লড়াই নয়। এটি পরিণত হয়েছে ধৈর্য, অর্থনীতি এবং কৌশলের এমন এক খেলায়—যেখানে শেষ পর্যন্ত জিতবে সেই পক্ষ, যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় চাপ সহ্য করতে পারবে।



