ইরান যুদ্ধে সহায়তা না করায় এবার দক্ষিণ কোরিয়াকে পেছনে ঠেলে কিমের দিকেই ঝুঁকছেন ট্রাম্প। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্রকে দূরে সরিয়ে উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উনের জন্য যেন নতুন দরজা খুলে দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে চলা যৌথ সামরিক মহড়াতেই এবার কাটছাঁটের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।
সময়টাও বিস্ফোরক। যেদিন শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার ১১ দিনের ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়া, সেদিনই ট্রাম্প বললেন—এই মহড়া কমাতে হবে। ট্রাম্পের দাবি, মহড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আর উত্তর কোরিয়ার কাছে এটি ‘শত্রুতার বার্তা’ পাঠায়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, ইরানের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিতে দক্ষিণ কোরিয়াকে বলা হয়েছিল। এই প্রস্তাবে সিউলের সাফ জবাব ছিল—‘না’। আর সেই সিদ্ধান্তের পরই দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়ায় কাটছাঁটের নির্দেশ!
অন্যদিকে কিম জং উন? তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এখন ‘খুব ভালো’—এমনটাই জানিয়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের পুরোনো মিত্র সিউলের জন্য যখন সামরিক চাপ কমছে, তখন পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা আরও জোরেশোরে সামনে আসছে। এটাই কি তাহলে নতুন মার্কিন কোরিয়া নীতি?
দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা বলয় নিয়ে কি বড় প্রশ্ন উঠছে? এই মহড়া নিছক যুদ্ধাভ্যাস নয়। প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা এতে অংশ নিচ্ছে। এতে রয়েছে লাইভ-ফায়ার প্রশিক্ষণ, নদী পারাপার এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম দ্রুত মোতায়েনের অনুশীলন। অর্থাৎ, উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে প্রস্তুতিই এর মূল উদ্দেশ্য। আর ঠিক এই সময়েই উত্তর কোরিয়া আবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শুরু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্তও করেছে। তারপরও ট্রাম্প বলছেন—এই মহড়াই নাকি উত্তরের কাছে শত্রুতার সংকেত পাঠাচ্ছে।
তাহলে এখন প্রশ্ন আরও বড়। যে দেশকে ঠেকাতেই দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার সামরিক জোট এত গুরুত্বপূর্ণ, সেই উত্তর কোরিয়ার প্রতিই কেন ট্রাম্পের সুর এত নরম? ট্রাম্প অবশ্য নতুন করে কিমের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছেন। প্রথম মেয়াদেও কিমের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে সেই কূটনীতি ভেঙে পড়ার পরও সম্পর্কের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত কি শুধুই খরচ কমানোর কৌশল? নাকি কিমকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে নতুন চাল?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তাকে কি নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন ট্রাম্প? একদিকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় সীমান্তে বাড়ছে উত্তেজনা। অন্যদিকে সেই সময়েই কমছে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়ার পরিসর। তাহলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত কি শান্তির পথে কূটনৈতিক দরজা খুলবে? নাকি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য নিরাপত্তার এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার পথ খুলবে? আগামী দিনে কোরীয় উপদ্বীপে আসল সুবিধা কার? মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার? নাকি কিম জং উনের? উত্তরটা লুকিয়ে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তের পাতায়।