ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস ৮৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। আজ সোমবার ভ্যাটিকানের কাসা সান্তা মার্তায় নিজ বাসভবনে তার মৃত্যু হয়। এর আগে তিনি ফুসফুসে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
২০১৩ সালে পোপ বেনেডিক্ট ষোড়শের অবসর গ্রহণের পর গির্জার ২৬৬তম পোপ নির্বাচিত হয়েছিলেন ফ্রান্সিস। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের ফ্লোরেসের মধ্যবিত্ত পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
পোপ ফ্রান্সিসের অতি সাধারণ জীবনযাপন সম্পর্কে অনেক বিস্ময়কর তথ্য অনেক মানুষই হয়তো জানেন না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এখন তাঁর অজনা তথ্যগুলো প্রকাশ করছে।
১. ফ্রান্সিস ছিলেন আমেরিকা মহাদেশ থেকে নির্বাচিত প্রথম পোপ
ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ইতিহাসে ফ্রান্সিস চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কারণ তিনি ছিলেন আমেরিকা মহাদেশ থেকে নির্বাচিত প্রথম পোপ। তাঁকে বলা হয় পশ্চিম গোলার্ধের প্রথম পোপ, দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম পোপ এবং জেসুইট অর্ডারের প্রথম পোপ। শুধু তাই নয়, ফ্রান্সিস নামধারী প্রথম পোপও তিনি-ই।
২. লাল জুতা পরতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল পোপ ফ্রান্সিস
পোপদের জন্য একটি ঐতিহাসিক জুতা থাকে, যেটি লাল রঙের মখমলের তৈরি। এর সঙ্গে সোনালি পেক্টোরাল ক্রস পরতে হয় পোপদের। কিন্তু পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ঐতিহাসিক লাল জুতা পারতে অস্বীকৃতি জানান। এর পরিবর্তে তিনি সাধারণ রূপালী ক্রস এবং জীর্ণ কালো জুতা পরতে শুরু করেন।
পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর পোপ ফ্রান্সিস সাধুদের মহৎ জীবন ও আধ্যাত্মিকতাকে গ্রহণ করেছিলেন। পোপ হিসেবে তাঁর প্রথম বক্তব্য ছিল—আমি এমন একটি গির্জা চাই, যা হবে সকলের।
৩. অ্যাপোস্টলিক প্রাসাদে বসবাস করতে চাননি তিনি
ফ্রান্সিসই প্রথম পোপ যিনি অ্যাপোস্টলিক প্রাসাদে বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এটি ছিল পোপদের বসবাসের জন্য নির্ধারিত একটি অভিজাত প্রাসাদ।
অ্যাপোস্টলিক প্রাসাদের পরিবর্তে পোপ ফ্রান্সিস ডোমাস কাসা মার্টায় থাকবেন বলে জানান। এই বাসভবনে তিনি আগে থেকেই থাকতেন। পোপ নির্বাচিত হওয়ার পরেও তিনি ভ্যাটিকান ক্যান্টিনের সাধারণ খাবার খেতেন এবং সাধারণ কর্মচারীদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে যোগ দিতেন।
পোপ ফ্রান্সিসকে নিয়ে ‘দ্য গ্রেট রিফর্মার’ নামে একটি বই লিখেছেন অস্টেন ইভেরি। তিনি এই বইয়ে লিখেছেন, ‘পোপ একজন দুর্দান্ত ট্যাঙ্গো নৃত্যশিল্পী। তিনি তরুণীদের সঙ্গেও দুর্দান্ত নাচতে পারতেন। ২০১০ সালে পোপ ফ্রান্সিস বলেছিলেন, ‘ট্যাঙ্গো আমার গভীর থেকে আসে।’
৫. নাইট ক্লাবে কাজ করতেন ফ্রান্সিস
পোপ হওয়ার আগে বিচিত্র ধরনের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি ঝাড়ুদারের কাজ করেছেন, একটি রাসায়নিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন এবং উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ফ্রান্সিসের সবচেয়ে অদ্ভূত পেশা ছিল নাইট ক্লাবের ‘বাউন্সার’। এই পেশাদারদের দায়িত্ব ছিল কেউ গন্ডগোল করলে তাদের নাইট ক্লাব থেকে বের করে দেওয়া।
৬. একটি ফুসফুস ছিল পোপ ফ্রান্সিসের
শৈশবে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের কারণে একটি ফুসফুস বাদ দিতে হয়েছিল ফ্রান্সিসকে। এ কারণে বাকি জীবন তাঁকে একটি ফুসফুস নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়েছে।
৭. ধর্মযাজকের ‘তথাকথিত মর্যাদা’ মানতেন না
ধর্মযাজকদের তথাকথিত মর্যাদা’ সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি প্রায়ই ভ্যাটিকানের বাইরে চলে যেতেন। একবার তিনি ব্যক্তিগতভাবে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করার জন্য ভ্যাটিকানের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। তখন অসংখ্য ভক্তরা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল এবং ছবি তুলেছিল। এ ছাড়া ২০২২ সালে করোনা মহামারির সময়েও তিনি ভ্যাটিকানের বাইরে একটি গানের দোকানে গিয়েছিলেন যেখানে বাখ এবং মোজার্ট সঙ্গীতের রেকর্ড ছিল।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময়ে শিশুরা তার কাছে চলে যেত। তিনি বাধা দিতেন না। বরং শিশুর অভিভাবকদের বলতেন, ‘শিশুদের আমার কাছে আসতে দাও।’
একবার এক বক্তব্যে পোপ ফ্রান্সিস বলেছিলেন, ‘পোষা প্রাণিদের যত্নআত্তি করার চেয়ে এতিমখানা থেকে শিশুদের দত্তক নেওয়া বেশি উত্তম।’ তাঁর এই বক্তব্যের পর বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল।
৯. ১৩০০ বছরের মধ্যে ফ্রান্সিস ছিলেন ইউরোপের বাইরে থেকে নির্বাচিত প্রথম পোপ
ইউরোপ মহাদেশ থেকে পোপ নির্বাচিত হওয়া যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। সেই ধারায় প্রথম ছেদ টানেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি ছিলেন ১৩০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম পোপ যিনি ইউরোপের বাইরে থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন আমেরিকা মহাদেশ থেকে নির্বাচিত প্রথম পোপ।
১০. নিজের সমাধি প্রস্তুত করে গেছেন পোপ ফ্রান্সিস
চার্চের ইতিহাসে বেশির ভাগ পোপের সমাধি রয়েছে ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার বিভিন্ন গুহায়। কিন্তু পোপ ফ্রান্সিস বলেছিলেন, তাঁর সমাধি হবে রোমের সেন্ট মেরি মেজর ব্যাসিলিকায়। এরপর তিনি সেখানে তাঁর সমাধি প্রস্তুত করেন।
তথ্যসূত্র: সিএনবিসি, এবিসি নিউজ, ডমিনাস ইএসটি ও ক্যাথলিক নিউজ এজেন্সি