দশ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রী, মেয়াদ শেষ করতে পারেননি কেউই

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করছেন। এর মাধ্যমে গত এক দশকে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। ব্রেক্সিটের পর গত কয়েক বছরে ব্রিটেন নিজের মতো করে চলার চেষ্টা করছে তবে উচ্চ ঋণ এবং ক্রমবর্ধমান কল্যাণমূলক খাতের ব্যয়ের কারণে ধুঁকতে থাকা অল্প-প্রবৃদ্ধির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারেনি। তার ওপর যুক্ত হয়েছে বর্তমান সময়ের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। আর এরই প্রভাব দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে। গত ১০ বছরের দায়িত্বে আসা ৬ জন প্রধানমন্ত্রীর কেউই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।

জুন ২০১৬:  ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রেক্সিটের পক্ষে ৫২ থেকে ৪৮ শতাংশ ভোট দিয়ে বিশ্বকেই ধাক্কা দেয় ব্রিটিশরা। এর মাধ্যমেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসে দেশটি। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটে পড়ে যুক্তরাজ্য। ফলশ্রুতিতে দেশটির কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। আর তার স্থলে আসেন থেরেসা মে।

জুন ২০১৭: ব্যর্থ আগাম নির্বাচন
থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন। সংসদে ব্রেক্সিট আইন পাস করার জন্য বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তিনি আগাম নির্বাচন ঘোষণা করেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে কনজারভেটিভরা তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। পরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের পক্ষে থাকা ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করে।

মে ২০১৯: মে-র বিদায়, দায়িত্বে বোরিস জনসন
ব্রিটেন কীভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাবে, তা নিয়ে সংসদীয় অচলাবস্থা ভাঙতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন থেরেসা মে। এ সময় দৃশ্যপটে আসেন ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ বরিস জনসন। কনজারভেটিভ পার্টির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।

ডিসেম্বর ২০১৯: কনজারভেটিভদের বড় জয়
ব্রেক্সিট নিয়ে সংসদ অচল হয়ে যাওয়ার পর বোরিস জনসনও আগাম নির্বাচন ঘোষণা করেন। ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’, এই স্লোগানে প্রচারণা চালিয়ে কনজারভেটিভ পার্টিকে বড় জয় এনে দেন। এটি ছিল ১৯৮৭ সালে মার্গারেট থ্যাচারের পর সবচেয়ে বড় জয়। 

জানুয়ারি ২০২০: ব্রেক্সিট সম্পন্ন
জনসন তাঁর পাওয়া গণরায় ব্যবহার করে ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করিয়ে নেন। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যায় এবং এই জোট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইতিহাস গড়ে।

জুলাই ২০২২: বরিস জনসন ক্ষমতাচ্যুত 
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে জনসনই ছিলেন ব্রিটেনের নেতা।  একপর্যায়ে তিনি নিজেও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে একের পর এক কেলেঙ্কারি এবং ভুল সিদ্ধান্তের ধকল কাটিয়ে উঠতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজ দলের মন্ত্রীদের বিদ্রোহের মুখে পড়েন তিনি। ফলে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন জনসন।

সেপ্টেম্বর ২০২২: লিজ ট্রাস
জনসনের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার লড়াইয়ে ঋষি সুনাককে পরাজিত করেন লিজ ট্রাস। তহবিলবিহীন কর ছাড়ের সুবিধা সম্বলিত তাঁর মিনি-বাজেট আর্থিকখাতে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করে। ফলে ঋণের খরচ হু হু করে বেড়ে যায় এবং রাজনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের যে সুনাম ছিল তা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। মাত্র ৪৪ দিন দায়িত্ব পালনের পরই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

অক্টোবর ২০২২: ঋষি সুনাক
ব্যপক রাজনৈতিক টানা পোড়েনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ঋষি সুনাক। তিনি সরকারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। অর্থনীতি, অবৈধ অভিবাসন বন্ধ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির ওপর জোর দিয়ে তিনি পাঁচটি মূল প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুনাক উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্য নিয়ে ইইউ-এর সাথে একটি চুক্তি করেন, যা এই জোটের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটায়।

মে ২০২৪: ফের নির্বাচন
জনমত জরিপে লেবার পার্টির চেয়ে প্রায় ২০ পয়েন্টে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ৪ জুলাইয়ের জন্য সাধারণ নির্বাচনের ডাক দেন ঋষি সুনাক।

জুলাই ২০২৪: কিয়ের স্টারমার
২০২৪ সালের ৫ জুলাইয়ের নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমার বলেছিলেন, ‘আমরা বলেছিলাম বিশৃঙ্খলা শেষ করব এবং আমরা তা করব।’ এর দুই মাসের মাথায় স্টারমার জানান, লেবার পার্টি উত্তরাধিকার সূত্রে একটি অর্থনৈতিক ব্ল্যাক হোল পেয়েছে। তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’

অক্টোবর ২০২৪: লেবার পার্টির প্রথম বাজেট
অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস বার্ষিক ৪০ বিলিয়ন পাউন্ডের কর বৃদ্ধির ঘোষণা দেন। এতে করের বোঝা পৌঁছায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে। স্বাভাবিকভাবেই এ সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৫:  রিফর্ম ইউকে পার্টির উত্থান
এ পরিস্থিতির মধ্যে ব্রিটেনে উত্থান ঘটে ডানপন্থী ও অভিবাসন বিরোধী দল 'রিফর্ম ইউকে' পার্টির। একটি জাতীয় জনমত জরিপে দলটি প্রথমবারের মতো লেবার পার্টিকে ছাড়িয়ে যায়। ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম নেতা নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন এই দলটি এরপর থেকেই জরিপগুলোতে শীর্ষে রয়েছে।

মে ২০২৬: স্থানীয় নির্বাচনে বিপর্যয়
ইংল্যান্ডের স্থানীয় সরকার এবং স্কটিশ ও ওয়েলশ অ্যাসেম্বলির নির্বাচনে লেবার পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। এর ফলে স্টারমারের দেশ শাসনের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয় এবং এই পরাজয়ের প্রধান সুবিধাভোগী রিফর্ম ইউকে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং পদত্যাগ করেন। একই সাথে স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর অনাস্থার কথাও জানান তিনি।  তিনি একটি নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের আহ্বান জানান এবং নিজেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

জুন ২০২৬: প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলির পদত্যাগ
এক মাসের মাথায় প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বরাদ্দ নিয়ে মাসব্যাপী বিরোধের জেরে পদত্যাগ করেন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি। ক্রমবর্ধমান হুমকি থেকে দেশকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দে স্টারমার ব্যর্থ হয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। এর মধ্যে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম উত্তর ইংল্যান্ডের একটি নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে পার্টিকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে জয়ী হন। এর ফলে তাঁর ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে আসার পথ সুগম হয়।