সোমবারে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেই ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর বাড়ছে চাপ। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের বিষয়ে সতর্ক থাকবে দেশগুলো—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া দেশগুলোকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজাই।
তেহরানের কৌশল হতে পারে ৩ ধাপে—প্রথমেই আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা; ব্যর্থ হলে হামলা। শেষ ধাপে হরমুজের বাইরে বিকল্প রপ্তানি পথও লক্ষ্যবস্তু করা, যার মধ্যে রয়েছে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি এই সতর্কতাকে অনেকটা আল্টিমেটাম হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘ইরান এখন হামলার আগেই প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছে। সম্ভাব্য হুমকি দেখা দেওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া এবং হামলা হলে বড় ধরনের পাল্টা আঘাত করাই তেহরানের নতুন নীতির অংশ।’
বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ভৌগোলিক কারণে ইরানের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। ফলে মার্কিন অর্থনৈতিক চাপে তারা কতটা যুক্ত হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইরানের হামলায় ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি চাপে পড়েছে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ হরমুজ প্রণালিনির্ভর হওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
২০২২ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল আরব আমিরাত। তবে গত সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আবুধাবি। যদিও দায় অস্বীকার করেছে তেহরান।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সম্মত হয় সৌদি আরব ও ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী সংঘাতের চেয়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাকেই নিরাপদ মনে করেছিল রিয়াদ।
ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভূগোল বদলাতে পারবে না; ইরানের পাশেই তাদের থাকতে হবে। তাই ইরানের পতন হলে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তা তারাও চায় না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি বলেন, ‘কূটনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আস্থা কম হলেও মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশই আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধ চায় না। বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত এখন অনেক কম। ফলে দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন-ইরান সংঘাত আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।’
১৯৭৯ সাল থেকেই নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরি হলেও, ২০১৮ সালে চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবারও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে টোল নিয়ে একটি খসড়া আইনকে সমর্থন করেছে ইরানি সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশন। এতে বলা হয়েছে, এই রুট দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে তেহরানের নির্ধারিত ফি দিতে হবে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চরম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ঘোষণার আগে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো তেহরানকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক খাতকে অচল করে দেওয়া।
অন্যদিকে, আইআরজিসির মুখপাত্র সরদার মোহেবি বলেন, তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার অর্থ সামরিক পরাজয়ের এক নীরব স্বীকৃতি।
এর আগে, সর্বাত্মক অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধের মধ্যেও ইরান অটল রয়েছে বলে জানান দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।