ইসরায়েলের ভেতরে ভয়াবহ এক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। দেশ ছাড়ছেন বহু মানুষ। আর যারা যাচ্ছেন, তাদের বড় একটি অংশ সাধারণ মানুষ নন—চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং উচ্চ আয়ের পেশাজীবী। মাত্র তিন বছরে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মেধাবী ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন। প্রশ্নটা তাই শুধু কতজন চলে গেলেন, তা নয়। ইসরায়েল থেকে যদি সবচেয়ে দক্ষ মানুষগুলোর একটি অংশই বেরিয়ে যেতে থাকে, তাহলে কয়েক বছর পর দেশটির চেহারা কেমন হবে?
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৫০ ৯ জন ইসরায়েলি অন্তত টানা তিন মাস দেশের বাইরে ছিলেন। এক দশক আগে একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানেই দেশ ছাড়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যারা চলে যাচ্ছেন, তাদের পরিচয় নিয়ে। গবেষণার তথ্য বলছে, দেশ ছাড়াদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত মানুষের হার সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি। স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪ সালেই ৫৩০ জন চিকিৎসক ইসরায়েল ছেড়েছেন। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলেই চিকিৎসাবিদ্যা পড়েছিলেন। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু জনসংখ্যা কমে যাওয়ার নয়—এখানে সামনে আসছে দক্ষ জনশক্তি হারানোর আশঙ্কা।
চিকিৎসা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ মানুষ কমতে থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো অর্থনীতিতে। ইসরায়েলের ধনী ও উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের মধ্যেও দেশ ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, যারা দেশ ছেড়েছেন তাদের আগের বছরের গড় আয়ও তুলনামূলক অনেক বেশি।
এর পেছনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষক ও বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মূল সমস্যা তৈরি হবে যদি এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর সবচেয়ে চিন্তার জায়গা হলো, একবার মানুষ দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান শুরু করলে তাদের একটি অংশ আর ফিরে নাও আসতে পারে।
ইসরায়েল এখনো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। দেশটির প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও গবেষণা খাতও এখনো গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা ধরে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—যে দেশ তার সবচেয়ে দক্ষ মানুষদের ধরে রাখতে না পারে, তার শক্তির ভিত কতটা নিরাপদ? আজ যারা তিন মাসের জন্য বাইরে যাচ্ছেন, তাদের কতজন ফিরবেন—আর কতজন নতুন জীবন গড়ে স্থায়ীভাবেই থেকে যাবেন বিদেশে? এই উত্তর এখনো অজানা। আর এই স্রোত যদি চলতেই থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো সীমান্তের বাইরে নয়—নিজের দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ভিড়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে।



