বৈশ্বিক মঞ্চে চীনকে প্রতিহত করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি–উভয় দলের মধ্যে ঐকমত্য আছে। চীনের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি খাতে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক প্রভাবকে ঘিরেই ওয়াশিংটনের নীতি আবর্তিত হচ্ছে। এও অনেক দিন হলো। কিন্তু করোনা‑পরবর্তী সময়ে চীনের অর্থনৈতিক সংকট, যুবাদের মধ্যে বেকারত্বের উচ্চহার, আবাসন খাতে ক্রমবর্ধমান সংকট, উচ্চ সরকারি ঋণ ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে মার্কিন অনেক পরামর্শক ও নীতিপ্রণেতা বলতে চাইছেন–চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট সংকুচিত হবে। ফলে সামরিক বিবেচনায় চীন নিয়ে আমেরিকার চিন্তিত হওয়ার তেমন কিছু নেই। বাস্তবতা কিন্তু সে কথা বলে না। চীনের সামরিক বাজেট বরং বাড়ছে। আর ওয়াশিংটনও বিষয়টি একেবারে ছেড়ে বসে নেই।
মার্কিন সাময়িকী ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে অক্টোবরের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন নীতিপ্রণেতাদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে চাইছেন–চীনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অতিকথন আছে। এটি অতটা উন্নত নয় যে, তা মার্কিন সামরিক সক্ষমতাকে খুব শিগগিরই চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিন্তু এই ধারণা চীনের অর্থনৈতিক ও প্রাযুক্তিক সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন দ্বিদলীয় ঐকমত্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
ফরেইন অ্যাফেয়ার্স বিষয়টি স্পষ্ট করতে চীনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্পর্কিত কিছু তথ্য ধরেছে। তারা বলছে, অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও চীনের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ছে, যা কিনা এখন যুদ্ধ সময়ের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। তারা খুব দ্রুততার সাথে আমেরিকাকে প্রতিহত করতে নানা ধরনের উন্নত অস্ত্র তৈরি করছে। শুধু তাই নয় এই প্রতিহতের বিষয়টি যদি ব্যর্থও হয়, তাহলে যেন পরাশক্তির যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়, সে প্রস্তুতিও তারা নিচ্ছে। এরই মধ্যে বিপুল ও বিচিত্র ধরনের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় তারা আমেরিকার কাছাকাছি চলে এসেছে। কোনো ক্ষেত্রে এমনকি ছাড়িয়েও গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ নির্মাতা এখন চীন, যার সক্ষমতা আমেরিকার চেয়ে প্রায় ২৩০ গুণ বেশি। ২০২১‑২৪ সময়ে চীন চার শতাধিক আধুনিক যুদ্ধবিমান, ২০টি বড় রণতরী তৈরি করেছে। একই সময়ে তারা পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা দ্বিগুণ করেছে। আর ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। নতুন ধরনের স্টিলথ বম্বারও তারা নিয়ে এসেছে। একই সময়ে তারা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ বাড়িয়েছে ৫০ শতাংশ। বর্তমানে চীন যে হারে অস্ত্র উৎপাদন ও নতুন ধরনের অস্ত্রের নকশা করছে, তা আমেরিকার তুলনায় ৬‑৭ গুণ বেশি।
চীনের প্রতিরক্ষা খাতের এই সম্প্রসারণকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো‑প্যাসিফিক কমান্ডের সাবেক কমান্ডার অ্যাডমিরাল জন অ্যাকিলিনো বর্ণনা করেছেন ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে দ্রুত গতির ও ব্যাপক মাত্রার সম্প্রসারণ’ হিসেবে।
এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ফরেইন অ্যাফেয়ার্স বলছে, চীন এখন সামরিক খাতে ‘হেভিওয়েটে’‑এর পর্যায়ে পড়ে, যার সাথে আমেরিকা ঠিক পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন ইউরোপ ও এশিয়ার দিকে অক্ষশক্তি অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এই বাহিনীকে ‘গণতন্ত্রের অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। বর্তমানে আমেরিকার দিক থেকে ঠিক এমনই একটি উদ্যোগ দরকার। মার্কিন সামরিক উৎপাদন অনেকটা থমকে আছে। তা চীনকে মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। আর ইন্দো‑প্যাসিফিক অঞ্চলে বা এর সাথে এশিয়া ও ইউরোপে (রাশিয়া‑ইউক্রেন যুদ্ধ) একসঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে সেখান থেকে জয় বের করে আনার তো প্রশ্নই আসে না। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমেরিকাকে দ্রুতগতিতে এগোতে হবে।
এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভাষ্যতেও দেশটির এই সামরিকায়নের প্রসঙ্গটি পরিষ্কার। সর্বক্ষেত্রে জাতি হিসেবে চীনকে এগিয়ে নিতে তিনি বিশ্বমানের সামরিক বাহিনী থাকাটাকে মুখ্য শর্ত হিসেবে মনে করেন। এ বিষয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন তিনি। এ কারণেই সামরিকায়নের চাহিদা মেটাতে বিস্তৃত পরিসরের প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছেন তিনি, যার মধ্যে রয়েছে হার্ডওয়্যার (জাহাজ, যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক ও ক্ষেপণাস্ত্র) ও সফটওয়্যার (নির্দেশ, নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ ও গোয়েন্দা নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার)। গত এক দশকে চীন এ খাতে এমন বিনিয়োগ করেছে যে, দেশটি আমেরিকার মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চীনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে চারটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি হলো–অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন অব চায়না ও চায়না স্টেট শিপবিল্ডিং। অথচ এক দশক আগেও এমন শীর্ষ ১০০ কোম্পানির বৈশ্বিক তালিকাতে চীনের একটিও ছিল না। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি থেকে আয়ের তালিকার শীর্ষ ১২টি কোম্পানির মধ্যে চীনের ৫টি আছে। অথচ এক দশক আগেও এ তালিকায় চীনের কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। বর্তমানে চীনের কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজারে মার্কিন কোম্পানি লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স (রেথিওন), বোয়িং, নরথ্রপ গ্রুমান ও জেনারেল ডায়নামিকসের মতো কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা ও ব্যাপ্তির সাথে পাল্লা দিচ্ছে।
চীনের এই অগ্রগতি শুধু অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের সংখ্যা বিচারে নয়। বরং গত কয়েক বছরে দেশটি এ খাতে গেবষণার মাধ্যমে নতুন নতুন সব অস্ত্রের মজুত করেছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলা যায় ক্যারিয়ার‑বেজড অ্যাভিয়েশন, হাইপারসনিক, প্রপালশন ব্যবস্থার মতো অগ্রসর প্রযুক্তির কথা। এগিয়েছে নজরদারি ও কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার উন্নয়নে। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় চীনা নৌবাহিনীর কথা, যার জাহাজ তৈরির সক্ষমতা এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড়। ফরেইন অ্যাফেয়ার্স জানাচ্ছে, চীন আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডের সংখ্যা ১০০০–এ উন্নীত করতে চায়, যা ২০১৯ সালে ছিল ২০০টি। ফলে সকল অংশেই দেশটি যুদ্ধ বাস্তবতা মাথায় রেখে সামরিকায়নের পথে হাঁটছে।
তবে এসব সত্ত্বেও এখনো সামরিক সক্ষমতায় আমেরিকার চেয়ে চীন পিছিয়েই আছে বলতে হবে। নৌবাহিনীর কথাই বলা যাক। চীনের যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা আমেরিকার চেয়ে বেশি হলেও তা মার্কিনগুলোর চেয়ে ঢের ছোট। একইভাবে অস্ত্র পরিবহনেও পিছিয়ে। মার্কিন রণতরীগুলোর তুলনায় চীনা রণতরীগুলো ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহন করতে পারে অর্ধেক। আবার মার্কিন নিউক্লিয়ার‑পাওয়ারড সাবমেরিনগুলো প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক এগিয়ে। একইভাবে যুদ্ধবিমানের দিক থেকেও অনেক এগিয়ে আমেরিকা। বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান এফ‑২২ ও এফ‑৩৫ তাদেরই। তবে চীন ক্রমেই তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত ড্রোন প্রযুক্তিতে চীন গত কয়েক বছরে অনেক এগিয়েছে। আর এগিয়েছে মহাকাশ গবেষণা ও এ সম্পর্কিত প্রযুক্তিতে। শুধু ২০২৩ সালেই দেশটি ৬৭টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ইয়াোগান‑৪১ এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, যা পৃথিবীপৃষ্ঠে চলাচলকারী গাড়ি আকৃতির বস্তুকেও শনাক্ত করতে পারে। আর আছে তাদের পদাতিক, যা বিশ্বে বৃহত্তম।
এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই মার্কিন পত্রিকা ফরেইন অ্যাফেয়ার্স বলছে, চীন আমেরিকার সাথে যুদ্ধের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিপরীতে আমেরিকা অনেকটা ‘সরল বিশ্বাসে’ সবকিছু দেখার ভূমিকায় আছে।
মার্কিন পত্রিকা হিসেবে এবং বিশেষত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বৈশ্বিক প্রচারকের অন্যতম ঘুটি হিসেবে ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের এই অবস্থান বুঝতে কষ্ট হয় না। তারা যেটা বলছে না, তা হলো–চীন না হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমেরিকা কি যুদ্ধে জড়িয়ে নেই। গত কয়েক দশকে সরাসরি বা পরোক্ষ–যেকোনো পন্থাতেই যুদ্ধ ছাড়া আমেরিকা ছিল কি? এখানে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে এবং ইউক্রেনের উদাহরণ শুধু সামনে রাখলেই চলে। এর সাথে যখন দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন মিত্রদের রক্ষায় ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি এবং তা রক্ষায় অঞ্চলটিতে নিয়মিত বিরতীতে সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়া, ন্যাটো মিত্রদের মাধ্যমে নৌ‑টহল জারি রাখা ইত্যাদিকে বিবেচনায় রাখা হবে, তখন চীনের এই সামরিকায়নের প্রসঙ্গটি ভালোভাবে বোঝা সম্ভব। কোনটি আক্রমণাত্মক, আর কোনটি রক্ষণাত্মক, তা সহজেই বুঝতে পারা যায়।
কারণ, ইতিহাস ঘাটলে অন্য দেশে চীনের সামরিক আগ্রাসন চালানোর তেমন নজির পাওয়া না গেলেও আমেরিকার তরফে এমন নজির ভুরিভুরি। ফলে ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের চীন প্রশ্নে ওয়াশিংটনকে ‘নীরিহ’ এবং ‘আক্রান্ত হওয়ার’ কাতারে রাখা হলেও, তার ভেতরের সত্যটি ঠিক এমন নয়। যদিও এই প্রতিবেদন চীনের সামরিক সক্ষমতার ক্রমবৃদ্ধির হিসাবের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সামনে উপস্থিত আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করছে। কারণ, দুই পরাশক্তি সম্মুখ সমরে জড়ালে এমনকি এই বঙ্গের নিতান্ত নিভৃতচারী ও সত্যিকারের নীরিহ লোকটিও যে সে আঁচ থেকে রক্ষা পাবে না, তা আর না বললেও চলে।



