ডিজিটাল ব্যাংকিং চালুর জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:২১ পিএম

সহজ-সাশ্রয়ী হওয়ায় বিশ্বের অনেক দেশ এখন ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থায় যাচ্ছে। দেশেও ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন বেড়েছে। আরটিজিএস, এনপিএসবি, বিইএফটিএনের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এখন প্রচুর লেনদেন হচ্ছে। বর্তমানে আর্থিক মূল্যের দিক থেকে ৩০ শতাংশ লেনদেন হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নগদ লেনদেনও হচ্ছে। অভ্যাসগত বিষয়ের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লার কেনাকাটায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চাইলেও অনেকে ডিজিটাল পরিশোধ করতে পারছে না।

বাংলাদেশে নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে খরচ। নগদ লেনদেন করতে গিয়ে টাকা ছাপানো থেকে শুরু করে সরবরাহ পর্যন্ত–প্রতিবছর অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। তাই নগদবিহীন লেনদেন বা ক্যাশলেস ব্যবস্থা জোরদারে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বা নবায়নের ক্ষেত্রে কিউআর কোডে পেমেন্ট নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, রাতারাতি নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা কার্যকর করা যাবে না। তবে ধাপে ধাপে যেন এটা করা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একজন ব্যক্তি ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্টে টাকা যাওয়ার পর বেশির ভাগ খরচ যেন ডিজিটালে করতে পারে, সেই উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে শহর কিংবা গ্রামে কেউ চাইলেও ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারে না। এটা সহজ করতে ব্যাংক ও এমএফএসের কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের জন্য বাংলা কিউআরে পরিশোধ বাড়াতে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে।

ডিজিটাল ইকো সিস্টেমের অংশ হিসেবে সত্যিকারের ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী বছরের মধ্যেই দেশে ডিজিটাল ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এ জন্য আগ্রহীদের থেকে গত আগস্টে আবেদন চাওয়া হয়েছে। এ রকম একটি ব্যাংক করার জন্য প্রযুক্তি সক্ষমতা ছাড়াও ৩০০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন লাগবে।

এক যুগ আগে মোবাইল ফোন থেকে মোবাইল ফোনে টাকা পাঠানোর সুবিধা যেভাবে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, ডিজিটাল ব্যাংক তার চেয়েও বেশি সুবিধা নিয়ে আসছে। এর মাধ্যমে টাকা জমা, ঋণ নেওয়া, প্রবাসী আয় গ্রহণসহ সব ধরনের আর্থিক সেবা এখন হাতের মুঠোয় চলে আসবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রায় সব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছে গেছে এবং স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও ব্যাপক হারে বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল ব্যাংক অত্যাধুনিক ব্যাংকিং সেবা দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারবে। কোনো ধরনের শাখা স্থাপন ছাড়াই সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সেবার খরচ অনেক কমে যাবে, যা সাধারণ মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও সহজ করবে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৪০০-এর বেশি ডিজিটাল ব্যাংক রয়েছে। আগামী বছরের মধ্যেই দেশে ডিজিটাল ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এর আগে ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে বিতর্ক ওঠায় এবার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চাইছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবেদনকারীদের ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৩১ ধারা অনুযায়ী নীতিগত লাইসেন্স দেওয়া হবে। এ জন্য উদ্যোক্তাদের সিলগালা করা আবেদনপত্রের সঙ্গে ৫ লাখ টাকা প্রসেসিং ফি ও সব নথি জমা দিতে হবে। নথি সরাসরি ও ই-মেইলের মাধ্যমে জমা দেওয়া যাবে।

ডিজিটাল ব্যাংক ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। গ্রাহকদের সুবিধার জন্য ভার্চ্যুয়াল কার্ড ও কিউআর কোডের মতো প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। লেনদেনের জন্য গ্রাহকেরা অন্য ব্যাংকের এটিএম বা এজেন্ট সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে হিসাব খোলা থেকে শুরু করে যেকোনো সেবা নেওয়ার জন্য কোথাও যেতে হবে না, যেকোনো স্থান থেকে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করেই সেবা নেওয়া যাবে।

বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকের নীতিমালায় বলা হয়েছে, এটি বড় বা মাঝারি শিল্পে ঋণ দিতে পারবে না। তবে ছোট আকারের ঋণ দিতে পারবে। এ ছাড়া কোনো এলসি খোলার অনুমতি থাকবে না। বর্তমানে দেশে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস চালু থাকলেও, সেগুলো ডিজিটাল ব্যাংকের একটি অংশমাত্র। ডিজিটাল ব্যাংক হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক, যা আর্থিক সেবাগুলোকে আরও সর্বজনীন করে তুলবে।

মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই ডিজিটাল লেনদেনের অভ্যাস তৈরি করেছে। তবে তাদের সেবার ধরন সীমিত। ডিজিটাল ব্যাংক এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারবে। যেমন এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত নিতে বা ঋণ দিতে পারে না। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংক সরাসরি আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ করতে পারবে। সম্প্রতি এমএফএসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণও বেড়েছে। ডিজিটাল ব্যাংক হলে গ্রাহকেরা সরাসরি তাঁদের অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স গ্রহণ করতে পারবেন, যা খরচ কমাবে।

তবে, বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকের যৌক্তিকতা ও সময়োপযোগিতা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও, আইসিটি অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা যথেষ্ট না হওয়ায় এখনই এ উদ্যোগ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক এখনো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। পিসিআই-ডিএসএস বা আইএসও সার্টিফিকেশন অনেক ব্যাংকই অর্জন করতে ব্যর্থ। ফলে অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং ও তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। আর যদি এমন অবস্থায় ডিজিটাল ব্যাংক চালু করা হয়, তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেও মনে করেন অনেকে। তাই, ডিজিটাল ব্যাংক চালু করার আগে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা জরুরি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এখনকার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিদ্যমান ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। এসব সমস্যা সমাধান না করে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হলে তা পুরো আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকিং যে ভবিষ্যতের পথ, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি। তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়, বরং সময় নিয়ে সব দিক বিবেচনা করে ধাপে ধাপে ডিজিটাল ব্যাংক চালু করাই হবে সবচেয়ে যুক্তিসংগত ও নিরাপদ পথ। এক কথায়, ডিজিটাল ব্যাংক একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে, তবে তা বাস্তবায়নে দরকার সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা।

বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে ৫টি ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংক আসলে কী? কেনই বা নতুন করে এতগুলো ডিজিটাল ব্যাংক? আর সাধারণ ব্যাংকের সঙ্গে এর পার্থক্যই বা কোথায়? চলুন,...
ভারতের জন্য আবারও বড় অর্থনৈতিক চাপের খবর! রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ না করলে ভারতের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর রাস্তা খুলে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই মধ্যে...
আচ্ছা, মনে আছে কিছুদিন আগেও যখন বিয়ের বাজারে সোনা কিনতে গিয়ে হাত পুড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল? এ বছরের শুরুর দিকে তো বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম এমন এক ইতিহাস গড়েছিল যে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। প্রতি...
হঠাৎ মাঝরাতে মোবাইলের ব্যালেন্স শেষ? কিংবা মাসের শেষে পকেটে টান, অথচ বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিল দেওয়ার শেষ তারিখ আজই? এই জরুরি পরিস্থিতিতে আর কোনো চিন্তা নেই! কারণ, এবার সরাসরি আপনার ব্যাংকই আপনাকে...
দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম আবারও কমেছে। প্রতি ভরিতে স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৬৯১ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি - বাজুস। শনিবার সকাল ১০টা থেকে নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে।
ব্যাংককের গভর্নর জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজধানীর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো। নিচু এলাকা ও খালপাড়ের বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় মালামাল এবং যানবাহন উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।...
পাহাড়, সমুদ্র, নদী, হাওর নিয়ে প্রকৃতির বৈচিত্রময় সম্ভার বাংলাদেশ। তবে পাঁচ দশকের বেশি সময়েও পর্যটনে হয়নি কাঙ্ক্ষিত বিকাশ। প্রায় দেড় হাজার পর্যটন স্পট চিহ্নিতের লক্ষ্যও বাস্তবায়নি হয়নি এখনো। বিদেশি...
সদ্য সাবেক উপাচার্য আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা পঞ্চম দিনের মতো ক্লাস, পরীক্ষা বর্জন করে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট)...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর