‘চুলা জ্বলছে না, গ্যাস নেই’—অনলাইনে খুঁজলে এমন অসংখ্য নিউজের হেডলাইন মিলবে সহজেই। অথচ দেশে এলপিজি আছে যথেষ্ট, আমদানিও হয়েছে পর্যাপ্ত। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—গ্যাস গেল কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা—এনএসআই সামনে এনেছে চোখ কপালে তোলার মতো বিস্ময়কর তথ্য। কী আছে সেই প্রতিবেদনে?
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কী আছে?
পাঁচটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করা এলপিজির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাজারে না ছেড়ে মজুত করে থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনএসআই সরকারের কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও উল্লেখ করেছে—আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনা।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা এখনো যাচাই করা হয়নি। অর্থাৎ এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিই ইচ্ছাকৃতভাবে এলপিজি আটকে রেখেছে।
কিন্তু এনএসআই কেন বিষয়টিকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে?
কারণ সময়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অক্টোবর থেকে এলপিজির আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কেট প্রিমিয়াম বেড়েছে প্রায় ৬৪ ডলার প্রতি টন।
এনএসআইয়ের সন্দেহ—প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজি যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মজুত করে রাখে, তাহলে পরে বেশি দামে বাজারে ছাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আর সেটাই যদি ঘটে থাকে, তাহলে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
দেশে এলপিজির কী পরিস্থিতি?
দেশে এখন এলপিজির অবস্থা কী—এখানেই গল্পটা আরও রহস্যময়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টেও আমদানি হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন।
অর্থাৎ শুধু আমদানির পরিমাণ দেখলে সরবরাহে বড় ঘাটতির স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে এলপিজি কোম্পানিগুলোও বলছে—মজুত পর্যাপ্ত আছে।
তাহলে যদি গ্যাস থাকে, আমদানিও হয়, কোম্পানিগুলোও বলে সরবরাহ ঠিক আছে—বাজারে সিলিন্ডার মিলছে না কেন? আর মিললেও এত বেশি দাম কেন? ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা!
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু বাজারে বাস্তব চিত্র একেবারেই আলাদা।
এক সপ্তাহ আগে অনেক জায়গায় দাম ছিল প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা। এখন কোথাও কোথাও নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
অর্থাৎ সরকারি দামের তুলনায় একেকটি সিলিন্ডারে গ্রাহককে দিতে হচ্ছে প্রায় ১ হাজার টাকারও বেশি অতিরিক্ত। শুধু বাসাবাড়ি নয়—হোটেল, রেস্তোরাঁ, ছোট ব্যবসা—সব জায়গাতেই এর প্রভাব পড়ছে।
এক পক্ষ বলছে—‘সমস্যা নিচের স্তরে।’ অন্য পক্ষ বলছে—‘সমস্যা ওপরের স্তরে।’ আর মাঝখানে আটকে গেছেন সাধারণ গ্রাহক।
তাঁদের একটাই প্রশ্ন—গ্যাস পাব কোথায়, আর কত টাকা দিয়ে পাব?
শুধু রান্নাঘর নয়, গাড়িতেও সংকট
এলপিজির এই সংকটের প্রভাব শুধু রান্নাঘরেই থেমে নেই। অটোগ্যাস বা এলপিজি ব্যবহার করা গাড়ির চালকরাও সমস্যায় পড়েছেন।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অনেক ফিলিং স্টেশনে অটোগ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। দেশে প্রায় ১ হাজার ১০০টি অটোগ্যাস স্টেশন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বক্তব্য।
তাদের অভিযোগ, অনেক স্টেশনে এলপিজির সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
অর্থাৎ একই সংকট—বাসার রান্নাঘরেও, গাড়ির জ্বালানিতেও।
এনএসআই কী চাইছে?
এনএসআই শুধু অভিযোগ তুলেই থামেনি। সংস্থাটি চেয়েছে, ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বড় আমদানিকারকদের কাছে থাকা এলপিজির মজুত জরুরি ভিত্তিতে যাচাই করা হোক।
কোন চালান কখন দেশে এসেছে? কখন খালাস হয়েছে? কতটা গুদামে ছিল? কতটা বাজারে ছাড়া হয়েছে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কখন বাজারে ছাড়া হয়েছে? এসব তথ্য মিলিয়ে দেখতে বলেছে সংস্থাটি।
এমনকি অক্টোবরের প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজির কতটা পরে বাজারে ছাড়া হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখার সুপারিশ করা হয়েছে।
আর যদি প্রমাণ হয় কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ আটকে রেখেছে—তাহলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
কোম্পানিগুলোর বক্তব্য কী?
কোম্পানিগুলো কী বলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে নাম থাকা ওমেরা অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সবসময় দেশে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আরেকটি প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এলপিজির চালানের গতিবিধি যাচাই করা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় নথি দিয়ে তারা কর্তৃপক্ষের প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন।
অর্থাৎ এখনো বিষয়টি তদন্ত ও যাচাইয়ের পর্যায়ে।
সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
সার্বিক পরিস্থিতিতে সামনে আসছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি আমদানি হয়েছে—তাহলে বাজারে সংকট কেন?
কোম্পানিগুলোর দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৬০০ টাকায় কেন বিক্রি হচ্ছে?
ডিলাররা দায়ী, নাকি আমদানিকারকদের সরবরাহ কমানোর অভিযোগের ভিত্তি আছে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কোথাও কি সত্যিই এলপিজি মজুত করে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হয়েছে?
এর উত্তর মিলবে তদন্তে।
কিন্তু ভোক্তাদের যে প্রশ্ন—‘গ্যাস আছে নাকি নাই’—এর উত্তর কি মিলবে শিগগিরই?


