ইসরায়েলের সামনে সমঝোতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৪, ০১:১২ পিএম

হামাসের হামলায় ইসরায়েল যে হতচকিত, বিমূঢ় হয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশটির প্রতিক্রিয়া থেকে সেটা স্পষ্ট। অবরুদ্ধ গাজা থেকে এই ধরনের হামলা হামাস চালাতে পারে, তা দেশটির নিরাপত্তাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা বা রাজনীতিকেরা কেউ ধারণা করে উঠতে পারেনি। হামাসের হামলার পর প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল যে আক্রমণে নেমেছে, তা–ও সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। হামাস ও ইসরায়েলের সংঘাতে প্রাণ গেছে দুপক্ষের হাজার হাজার সাধারণ মানুষের। এদের একটা বড় অংশ নারী ও শিশু।

এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, এর শেষ কোথায়? বলা ভালো, ইসরায়েল বা এর মিত্ররা কোথায় গিয়ে থামবে। ইসরায়েলের ঘোষিত নীতি, হামাসকে নির্মূল করা। নিরাপত্তা দিতে না পারা নেতানিয়াহু সরকারের জন্য দেশবাসীকে প্রবোধ দিতে এর চেয়ে ভালো কোনো প্রতিশ্রুতি হতে পারে না। কিন্তু এর বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ ইসরায়েলের মধ্যেই। রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলে বড় ব্যর্থতা হলো—গত ৭৫ বছরে ফিলিস্তিনিদের সাথে একটা আপস–রফায় না পৌঁছাতে পারা। প্রতিবেশী আরব ও অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়া। অথচ এটাই হতে পারত তার প্রধান রক্ষাকবচ। সেটা না করে তারা ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থ ও যুদ্ধাস্ত্রে বলীয়ান হয়ে পুরো এলাকায় শক্তিমত্তা প্রদর্শনের ভুল রাস্তায় হাঁটা শুরু করল। গত ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১২০০ ইসরায়েলির নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে তাদের হঠকারী নীতি সে দেশের সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারেনি।

ইসরায়েলের দ্বিতীয় ভুল হলো, দেড় হাজার বছরের বেশি সময় ধরে ইউরোপের দেশে দেশে অত্যাচার–নিপীড়নের শিকার হয়ে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হলোকাস্টে লাখ লাখ ইহুদিকে হত্যার ঘটনার প্রতিশোধ তারা ফিলিস্তিনিদের মেরে নিতে চায়। যে জায়গায় আজ রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল দাঁড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনিরা তো সেখানকার ভূমিপুত্র। ওই মাটির মানুষ। সুতরাং তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া বা তাদের নির্মূল করার অভিপ্রায় শুধু অন্যায্য নয়, অপরাধও বটে। বরং ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বসবাসের জন্য ইসরায়েলে আসা ইহুদি মানুষজনই দখলদার। তাদের কাছে এই দখলদারত্বের পেছনে ধর্মীয় গাঁথা ছাড়া কোনো যুক্তিই নেই। এই কথাটা কোনোভাবেই মানতে চায় না ইসরায়েল ও তার মিত্ররা। মানতে না চাওয়ার চেয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে চলে বলাই যুক্তিযুক্ত।

না মানার জন্য কী করছে ইসরায়েল? গাজায় নির্বিচারে মানুষ মারছে। এই সংখ্যা ইতিমধ্যে চার হাজার পেরিয়ে গেছে। তাহলে কী দাঁড়াল, ১২০০–র বিপরীতে ৪০০০। ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক আইন বিশারদেরা বলতে শুরু করেছেন, হামাসের হামলা যদি হয় জঘন্য, নৃশংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, তাহলে ইসরায়েলের হামলা হলো জেনোসাইড, যা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের শামিল।

ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি এসব কথা নেতানিয়াহু ও তাঁর বশংবদ দক্ষিণপন্থী ইসরায়েলি নেতাদের কানে তোলার সময় নেই। মৃত্যু সংখ্যায় যত বড় হতে থাকে, লাশের সারি যত দীর্ঘ হয়, তাঁরা মনে মনে তত খুশি হন। কিন্তু এই খুশির মধ্যে স্থায়ী কোনো সমাধান লেখা থাকে না, যা তাদের দেশের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে। সেই সূত্র ধরে আরেকটি প্রশ্ন ওঠাটা খুবই স্বাভাবিক, ইসরায়েল বা দেশটির ইহুদি নেতৃত্ব কি আদৌ ফিলিস্তিনিদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায়? সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রচণ্ড প্রভাবশালী ইহুদিরা কি এটা চায়? আমেরিকা ও ইউরোপে ইসরায়েলের মিত্রদেশগুলো কি ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরায়েলের সখ্যর পক্ষে? একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, উত্তরটা না–ই চলে আসছে।

তাহলে সমাধানটা কোথায়? গাজায় ২০–২২ লাখ ফিলিস্তিনি পরিচয়ধারী মানুষের বাস। এদের অধিকাংশ ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান। আর কিছু আছেন খ্রিষ্টান। এ ছাড়া পশ্চিম তীরে প্রায় ২৮ লাখ এবং জেরুজালেমে প্রায় ৯ লাখ ফিলিস্তিনির বাস। এ ছাড়া ২৬ লাখের বেশি অ–ইহুদি ইসরায়েলে বাস করেন, যাদের অধিকাংশ ফিলিস্তিনি মুসলমান। আর বিভিন্ন আরব দেশে ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু শরণার্থী হিসেবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ফলে গাজা, পশ্চিম তীরসহ সমগ্র এলাকায় ‘স্বপ্নের’ ইসরায়েলকে যদি শুধু ৭২ লাখের চেয়ে কম ইহুদির নিরাপদ আবাস হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে সেখানকার ৬০ লাখ ফিলিস্তিনির কী হবে? তাদের কি জাতিগতভাবে নির্মূল করা হবে– হত্যা ও বিতাড়নের মাধ্যমে? নাকি হামাসকে ঝাড়েবংশে নির্মূল করলেই ফিলিস্তিনিরা ঠান্ডা হয়ে যাবে?

ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাত। ফাইল ছবি বিষয়টাকে কী অতিসরলীকরণ করা হচ্ছে না? ১৯৮৭ সালের আগে তো হামাস ছিল না, তাহলে তখন কেন এ সমস্যা মেটানো গেল না? মেটানো হয়নি বা ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র পায়নি বলেই কিন্তু পিএলও–র পাশাপাশি হামাসের জন্ম। তবে অভিযোগ আছে, ফিলিস্তিনের এক সময়ের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসের আরাফাত ও তাঁর সংগঠন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)–কে খাটো করতে এবং গুরুত্ব কমাতে হামাসের জন্ম দিয়েছিল ইসরায়েল ও তার মিত্ররা। এটা যে ভবিষ্যতে “বরে শাপ” হবে তা তখন কেউ ভাবেনি। বরং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মকে দু–টুকরো করা হয়েছে।  ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত পশ্চিম তীর শাসন করছেন পিএলও নেতা মাহমুদ আব্বাস। অন্যদিকে গাজার নির্বাচিত শাসক হামাস। ফলে একদিকে ইসরায়েল ও এর বন্ধুরা সফল। কারণ, রাজনৈতিকভাবে ফিলিস্তিনিরা দু–ভাগ।

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, গাজায় প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একটি করে ইসরায়েলি গোলা আছড়ে পড়লেও পশ্চিম তীরে কিন্তু কিছু হয়নি। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতার ব্যাপারে দায়সারা বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়েছেন। এমনকি হামাসের কর্মকাণ্ডের তিনি নিন্দা করেননি। বিদেশি অর্থ সাহায্যে চলা একটি আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের নেতৃত্ব দেওয়া মাহমুদ আব্বাস এর বেশি আর কী–ই বা করবেন? ৮৭ বছর বয়স। ১৫ বছর ধরে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে। নতুন কোনো নেতৃত্ব নেই বা উঠে আসতে দেওয়া হয়নি। ফলে ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যেও একটা রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এর সুযোগ হামাস ও হিজবুল্লার মতো সংগঠনগুলো নেবে, এটাই দস্তুর। ফলে এটা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য যতটা দুশ্চিন্তার, ঠিক ততটাই মাথাব্যথার কারণ হওয়ার কথা ইসরায়েল ও তার বন্ধুদের জন্য।

এই সাতকাহন পড়ার পর এটা তো পরিষ্কার যে, হামাস বা ফিলিস্তিনি লোকজন কাউকেই নির্মূল করা সম্ভব না ইসরায়েলের পক্ষে। তাহলে দেশটির সামনে কী বিকল্প আছে? লন্ডনভিত্তিক ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট এ ব্যাপারে বলছে, ফিলিস্তিনিদের ভূমি জোর করে দখল করে টিকতে পারবে না ইসরায়েল; গাজায় হামাস সরকার তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য, হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহ গাজা শাসন করতে অসমর্থ; ওই এলাকায় নজরদারি করবে—এমন আরব শান্তিরক্ষী বাহিনীও পাওয়া সম্ভব না; গাজায় কোনো জনপ্রিয় সরকার প্রতিষ্ঠা অকল্পনীয়– তাহলে কী করবে ইসরায়েল? তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া গেল, তারা হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে ফেলল। কিন্তু এ কথা কী কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবে যে, হামাস চলে গেলে এর চেয়ে আরও ভয়ংকর কোনো সংগঠন আর উঠে আসবে না?

বাস্তবিকই গোড়া কেটে আগায় পানি ঢেলে ইসরায়েল–ফিলিস্তিনের মতো জটিল সমস্যার সমাধান দুরূহ, বলা ভালো অসম্ভব। কারণ ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি ভূমিপুত্রকে বছরের পর বছর অধিকার বঞ্চিত রেখে, তাদের কারাগার–সমতুল্য এলাকায় আটকে রেখে কোনো সমাধান খুঁজতে যাওয়াটা বাতুলতা মাত্র। ইসরায়েলি নেতৃত্ব এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, ততই ভালো। তাঁরা যে পথ অনুসরণ করছেন, তাতে গত ৭৫ বছরে ওই এলাকায় শান্তি তো দূরস্থান, মানুষের সামান্য নিরাপত্তাটুকুও নিশ্চিত করতে পারেননি। আর এত দিনে যখন পারেননি, তখন আগামী ৭৫০ বছরেও পারবেন, এ বিশ্বাস করা কঠিন। বরং ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে সম্মানজনক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে হয়তো ৭ অক্টোবরের ঘটনা ঘটত না। বা ঘটলেও অপরাধীরা কোনোভাবে পার পেয়ে যেত না। আর এটা করতে পারলে আরব প্রতিবেশীদের সাথে তাদের সম্পর্ক অনেক সহজ ও ঘনিষ্ঠ হতে পারত; এ জন্য আব্রাহাম অ্যাকর্ডের বা আমেরিকার দূতিয়ালির প্রয়োজন পড়ত না। এই সত্যটা যেমন ইসরায়েলকে বুঝতে হবে, তেমনি আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেনসহ ইসরায়েলের বন্ধুদেরও বুঝতে ও মানতে হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট অনলাইন

আইনশৃঙ্খলা কেবল পুলিশ বা সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি এবং সাধারণ নাগরিক–সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন, ধর্ষণ,...
‘মালয়েশিয়ায় আবার লোক নেবে।’–একটি বাক্যই যথেষ্ট। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় হিসাব। কত টাকা লাগবে? কার মাধ্যমে যাওয়া যাবে? ভিসা কবে হবে? পরিচিত কেউ আছে কি না?
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। এর পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে—এসব খাল, নদী ও জলাধারের পাড় দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে রক্ষা করা যাবে, কীভাবে ঠেকানো যাবে মাটির ক্ষয়।...
একসময় বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশের কাছে পুলিশের চাকরি ছিল স্বপ্নের চাকরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অনেক তরুণই বিসিএসের পাশাপাশি পুলিশ ক্যাডারকে ক্যারিয়ারের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে...
ইসরায়েল সৌদি আরবকে অনেক সহায়তা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েলের সহায়তার প্রস্তাব সৌদি আরবের গ্রহণ করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি। হোয়াইট...
নেত্রকোণার দুর্গাপুরে সোমেশ্বরী নদীর চরের কাশফুল চত্বরে কথা, কবিতা ও গানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘শরৎ উৎসব’। শুক্রবার বিকেলে শহীদ সন্তোষ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে বিভিন্ন এলাকা...
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও...
দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের একার নয়, এটা আমাদেরও উৎসব বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ শনিবার সকালে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির...
লোডিং...
পঠিত নির্বাচিত

এলাকার খবর