কৌতুকটার বেশ কয়েকটা ভার্সন আছে। আপাতত এ ভার্সনটাই মনে পড়ছে।
বাংলাদেশ তখনো স্বাধীন হয়নি। এক পাঞ্জাব সেনা বাংলাদেশের বাজারে গিয়ে দেখে, এক লোক বেশ কিছু মুরগি নিয়ে বসে আছে।
একটু কৌতূহল নিয়ে সেনা জিজ্ঞেস করল, ‘মুরগিকে কী খেতে দিস?’
বিক্রেতা বলল, ‘এই তো ভাত-কুড়া, এইসব।’
সেনা ক্ষেপে চড় দিয়ে বসল, ‘গাধা, ভাত খেয়েই এমন দুর্বল আর শুকনা।’
পরের সপ্তাহে আবার বাজারে গেল ওই সেনা। এবারও তার সামনে পড়ল বিক্রেতা।
আবার প্রশ্ন, ‘কী খেতে দিস?’
চড় খেয়ে বুদ্ধি খুলেছে বিক্রেতার, ‘এই তো, গম বা রুটি দিই।’
আবার চড়, ‘সাহস কত? পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ যা খায়, সেটা তুই মুরগিকে খাওয়াস।’
গালে হাত দিয়ে বসে রইল বিক্রেতা।
পরের সপ্তাহেও বাজার করতে গেল সেনা। কপাল এমন, এবারও সেই মুরগি বিক্রেতা সামনে পড়ল।
‘ওই কী খেতে দিস রে?’
বিক্রেতা আর কোনো ঝুঁকি নিল না। ‘দিনের শুরুতে সব কটাকে এক পয়সা দিয়ে দিই, নিজেরাই পছন্দমতো কিছু কিনে খায়।’
জমলো না বোধহয় কৌতুকটা। না জমলেও একটু হাসেন। মাঝে মাঝে হাসির দরকার আছে।
আমার কথাকে পাত্তা না দেন, জাতীয় দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের কথার তো ওজন আছে। বিশ্বকাপে দল যখন একের পর এক ম্যাচ হারছিল, তখন সাকিব বলেছিলেন মাঝে মাঝে হাসা ভালো।
আচ্ছা, আরেকটা গল্প বলি। না, কোনো কৌতুক না, একদম নির্জলা বাস্তব।
নব্বইয়ের দশকটা খুবই বাজে সময় কেটেছে ইংল্যান্ডের। টানা এক যুগ কোনো অ্যাশেজ জিততে পারেনি তারা। না ঘরে, না বাইরে।
তো, ২০০১ অ্যাশেজের শেষ টেস্টের ঘটনা। আগেই সিরিজ হেরে বসায় সে ম্যাচে অভিষেক হয় গাঁট্টাগোট্টা জিমি অরমন্ডের। অভিষেক ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেছেন, এমন সময় পাশ থেকে খোঁচা মেরে বসেন বিখ্যাত জমজের ছোটজন—মার্ক ওয়াহ, ‘আরে দেখ কে নেমেছে। কী করছ এখানে? ইংল্যান্ডের পক্ষে খেলার যোগ্য তো তুমি না।’
অরমন্ড আস্তে করে বলে বসলেন, ‘হয়তো না, কিন্তু আমার পরিবারে অন্তত আমিই সেরা খেলোয়াড়।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব মানেই যেন অ্যাভেঞ্জার্স এন্ডগেইমের থানোসের সেই বিখ্যাত সংলাপ, ‘আই অ্যাম ইনএভিটেবল।’ সাকিব ক্যামেরার সামনে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করবেন, সাকিব বাংলাদেশকে এশিয়া কাপের ফাইনালে নিয়ে যাবেন। সাকিব ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার জন্য নিয়ম ভেঙে শাস্তি পাবেন, সাকিবই আবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে তোলা ইনিংস খেলবেন।
সাকিব স্বপ্নের মতো বিশ্বকাপ কাটাবেন, আবার স্পট ফিক্সারের সঙ্গে আলাপের দায়ে নিষিদ্ধ হবেন। এশিয়া কাপের মাঝেই দেশে এসে শোরুম উদ্বোধন করবেন, আবার উদ্বোধন শেষে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ জেতাবেন। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে লাথি দিয়ে স্টাম্প ভাঙবেন, বোর্ডের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জুয়াড়ি প্রতিষ্ঠানের পণ্যদ্যূত হবেন।
বোর্ড তবু তাঁকেই অধিনায়ক বানাবে।
কারণ, বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব ইনএভিটেবল—অবধারিত, অবশ্যম্ভাবী, অপরিহার্য।
সাকিব জানেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের জিমি অরমন্ড। তিনি বিশ্বমানের হতে পারেন, নাও হতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে তিনিই সেরা।
সাকিব তাই যখন হাসতে বলেন, তখন হাসা যেতেই পারে। আর এমন তো না যে হাসির উপকরণের কোনো অভাব আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে।
দল বিশ্বকাপে যাচ্ছে, এমন দিনে অধিনায়ক সাক্ষাৎকার দিয়ে সদ্য সাবেক অধিনায়ককে ‘ছেলেমানুষ’ বলছেন, সিরিজ হারের দায় দিচ্ছেন। বলছেন, দলের প্রয়োজনে যেকোনো জায়গায় খেলার মানসিকতা থাকতে হয়।
সাকিব তেমন সাক্ষাৎকার দিতে গেলেন কেন? কারণ, তিনি জানতেন তামিম ইকবাল আসলেই একটা ছেলেমানুষি করবেন। দল বিশ্বকাপ খেলতে দেশ ছেড়েছে এমন সময়ে তিনি ফেসবুক লাইভে এসে বোমা ছুড়েছেন। মিডিয়াকে ব্যবহার করে নাকি তাঁকে দল থেকে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইঙ্গিতে কোচ, সাকিব ও বোর্ড সভাপতিকে দায় দিয়েছেন।
বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টের আগে দল ঘিরে এমন নাটকেও মজা না পেলে, বাকি বিশ্বের এ নিয়ে হাসাহাসি করতে দেখেও যদি হাসতে না পারেন, বুঝতে হবে ডার্ক হিউমার জিনিসটা আপনার জন্য না। না হলে, পরতে পরতেই তো মজা লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে।
একদিকে তামিম বলেছেন, তাঁকে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওপেন না করার কথা বলাতেই তিনি রাগ করে বিশ্বকাপে দলে থাকবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। অথচ আফগানদের ফজল হক ফারুকি ও মুজিব-এর বিপক্ষে তামিমের অতীত পারফরম্যান্স এমন সিদ্ধান্তের পক্ষেই বলে। ওদিকে সাকিব বলছেন, দলের ভালোর জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতি নেই। আবার এটাও বলেছেন, এমন কোনো কথা অবশ্য তাঁর জানা নেই।
জি, দেশসেরা ওপেনারকে আচমকা চার বা পাঁচে নামানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্যাকটিকাল সিদ্ধান্ত অধিনায়কের সঙ্গে কথা না বলে নিয়েছেন কোচ-এ কথা আমরা সবাই বিশ্বাস করি।
হাস্যরসের অভাব অবশ্য কোনোকালেই ছিল না এখানে। আফগানিস্তান সিরিজে তামিম জানালেন, পুরোপুরি সুস্থ নন, তবু খেলবেন। তাঁর এমন ‘দেশপ্রেম’-এ মুগ্ধ না হয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলেন হাথুরুসিংহে। এতে ‘রাগ’ করে কেঁদেকেটে অবসর নিয়ে নিলেন তামিম। একটা সিরিজের মাঝপথে!
রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তির হস্তক্ষেপে পরদিন অবসর ভাঙলেন, তবে সিরিজ আর খেললেন না। দীর্ঘ ছুটি শেষে যে কারণে অবসর ভাঙা, সেই বিশ্বকাপে গেলেন না। দাবি করলেন, ফিটনেস ইস্যু নয়। ‘নোংরামির’ মধ্যে থাকতে চান না বলেই যাননি।
আমরা তা বিশ্বাস করি।
বিশ্বকাপের আগে নিজেকে ফিট দাবি করা এক খেলোয়াড় বিশ্বকাপের পর হতে যাওয়া নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য কেন ফিট নন, এই প্রশ্ন তাই নাই-বা তুলি।
ওদিকে সাকিব আফগানিস্তানের কাছে সিরিজ হারের সব দায় তামিমের ঘাড়ে তুলে দিয়েছেন। তামিমের কারণে দলে বিকল্প ওপেনার সৃষ্টি হয়নি—এমন এক ইঙ্গিতও দিয়েছেন। বলেছেন, অগুরুত্বপূর্ণ সিরিজে তাঁর মতো অন্যরাও ছুটি নিলে এতদিনে আরও কিছু খেলোয়াড় তৈরি হয়ে যেত। কথায় ভুল নেই।
সাকিব এটাও বলেছেন, তাঁর ছুটি নেওয়া নিয়ে যে এত কথা, কখনো তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে ছুটি নেননি তিনি।
এ কথাতেও আপত্তি তোলার উপায় নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট যেহেতু হারবেই বাংলাদেশ, তাদের মাটিতে হওয়া সিরিজকে তো আর গুরুত্বপূর্ণ বলা যায় না!
অবশ্য শুধু সাকিব বা তামিম কেন, বিনোদন দিতে অন্যরাও কম যান না।
কোচ পরিবর্তন করার সময় শোনা গেছে, রাসেল ডমিঙ্গো ও স্টিভ রোডসদের মতো ‘সৃজনশীল আমলে’র নরম-সরম কোচে হবে না, তাই ‘কড়া হেডমাস্টার’ হিসেবে পরিচিত চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে আবার ফেরানো হয়েছে। কথাটা ফেলার মতো না।
আবার বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর শোনা গেল, হাথুরসিংহের কড়াকড়িতে অন্য কোচরা তো বটে, এমনকি বোর্ডের কর্মকর্তারাও বিরক্ত। তাঁর স্বেচ্ছাচারী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এটাও বিশ্বাস না করে উপায় নেই।
সেই কড়া হেডমাস্টার থাকার পরও অধিনায়ক বিশ্বকাপের মাঝে দল ফেলে রেখে দেশে এসে অনুশীলন করছেন, ওদিকে টিম ডিরেক্টর পদে থাকা একজন বলছেন, দল জানে না অধিনায়ক মিরপুরে অনুশীলন করছেন।
এদিকে টিম ডিরেক্টর যে মিডিয়াতে এত কথা বলে বেড়াচ্ছেন, তা নিয়ে মুখ চড়িয়েছেন কোচ। আবার কোচ ও টিম ডিরেক্টর নাকি ঘরের কথা পরকে জানাচ্ছেন—এমন অভিযোগের তির ছুড়তে ছুড়তে বিদায় নিয়েছেন পেস বোলিং কোচ।
এর মাঝেই বিশ্বকাপের শেষ দিকে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন নির্বাচক কমিটির সদস্য ও সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার, ‘সবগুলো ম্যাচেই প্রতিপক্ষ অনেক শক্তিশালী ছিল।’ বটে? আইসিসি কীভাবে পারল এমন অন্যায় করতে? বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে কি এমন কিছুর মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল?
আমরা আসলে এখন সেই মুরগি বিক্রেতা। যে যা বলে, তাই মেনে নিতে শিখেছি।
এত কিছুর পর মাঠের খেলায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন। তাই এবারের বিশ্বকাপটাও বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন ভেন্যুতে ঘোরাঘুরির উপলক্ষ হয়ে রইল। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান যখন সেমিফাইনালের স্বপ্ন নিয়ে ম্যাচ খেলতে নামছিল, বাংলাদেশ তখন হিসেব মিলাচ্ছিল পরবর্তী চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার।
হয়তো এটাই ভবিতব্য। বাংলাদেশ এভাবেই খেলবে, মিরপুরে জয় পাবে। ওয়ানডে যে ক্রিকেটের একটা সংস্করণ, তা ভুলতে বসা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জিতবে। তাতে নিজেদের উঠতি শক্তি বলে মনে হবে সবার। আমাদের ক্রিকেটার, তাঁদের স্ত্রী, কোচ, ডিরেক্টররা হাসির উপলক্ষ এনে দেবেন।
এর ফাঁকে ফাঁকে ৮/১০ ম্যাচ পরপর হয়তো অগুরুত্বপূর্ণ কোনো ম্যাচে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান দেখনদারী একটা ইনিংস খেলবেন। আমরা বলে উঠব, ‘সো বিউটিফুল, সো এলিগ্যান্ট’, পাশ থেকে অন্য কেউ মাথা দোলাবে, ‘জাস্ট লুকিং লাইক আ ওয়াও!’
লেখক: সহকারী ক্রীড়া সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া ইউনিট, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন


