সংবিধানের প্রতি সত্যিকারের বিশ্বাস ও আনুগত্য নিয়ে যথাযথভাবে রাষ্ট্রের কাজ করবেন বলে বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রধান বিচারক ও সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারকেরা শপথ নেন। ভারতের বিচারকেরাও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন। তাঁরাও শপথ নেওয়ার সময় বলেন, ‘কোনও ধরনের ভয়–ভীতি বা অনুরাগ–বিরাগের বশবর্তী না হয়ে দায়িত্ব পালন করব এবং সংবিধান ও আইনকে সমুন্নত রাখব।’
কিন্তু গত ১১ সেপ্টেম্বর যা দেখা গেল, তাতে হতভম্ব হয়ে গেছে ভারতবাসী। হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হচ্ছে, ওই দিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত গণেশ পূজায় যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
মোদির এক্স পোস্ট থেকেও এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ভারতের তিনবারের এই প্রধানমন্ত্রী যেসব ছবি পোস্ট করেছেন, তাতে দেখা গেছে, প্রজ্বলিত প্রদীপের থালা হাতে আরতি করছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বাঁ দিকে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড়। ডান দিকে প্রধান বিচারপতির স্ত্রী কল্পনা দাস।
প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে রাষ্ট্রের একজন পদধারী হিসেবে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং ঘটা করে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথের লঙ্ঘন কি না?
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলছে, ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানের প্রধান এবং মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক উপেন্দ্র বকশীর উদ্ধৃতি দিয়ে সেই ১৯৯৪ সালেই সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র নিজে কোনো ধর্মকে সমর্থন করবে না বা প্রতিষ্ঠা করবে না, এমনি পালনও করবে না। তবে রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের ধর্মের স্বাধীনতার সমান অধিকার থাকবে।’
এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম পালনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যখন তাঁরা রাষ্ট্রের বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথবদ্ধ হয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস প্রদর্শন করেন, তখন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কারণ, এটি শপথের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন।
এর আগে ভারতের আদালত পাড়ার ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি। এবারই প্রথম কোনো প্রধান বিচারপতি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর ধর্ম প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং ফটোগ্রাফার–ভিডিওগ্রাফার এনে ঘটা করে ছবি তুলে তা আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারও করেছেন।
ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রধান বিচারপতি একটি জাফরান রঙের কুর্তা পরে আছেন। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মাথায় একটি ‘মহারাষ্ট্রীয় টুপি’।
ধর্মের কি উৎকট প্রদর্শন! কেন মোদিকে এখন এই প্রদর্শনটা করতে হচ্ছে? সামনে যে মহারাষ্ট্রের নির্বাচন! সেই নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মকে নোংরাভাবে ব্যবহার। সেই পুরনো কৌশল! সেই পুরনো খেলা!
আইনজীবীরা বলছেন, ধর্মের এই প্রদর্শন নিয়ে যদি এখনই কথা না বলা হয়, তবে অচিরেই তা স্বাভাবিক একটা বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এটি অবশ্যই হতে দেওয়া যায় না।
চন্দ্রচূড় ও নরেন্দ্র মোদি—দুজনেই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তা। তাঁরা যেভাবে পূজা প্রদর্শন করে বিচার বিভাগের সঙ্গে ধর্মের সংমিশ্রণ ঘটালেন, সেটি অবশ্যই তাঁদের শপথকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভারতীয় সমাজে বহু ধর্মের মানুষের বাস, এটি ভুলে গেলে চলবে না।
এস আর বোমাই বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে ১৯৯৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, ‘ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংমিশ্রণকে কোনোভাবেই সংবিধান স্বীকৃতি দেয় না। রাষ্ট্রকে ও ধর্মকে অবশ্যই আলাদা রাখতে হবে।’
স্বাভাবিকভাবেই তাই প্রশ্ন উঠেছে, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে রাষ্ট্রীয়ভাবে পূজার আয়োজন যদি সাংবিধানিকভাবে জায়েজও হয়, তবে সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে শুধু প্রধানমন্ত্রী কেন? কেন রাষ্ট্রপতি নেই? কেন বিরোধী দলীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি?
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কপিল সিবাল বলেন, ‘এর আগেও মহারাষ্ট্র থেকে প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা কেউই গণেশ পুঁজার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বাসভবনে আনেননি। এটি নিঃসন্দেহে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের ভারসাম্য নষ্ট করবে। বিখ্যাত ফরাসি বিচারক মন্টেস্কু বলেছিলেন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ অবশ্যই আলাদা রাখা উচিত।’
প্রধান বিচারপতি যদি ন্যায় বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন, তাঁকে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে।
এক. কার আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রধান বিচারপতির বাসভবনে গিয়েছিলেন?
দুই. কেন অন্যান্য সাংবিধানিক কর্মচারীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না?
তিন. প্রধান বিচারপতি তাঁর দুই বছরের মেয়াদে কতবার ব্যক্তিগতভাবে এমন ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন?
চার. একটি ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানের ছবি ও ভিডিও এভাবে কেন ফলাও করে প্রচার করা হলো?
পাঁচ. সামনে মহারাষ্ট্রের নির্বাচন আসছে বলেই কি প্রধানমন্ত্রীর মাথায় মহারাষ্ট্রীয় টুপি দেখা গেল?
ছয়. এরপর থেকে কি হিন্দু ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে নিরপেক্ষ বিচার আশা করতে পারবে?
শপথ মানে তো শুধু সংবিধানের প্রতিই আনুগত্য নয়, বিবেকের প্রতিও অনুগত থাকা প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি বলতে পারবেন, তাঁরা বিবেকের প্রতি অনুগত ছিলেন?
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস ও এনডিটিভি



