সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছেন লিওনেল মেসি। মূলত এমএলএস কাপ জেতায় ইন্টার মায়ামি দল ও আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে সম্মাননা জানাতে হোয়াইট হাউজে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট। সেই অনুষ্ঠানে আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে প্রশংসায় ভাসান ট্রাম্প।
তবে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছেন মেসি। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রসঙ্গ ওঠার সময় মেসির প্রতিক্রিয়া ও ট্রাম্পের মন্তব্যে হাততালি দেওয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। পাশাপাশি মেসির মতো মহাতারকা রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠলেন কিনা, এমন প্রশ্নও উঠছে!
হোয়াইট হাউজের ওই সম্মাননা অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন মেসি। পেছনে ছিল পুরো মায়ামি টিম, স্টাফ ও অন্যান্য সদস্যরা। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেসিকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ দেওয়ার অনুষ্ঠান করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। কিন্তু সূচি না মেলায় ওই সময় ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি মেসি।
সেই প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প এবার বলেছেন, ‘এটি আমার জন্য বিশেষ সম্মানের— আমি এমন একটি কথা বলতে পারছি, যা আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলতে পারেননি: “হোয়াইট হাউসে স্বাগতম, লিওনেল মেসি।”’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘লিও, তুমি এখানে (এমএলএস) এসেছ এবং জিতেছ, যা খুবই কঠিন কাজ, খুবই অনন্য। সত্যি বলতে, অন্য যে কারও চেয়ে তোমার ওপর চাপ বেশি। সবাই প্রত্যাশা করেছিল, তুমি এটা জিতবে। কারণ বেশিরভাগই জিততে পারে না।’
এসব ফুটবলীয় আলাপ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু ট্রাম্প শুধু ফুটবল নিয়ে কথা বলেই থেমে থাকেননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন, এরপর টেনে আনেন ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি। পাশাপাশি কিউবা ও শুল্কসংক্রান্ত ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঘোষণাও তুলে ধরেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘দৃশ্যটা ছিল কিছুটা অদ্ভুত বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবলার (মেসি) তাঁর (ট্রাম্প) পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট কথা বলছেন রাজনীতি, সামরিক অভিযান আর আমেরিকার ফুটবল ইতিহাস নিয়ে।’
ওই সময় ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইসরায়েলি দুর্দান্ত একটা জোটের সঙ্গে শত্রুকে (ইরান) পুরোপুরি ধ্বংস করার পথে আছে। এর আগে এমনটা কখনও দেখা যায়নি… ওদের (ইরান) নৌবাহিনী প্রায় শেষ। শেষ তিন দিনে ২৪টি জাহাজ হারিয়েছে। এটা বিশাল ব্যাপার…।’
ইরানে হামলা নিয়ে ট্রাম্প যে গর্বভরে এমন কথা বললেন, গত সপ্তাহে শুরু হওয়া সে সংঘাতে এখন পর্যন্ত ইরানের প্রায় ১২৩০ জন মারা গেছেন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আল জাজিরা। ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন সেনাদের প্রশংসায় ভাসান ট্রাম্প, ‘আমাদের লোকজন দুর্দান্ত কাজ করেছে। আর এই সামরিক বাহিনীই ইতিহাসে সবার সেরা।’
ট্রাম্পের এমন সব মন্তব্যের সময় মেসি, মায়ামি ও উপস্থিত অন্যরা হাততালি দেন। ওদিকে ইরান নিয়ে ৬ মিনিট কথা বলার পর কিউবা প্রসঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এরপর আট মিনিট কথা বলেন ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে। সেখানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের বিষয়টিও নিয়ে আসেন। এরপর ফুটবলীয় প্রসঙ্গে যান ট্রাম্প।
এদিকে রাজনীতি কিংবা সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়ে মেসি সরাসরি কিছু না বললেও ট্রাম্পের মন্তব্যের সময় তাঁর প্রতিক্রিয়া ও বক্তব্য শেষে হাততালি দেওয়া- এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই ঘটনার ভিডিও ক্লিপ যুক্ত করে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখক আলী আবুনিমাহ মেসিকে ‘পুরোপুরি স্বার্থপর’ মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হালাল ন্যাশনের প্রতিষ্ঠাতা টুইটারে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প যখন ইরানকে পরাজিত করার পরিকল্পনার কথা বলেন, মেসি তখন হাততালি দেন। মেসি ভক্তরা কেমন বোধ করছ?’
স্প্যানিশ সাংবাদিক লেইলা হামেদ মেসি ও মায়ামির কর্মকাণ্ডকে ‘অদ্ভুত’ উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প পুরো ইন্টার মায়ামি দলের সামনে ইরানে আরও অবৈধ হামলার কথা খুব সাধারণভাবে ঘোষণা করছেন।’
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অন্তত ১৬৫ মেয়ে শিক্ষার্থী মারা গেছেন। ওই প্রসঙ্গ টেনে হামেদ লিখেছেন, ‘ট্রাম্প ভালো করেই জানেন, এই খেলোয়াড়দের ব্যবহার করে তিনি ঠিক কী করছেন। আর খেলোয়াড়রাও তাদের ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন।’
এরপর মেসির সমালোচনায় ওই স্প্যানিশ সাংবাদিক লিখেছেন, ‘এত ক্ষমতা-প্রভাব থেকে লাভ কী, যদি তুমি ওই মুহূর্তে সেটা ব্যবহার করতে না পারো। এই খেলোয়াড়দের বেশিরভাগেরই সন্তান আছে। একটাবার ভাবুন…।’
যুক্তরাষ্ট্রের এক মেসি ভক্ত লিখেছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য একটা দেশে বোমা হামলার কথা বলছেন, আর পেছনে মেসি এবং সুয়ারেস বসা। এমনটা দেখতে হবে, এটা কখনো ভাবিনি।’ আরও অসংখ্য মেসিভক্ত বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।



