হায়দার আকবর খান রনো একাধারে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও লেখক। আজ তাঁর জন্মদিন। তিনি ৮১ বছর পূর্ণ করে ৮২ বছরে পা দিয়েছেন। ১৯৪২ সালে জন্ম নেওয়া রনো দেখেছেন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমল, দেশভাগ এবং পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ। তাঁর স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা আছে এ দেশের ইতিহাস। বর্তমানে অক্সিজেন সিলিন্ডার রনোর নিত্যসঙ্গী। চোখের দৃষ্টিও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। কিন্তু মননে ও মগজে এখনো সজীব। সম্প্রতি হায়দার আকবর খান রনোর সঙ্গে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় কথা বলেন মন্টি বৈষ্ণব। বিভিন্ন বিষয়ে অবলীলায় বলেন, চলার পথের দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের কথা। দীর্ঘ সেই আলাপের কিছু অংশ এখানে প্রকাশ করা হলো—
প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এই দীর্ঘ সময়ে দেখেছেন রাজনীতির ভাঙা-গড়া। জীবনের এই প্রান্তে এসে আপনার উপলব্ধিটা যদি বলতেন।
রনো: ১৯৪২ সালে আমার জন্ম। তাই আমি তিনটি পতাকা দেখেছি-ব্রিটিশ, পাকিস্তান, আর বাংলাদেশের পতাকা। ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পর ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের বিষয়টি অমার কাছে অনেক দুঃখজনক ঘটনা বলে মনে হয়। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো। তৈরি হলো দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান। সেই পাকিস্তান আমলে আমি সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। এর পর ভাষা আন্দোলন, ’৬২ ছাত্র আন্দোলন, ’৬৯ গণঅভ্যুত্থান, ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৮৫ সালের সামরিক শাসন, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে যুক্ত ছিলাম। এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি। আমি নিজেকে অনেক বেশি সৌভাগ্যবান মনে করি। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলাম। যুদ্ধের কথা মনে পড়লে জাহানারা ইমামের ছেলে রুমি, জহির রায়হানের কথা খুব মনে পড়ে। কারণ, তাঁরা ২৭ মার্চ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মতো এত বড় জেনোসাইড পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই ঘটেছে।
আমি এ দেশের রাজনীতির বহু উত্থান-পতন দেখেছি। যেমন দেখেছি মানুষের জাগরণ, তেমন দেখেছি মানুষের অধঃপতন। পেছন ফিরে দেখলে আমি দেখতে পাই, ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ঘটনা। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ আসলেই দুঃখজনক। জিন্নাহের দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভুলে সেই সময় মুসলিম জনগণ ভেসে গিয়েছিল। মুসলিম জনগণ নিজেরাই ভোট দিয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হন। সেদিন ব্রিটিশেরা বুঝতে পারেনি কেন এই ঘটনা ঘটেছিল। এই ঘটনার ২৪ বছর পর যারা একদিন পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেছিল, তাদের সন্তানেরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে।
প্রশ্ন: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তার মূলমন্ত্র পরে রক্ষা হলো না কেন?
রনো: দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর পর রচিত হলো সংবিধান। যুদ্ধের উত্তাপ থাকতে থাকতে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মধ্যে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দিয়ে সমাজতন্ত্র হবে না। এটা আমি মনে মনে ধারণা করেছিলাম। কিন্তু আশা করেছিলাম ধর্ম নিরপেক্ষতা আওয়ামী লীগের হাত ধরে আসবে। এতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দেশে আর মাথা তুলে দাঁড়াবে না। পরে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে দিলেন। পাশাপাশি যে সমস্ত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল, সে দলগুলোকে তিনি পুনরুজ্জীবিত করলেন। এতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। এর ফলে একটা উগ্র মৌলবাদের উত্থান ঘটে দেশে। পরে এই দলগুলোকে বাতাস দেন এরশাদ। বিএনপি এই দলগুলোর সঙ্গে ভাগ করে মন্ত্রিত্ব।
প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে এসে মৌলবাদকে কীভাবে দেখছেন?
রনো: গত কয়েক বছরে মৌলবাদীরা হত্যা করেছে অনেককে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসে আগের সেই জায়গায় ফিরে যাওয়াটা খুবই বেদনাদায়ক। এখন তো হেফাজত ইসলামের পরামর্শে আমাদের পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করা হয়। শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, উপ্রেন্দ্রকিশোর রায়ের লেখা বাতিল করা হয়। কিন্তু মৌলবাদকে তো আদর্শগত, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করতে হবে। এ দেশে মৌলবাদ তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটা হিন্দু বিদ্বেষ, দুই বাঙালি সংস্কৃতি বিদ্বেষ, (যে কারণে তারা পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানে না), আর তিন হলো নারী বিদ্বেষ। হেফাজতের প্রধান একবার বলেছিলেন মেয়েদের ক্লাস ফাইভের বেশি পড়ালেখা করা উচিত না। আজকের আধুনিক সমাজে তো তিনি এ কথা বলতে পারেন না। যে দেশে নারীরা যুদ্ধ করেছে, রাস্তায় নেমে সংগ্রাম করছে, যে দেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে, তাদের বিষয়ে হেফাজত কোন সাহসে এ কথা বলে? হেফাজত কি এই দেশটাকে আফগানিস্তান, তালেবান বানাতে চায়? এ কথা সত্য, এ দেশে মৌলবাদীরা শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু এর জন্য লড়াই করতে হবে। মৌলবাদের তিনটি ভিত্তিকে প্রতিহত করতে হবে। একটা বিষয়ের জন্য শেখ হাসিনাকে সাধুবাদ দিতে চাই। সেটি হলো, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে সক্ষম হয়েছেন। শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগের আর কোনো নেতার পক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া সম্ভব হতো কিনা জানি না। কারণ, দেশের অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বিশ্বের চাপ ছিল প্রচণ্ড পরিমাণে। সেই চাপকে উপেক্ষা করে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া সাহসিকতার বিষয় বটে।
প্রশ্ন: আপনি তো গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন? এই সময়ে দেশের গণতন্ত্র কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে মনে করেন?
রনো: আমার মতে, আজকে এ দেশে গণতন্ত্র নেই। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। আজকে দেশের ধনী-গরীবের বৈষম্য অনেক বেড়ে গেছে। একদিকে সাধারণ মানুষ একটা ডিম কিনে খেতে পারে না। মাছ, আর মাংসের কথা না হয় বাদ দিলাম। আর অন্যদিকে বাড়ছে ধনীর সংখ্যা। সামনে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যেই সরকার আসুক না কেন, সেই সরকারের কাছে দুটো জিনিস চাইব। এক, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার; দুই, ওষুধ যেন সরকার ন্যায্য মূল্যে প্রতিটি মানুষকে দেয়।
দেশে একদিকে অতিকায় ধনী, আর অন্যদিকে বাড়ছে গরীবের দুঃখ। ধনীদের ওপর নির্ভর করে কিন্তু কোনো গণতান্ত্রিক সরকার টিকে থাকতে পারে না। গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ কিন্তু শুধু নির্বাচনের সময় না। নির্বাচনের আগে এবং পরে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। একজন মানুষকে তো প্রতিদিন বাঁচতে হয়। তাকে নির্বাচনের আগেও বাঁচতে হয়, আবার পরেও বাঁচতে হয়। তাই শতকরা ৯৫ জন মানুষের কথা সরকারকে ভাবতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়বে।
প্রশ্ন: কিছুদিন আগে ব্রিকস নতুন সদস্যদের নাম ঘোষণা করেছে। ব্রিকসের নতুন সদস্যদের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
রনো: বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ এর পাশাপাশি ব্রিকসের গঠন। বিশ্বব্যাংক তথাকথিত উন্নয়নের জন্য অর্থ দেয়। আর আইএমএফ যখন মুদ্রার মান কমে যায়, তখন অর্থ দিয়ে সে দেশে মুদ্রার মান ঠিক রাখতে সহযোগিতা করে। অবশ্য এর সঙ্গে কিছু শর্তও জুড়ে দেয়। এই শর্তগুলো অনেক ভয়াবহ হয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশের রয়েছে এই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।
শুরুর সময় ব্রিকসের সদস্য ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীন। এর পর যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। এবার নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত হয় মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, আর্জেন্টিনা, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরব।
এবার নতুন সদস্যদের তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকলে ভালো হতো। আমাদের দেশের অর্থনীতি চীন, ভারতের মতো বিশাল নয়। বাংলাদেশের সদস্যপদ না দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি কারণ হতে পারে। কিন্তু এবার তো ইথিওপিয়াকে যুক্ত করল। ইথিওপিয়ার অর্থনীতি কি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বিশাল? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্টের বৈঠক হয়েছিল। চীন বাংলাদেশকে সমর্থনও করেছিল। কিন্তু ঠিক কী কারণে বাংলাদেশকে নিল না, তা সঠিক বলতে পারব না। তবে, এসব হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খেলা। সেই খেলায় কে কখন কোনদিকে কি করছে, তা বলা মুশকিশ। হয়তো সেই খেলায় বাংলাদেশ দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রশ্ন: জীবন সায়াহ্নে এসে কী চান?
রনো: আমি রবীন্দ্রনাথের কথা বিশ্বাস করি। রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার সংকটে লিখেছেন, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। এই কথা আমি বিশ্বাস করি। এ দেশের মানুষ ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ করেছে। এ দেশের জনগণ ভবিষ্যতেও লড়াই করে অধিকার অর্জন করবে। তবে আমার মনে বিশাল এক দুঃখ আছে। শারীরিক কারণে আমি এখন মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে পারছি না। দীর্ঘদিন ধরে চোখে দেখতে পাই না, পড়তে পারি না, অক্সিজেন নিয়ে চলাফেরা করি। আমি সিপিবি করি। কিন্তু একজন সদস্যের যে দায়িত্ব, আমি তা পালন করতে পারছি না। তবু যে কয়দিন বাঁচব, সাধ্যমতো চেষ্টা করব দেশের মানুষের জন্য কিছু করার। আমার চাওয়া-যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হোক।
প্রশ্ন: অনেক লিখেছেন। আপনার বয়স এখন ৮২ বছর। এই বয়সেও এসে আপনি বই প্রকাশ করছেন। শ্রুতিলেখকের মাধ্যমে করছেন কাজ। ইতিহাসের ঝোলায় আপনার কোন কোন বই জায়গা করে নেবে বলে মনে করেন?
রনো: আমার এ পর্যন্ত ২৫টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বই হলো-‘শতাব্দী পেরিয়ে’, ‘মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের ভূমিকা’, ‘উত্তাল ষাটের দশক’, ‘ফরাসি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব’, ‘রবীন্দ্রনাথ:শ্রেণি দৃষ্টিকোণ থেকে’, ‘মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ’, ‘মার্ক্সবাদের প্রথম পাঠ’, ‘মার্ক্সীয় অর্থনীতি, মার্কসবাদ ও সশস্ত্র সংগ্রাম, ‘বাংলা সাহিত্যে প্রগতির ধারা’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), ‘সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সত্তর বছর’, ‘পুঁজিবাদের মৃত্যুঘণ্টা’, ‘কোয়ান্টাম জগৎ-কিছু বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রশ্ন’, ‘পলাশী থেকে মুক্তিযুদ্ধ’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ (প্রথম খণ্ড) এবং ‘গ্রাম শহরের গরিব মানুষ জোট বাঁধো’।
বেশ কয়েক বছর ধরে আমার দৃষ্টিশক্তি নাই বললেই চলে। কয়েক বছর ধরে শ্রুতিলেখকের মাধ্যমে তিনটি বইয়ের কাজ সম্পাদন করছি। বইগুলো হলো ‘সুবিধাবাদ ও সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লেনিন’, ‘স্তালিন’ এবং ‘নারী ও নারীমুক্তি’।



