ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ ব্যবসা করেছিল ‘কেজিএফ’ সিনেমাটি। এর দ্বিতীয় পর্বে রাজনীতিবিদ ও সরকারপ্রধানের চরিত্রে ছিলেন রাভিনা ট্যান্ডন। ছবিটির প্রোটাগনিস্ট ক্যারেক্টার রকির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অংশ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ‘ঘুসকে মারেঙ্গে’ বা ঘরের ভেতরে ঢুকে মারব। মূলত রকিকে কোণঠাসা করতে ও তার গ্যাংয়ের সদস্যদের মনের মধ্যে ভয় ধরাতেই এমন কথা তিনি বলেছিলেন এবং এক পর্যায়ে তা করেছিলেনও।
ফিলিস্তিন, ইসরায়েল ও হামাস সংকটে বলিউড মাসালা মুভির আলোচনা তোলাতে আপনাদের নিশ্চয়ই একে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ মনে হচ্ছে। কিন্তু রাভিনা ট্যান্ডনের মতোই ‘ঘুসকে মারেঙ্গে’ নীতিতেই এবার ইসরায়েলের সীমানার ভেতরে ঢুকে হামলা চালিয়েছে ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। গোষ্ঠীটি হামলা চালানোর পরপর দেওয়া বক্তব্যে এটি বলেছেও যে, ইসরায়েল যে বড় বা অজেয় কোনো শক্তি নয়, সেটি প্রমাণ করতেই এমন হামলা। কিন্তু হামাসের এই হামলাতে বড় বিপদে পড়ে গেছে ফিলিস্তিনের জনগণ।
ইসরায়েলের ভেতরে ঢুকে গত ৭ অক্টোবর হামলা চালায় হামাস। এর জবাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে ইসরায়েল। এরই মধ্যে হামলা ও পাল্টা আক্রমণে উভয়পক্ষে হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহতের সংখ্যাও সহস্রাধিক। ইসরায়েলি শতাধিক নাগরিক এখন হামাসের হাতে জিম্মি। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে গেছে ফিলিস্তিনের বেসামরিক জনগণ। কারণ হামাস লক্ষ্য করে চলা ইসরায়েলি হামলায় তাদেরই বেশি ক্ষতি হচ্ছে। আক্ষরিক অর্থে, হামাসের এই অতর্কিত হামলার মূল্য জান দিয়ে চোকাতে হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েলের ভেতরে ঢুকে হামাসের হামলা চালানোর মূল কারণ রাজনৈতিক। পশ্চিম তীর ও গাজা মিলিয়ে পুরো ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্ব করতে চায় হামাস। মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন এবং প্রয়াত ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের রাজনৈতিক দর্শনকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলে বিপ্লবী কায়দায় ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা আদায় করে নিতে চায় হামাস। গত কিছুদিনে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে হামাসের জনপ্রিয়তাও বেশ বেড়েছে। এখন ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে সেই জনপ্রিয়তাকে অবিসংবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় গোষ্ঠীটি। অর্থাৎ, ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চায় না হামাস। আর এটি অর্জনের জন্যই শেষ পর্যন্ত হামলা চালায় হামাস। কিন্তু এটি করার পর যেসব সমস্যায় ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে, সেগুলো বেশ জটিল ও উদ্ভূত সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
দ্বিতীয়ত, গাজা দখল করে নিতে পারে ইসরায়েল—এমন একটি প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি জোর আলোচনা চলছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরাই বলছেন, এই কাজ করলে ভুগবে ইসরায়েলই। তবে আশঙ্কা আছে, এর পরও গাজার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে ইসরায়েল। মূলত হামাসকে পুরোপুরি শক্তিহীন করতেই এটি করতে পারে দেশটি। কিন্তু সেটি হলে গাজায় এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ গাজায় মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব খুবই কম। অন্যদিকে সামগ্রিকভাবেই ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এই বলয়ের প্রতি সমর্থন কমছে। চলতি বছরের জুনে করা এক জরিপে দেখা গেছে, পশ্চিম তীর ও গাজা মিলিয়ে মোট ফিলিস্তিনি জনগণের অর্ধেকেরও বেশি এখন সমর্থন করে হামাসকে। জনগণের এক-তৃতীয়াংশের সমর্থন আছে মাহমুদ আব্বাসের প্রতি। অর্থাৎ, ফিলিস্তিনি জনগণের পুরোটাই যে হামাসের নীতিতে আস্থাশীল, বিষয়টি তেমন নয়। আর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালাতে পারলেও পাল্টা আক্রমণ সামলে যুদ্ধক্ষেত্রে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকার মতো সামরিকভাবে শক্তিশালী নয়। ফলে প্রবল আক্রমণের সামনে টিকে থাকার স্বার্থেই তাদের পিছু হটতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে মাহমুদ আব্বাসদের দিয়ে ইসরায়েল গাজা শাসন করতে চাইতে পারে। কিন্তু মাহমুদ আব্বাসরা হামাসকে ঘৃণা করলেও কৌশলগত কারণে ইসরায়েলি ট্যাংকে ভর করে গাজা শাসন করতে চাইবেন না। কারণ, তাতে করে ফিলিস্তিনিদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও কমবে বৈ বাড়বে না। ফলে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টির সমূহ আশঙ্কা আছে। আর এটি হলে শেষ পর্যন্ত ভুগতে হবে সাধারণ ফিলিস্তিনিদেরই।
তৃতীয়ত, হামাসের হামলার পরপরই ইসরায়েল গাজাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভাস দিয়ে রেখেছেন যে, তারা ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’র মতো করেই দেখবেন! আর এ কারণেই গাজার বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাদ্য ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে করে গাজায় ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বাড়িঘর মেরামতের কাজটি পুরোপুরি থমকে যায়। ফলে অব্যাহত ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনিদের বিপর্যস্ত জনজীবন মেরামতের কোনো উপায় থাকে না। এতে করে গাজাবাসীদের জীবন আরও সংকটময় হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে। একবার নিজেকে দিয়ে হিসাব করলেই বুঝে যাবেন যে, বিদ্যুৎ-গ্যাস-খাদ্য ও পানিহীন অবস্থায় থাকার যন্ত্রণা কতটা দুর্বিষহ!
সবশেষে এটি বলতেই হয় যে, এক দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। লেবানন, মিসর ও ইরান বারংবার চলমান যুদ্ধে অংশ নেওয়ার হুমকি দিতে থাকাতে এই শঙ্কা আরও গাঢ় হচ্ছে। এবং সেই বিস্তৃত যুদ্ধের মাঠ হিসেবে সবাই গাজা ও পশ্চিম তীরকেই ব্যবহার করবে। ফলে সব দিক দিয়েই অমানবিক এক ফাঁদে দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে পড়ার আশঙ্কায় আছে ফিলিস্তিনিরা। আর কে না জানে - রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলেও, প্রাণ তো যায় শুধু উলুখাগড়াদেরই!
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, ফরেন পলিসি, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, ফরেন অ্যাফেয়ার্স, দ্য গার্ডিয়ান ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ