ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গত সপ্তাহে যুদ্ধ জড়ানোর পর থেকে আমেরিকার সব মনযোগ এখন ইসরায়েলের ওপর। হামাসকে সামলাতে সার্বক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের পাশে থাকতে হচ্ছে আমেরিকাকে। এতদিন ইউক্রেনের প্রতি আমেরিকার যে অখণ্ড মনোযোগ ও সমর্থন ছিল, সেখানে খানিকটা ভাটা পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবির সাম্প্রতিক এক বক্তব্যেও তেমন ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে। ইউক্রেনের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যাপারে আমেরিকার অবস্থান কী, এমন প্রশ্নের জবাবে গত সপ্তাহে জন কিরবি বলেন, ‘আমরা প্রায় দড়ির শেষ প্রান্তে চলে এসেছি।’
জন কিরবির এমন বক্তব্যে অনেকেই চমকে উঠেছেন। যেমন মার্কিন-আরব সম্পর্কবিষয়ক গবেষক ও লেবাননভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ সেন্টার ফর কোঅপারেশন অ্যান্ড পিস বিল্ডিংয়ের প্রেসিডেন্ট ড. দানিয়া কোলেইলাত খতিব বলেন, ‘আমি সত্যিই চমকে উঠেছি। জন কিরবির এ কথার অর্থ হচ্ছে, আমেরিকা আর্থিক সহায়তার শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। খুব বেশিদিন আর অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে ইউক্রেনের পাশে থাকতে পারবে না ওয়াশিংটন। এটা বিস্ময়কর!’ অথচ চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাংবাদিকেরা যখন এই কিরবিকেই প্রশ্ন করেছিলেন, আমেরিকা কতদিন পর্যন্ত ইউক্রেনকে সহায়তা দিবে, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যতদিন ইউক্রেনের বিজয় না আসবে ততদিন পর্যন্ত আমেরিকা সহায়তা দিয়ে যাবে।’
জন কিরবি তখন দ্ব্যার্থহীন কণ্ঠে আরও বলেছিলেন, ‘ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিজয় নিশ্চিত করতে যা যা করা প্রয়োজন, আমরা তার সবকিছু করব।’ এখন সুর পাল্টে গেছে আমেরিকার। ইউক্রেনের জন্য ২৪ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন সহায়তা প্যাকেজের অনুমোদন নিয়ে দিন কয়েক আগে দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের নিম্নকক্ষে তীব্র বাকযুদ্ধ হয়েছে। আমেরিকার কংগ্রেস সদস্যরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই আর ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার পক্ষপাতী না। এমনিতেই বাজেট সংকটের কারণে মার্কিন সরকার শাটডাউনের ঝুঁকিতে আছে, এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দিতে গেলে সরকারের কোষাগার আরও খালি হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বেশির ভাগ কংগ্রেস সদস্য। ফলে গত জানুয়ারিতে যে সুরে কথা বলেছিলেন জন কিরবি, সেই সুর পাল্টে এখন বলছেন, ইউক্রেনকে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া সম্ভব নয়।
এরই মধ্যে ‘সুগ্রীব দোসর’ হিসেবে যোগ দিয়েছে ইসরায়েল–গাজা যুদ্ধ। এখন ইসরায়েলের পাশে থাকা ছাড়া তো উপায় নেই আমেরিকার। ফলে গত সপ্তাহে কিরবির বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা গেছে যে, ইসরাইল ও ইউক্রেনকে একই সঙ্গে সহায়তা দেওয়া আমেরিকার পক্ষে সম্ভব নয়।
তারপরও গত সপ্তাহে ইউক্রেনের জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে জো বাইডেন প্রশাসন। এটি অবশ্য পূর্ব প্রতিশ্রুত ২৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় খুবই সামান্য। এই আপাত নগণ্য পরিমাণ সহায়তা প্যাকেজের অনুমোদন নিতেই ট্রাম্পের অনুসারী রিপাবলিকানদের তীব্র বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল বাইডেন সরকারকে। এসব ‘দেখিয়া শুনিয়া’ আরব নিউজের এক নিবন্ধে ড. দানিয়া কোলেইলাত খতিব প্রশ্ন তুলেছেন, তবে কি ইউক্রেন মিশন গুটিয়ে নিল আমেরিকা? যদি তাই হয়, তাহলে তো বলতে হয়, এ যুদ্ধে রাশিয়া জিতে গেছে! কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে যেহেতু ওয়াশিংটন এখনও ইউক্রেনের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়নি, সেহেতু ‘রাশিয়া জিতে গেছে’ এমনটা বলা যাচ্ছে না। তবে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে, গাজা যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউক্রেনের ওপর।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জন মেয়ারশাইমার যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেটিই এখন ফলতে শুরু করেছে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ইউক্রেন ইস্যুতে আমেরিকা তার সংকল্পে অটুট থাকতে পারবে না। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ইউক্রেনের ন্যাটোর সদস্য হতে চাওয়া রাশিয়ার জন্য নিরাপত্তা হুমকি হতে পারে, কিন্তু আমেরিকার জন্য নয়। ইউক্রেনের ন্যাটোর সদস্য হওয়া বা না হওয়ার ওপর আমেরিকার কিছু এসে যায় না।
এ কারণেই আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, গাজা সংকট সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে হোয়াইট হাউস। জেলেনস্কির সত্যিই দুর্ভাগ্য! তিনি এখনও পুরোপুরি মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভর করে বসে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেন কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, সেটি এক মৌলিক প্রশ্ন। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে গত মাসেই মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর নেতা চক শুমারের কাছে জেলেনস্কি অনেকটা করুণ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমরা যদি সাহায্য না পাই, এ যুদ্ধে নিশ্চিত হারব।’
আমেরিকা হয়তো চায় না ইউক্রেন এ যুদ্ধে হারুক। কিন্তু অন্ততকাল সাহায্য চালিয়ে যেতেও ইচ্ছুক নয়। ফলে ইউক্রেনের সম্ভাব্য পরাজিত পরিণতি আমেরিকা মেনে নিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। আমেরিকা যদি ইউক্রেনের ওপর থেকে সত্যি সত্যি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে সারা পৃথিবীর কাছেই আমেরিকা একটি ‘অবিশ্বস্ত মিত্র’ হিসেবে পরিচিতি পাবে। এখনই আমরা দেখতে পাচ্ছি, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আর আগের মতো ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করে না। তারা ভারসাম্য রক্ষা করতে ইরান, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব জোরদার করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
এখন ইউক্রেনের সঙ্গে আমেরিকার এ ধরনের আচরণের কারণে ‘বন্ধু বেঈমান’ টাইপের একটি সিনেমার শেষদৃশ্য দেখার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববাসী। সবাই অধীর হয়ে বসে আছে এই দৃশ্য দেখার জন্য যে, জেলেনস্কি এই আঘাত কীভাবে মোকাবিলা করেন। তিনি কি এখন পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবেন? এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে যে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন নয়, তা হচ্ছে, আমেরিকাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে অনেক দেশই এখন থেকে দ্বিতীয়বার ভাববে।



