সোমালিয়া উপকূলে আবারও বেড়েছে জলদস্যুদের তৎপরতা। গত নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত অন্তত ১৫টি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা করেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। এর মধ্যে সবশেষ ১২ মার্চ ছিনতাইয়ের শিকার হয় বাংলাদেশি পতাকাবাহী এমভি আবদুল্লাহ।
জাহাজ লুট, নাবিকদের অপহরণ, অতর্কিত হামলাসহ নানা অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সোমালিয়ার জলদস্যুরা। বছরের পর বছর ধরে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়, প্রাণনাশের পাশাপাশি দুর্ধর্ষ সব কর্মকাণ্ডের মূল হোতা আফ্রিকার এ দেশটির দস্যুরা। এসব কারণে ভয়ঙ্কর জলদস্যু হিসেবে তারা বেশ কুখ্যাত। এই জলদুস্যদের উত্থান কীভাবে? কীভাবে তাদের দমন করা সম্ভব?
যেভাবে তারা জলদস্যু হলো
সোমালিয়ার জলদস্যুদের পেশা ছিল মাছ শিকার। ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার সর্বশেষ কার্যকর সরকারের পতন ঘটলে অন্যান্য দেশের লুটপাটের শিকার হয় দেশটির সমুদ্র সম্পদ। ৩৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সমুদ্র উপকূলে বড় বড় ট্রলার নিয়ে হাজির হয় বিদেশিরা। সমুদ্রের মাছ আহরন করে নিয়ে যেত তারা। এদিকে গরিব সোমালিয়ার জেলেরা ছোট নৌকা নিয়ে তেমন মাছই পেত না। এমনকি বিদেশি ট্রলার থেকে তাদের ওপর গুলিও করা হতো। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় বিদেশিদের ফেলে যাওয়া তেজস্ক্রিয় পদার্থ। তেজস্ক্রিয়তার ফলে কমে যেতে থাকে মাছ। এতে আক্রান্ত হয় সোমালিয়ার অনেক মানুষ।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণে ঐক্যবধ্য হয় সোমালি জেলেরা। তারা গড়ে তোলে ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার কোস্টগার্ড অব সোমালিয়া এবং সোমালি মেরিনস নামে সংগঠন। এরপর থেকে বিদেশি জাহাজ বা ট্রলার দেখলে আক্রমণ করে তারা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাদের আক্রমণ। জাহাজ জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় হয়ে ওঠে তাদের আয়ের উৎস।
সোমালিয়ার মেরিটাইম কনসালট্যান্ট, অ্যান্ড্রু মওয়ানগুরা বলছেন, সোমালিয়ার কিছু ক্ষমতাধর ব্যাক্তি রয়েছে, যারা এই জেলেদের নিয়ন্ত্রন করে। এই ক্ষমতাধর ব্যাক্তিরা নাইরোবি বা সোমালিয়ারও নয়। তারা তরুণ জেলেদের হাতিয়ার বানিয়ে অর্থ উপার্জন করছে।
২০১০-১১ সালের দিকে মাত্রা ছাড়ায় সোমালি জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য। জাতিসংঘের আওতাধীন আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার (আইএমও) তথ্যমতে, আগের বছরের তুলনায় ২০১০ সালে জলদস্যুতা ২০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের আওতাধীন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ব্যুরো (আইএমবি) প্রকাশিত ‘পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারি রিপোর্ট’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে জলদস্যুতার ১২০টি ঘটনা ঘটেছে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১৫০।
যে কারণে সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়ে জাহাজগুলো
পূর্ব আফ্রিকার একটি অংশের নাম ‘হর্ন অব আফ্রিকা’। ত্রিকোণাকৃতির ভৌগোলিক মানচিত্রের কারণেই অঞ্চলটিকে এই নামে ডাকা হয়। এই অংশটি বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এই পথ দিয়ে বছরে প্রায় ২০ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। সুয়েজ খালের কারণে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে সমুদ্রপথ ছোট হয়ে আসার কারণে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথটি ব্যবহার করে।
সোমালিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং সমুদ্র উপকূল রক্ষায় প্রশাসনের শক্তিশালী উপস্থিতি না থাকায় অঞ্চলটিতে নাশকতা বাড়তে থাকে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাবক ভূমিকা রাখছে দেশটির মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর আর্থিক সংকট এবং বিকল্প জীবিকার অভাব। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অঞ্চলটিতে বিবদমান বিভিন্ন গোষ্ঠী থাকায় একটা রমরমা অস্ত্র ব্যবসাও সেখানে চলছে, যার আর্থিক হিস্যা বড় ক্ষমতাধর দেশগুলোও পায়। এতে ওই অঞ্চলে অস্ত্র অনেকটাই সহজলভ্য, যা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষেরা ব্যবহার করে দস্যুতার কাজে।
সোমালিয়ার মৎস্যজীবী ক্যামি কিনান বলছেন, ‘আমাদের সমুদ্রে অবৈধভাবে বিদেশিরা মাছ ধরার কারণে জেলেরা তাদের জীবিকা হারাচ্ছে। তাই সমুদ্র রক্ষা করতে তারা জলদস্যুতার পথ বেছে নিয়েছে। যতক্ষণ না অবৈধ মাছ ধারার জাহাজের দৌরাত্ম বন্ধ না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ জলদস্যুতা বন্ধ হবে না। প্রতিশোধের জন্য বন্দুক হাতে নেবেই এখানকার যুবকেরা।
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরে বেড়েছে হুতিদের হামলা। তাই আরব উপসাগরের নিরাপত্তায় যে সৈন্য ও জাহাজ মোতায়েন ছিল, সেগুলো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার হচ্ছে। আর এই সুযোগটিই নিয়েছে সোমালি জলদস্যুরা।
ন্যাটো ও আমেরিকার নৌবাহিনী বলছে, ভারত সাগর থেকে এডেন উপদ্বীপের আড়াই মিলিয়ন বর্গমাইল এলাকা ছিনতাইপ্রবণ। আর এই বিশাল অঞ্চলের নিরপত্তা দেওয়া অসম্ভব। আবার জলদস্যুরা ছিনতাই করা জাহাজ ব্যবহার করে পরবর্তী ছিনতাই করার জন্য। একট মাদার শিপ থাকে, আর সাথে ছোট ছোট স্পিড বোটে করে তারা হামলা চালায়। এই স্পিডবোটগুলো খুব সহজে রাডারে ধরা পড়ে না। জলদস্যুদের থেকে সুরক্ষা দিতে খুব দ্রুত সময়ে সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে না জাহাজগুলো।
জলদস্যুতা কি নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব?
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সোমালিয়ার জলদস্যুরা ২০০৫ থেকে ২০১২ পর্যন্ত বিভিন্ন জাহাজে হামলা, অপহরণ ও লুটের মাধ্যমে আনুমানিক ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আদায় করেছে। দস্যুদের ঠেকাতে ইউনাইটেড নেশনস সিকিউরিটি কাউন্সিল সাতটি রেজ্যুলেশন পাস করে, যেখানে বিদেশি বিমান ও নৌবাহিনীকে সোমালি জলসীমায় প্রবেশ ও টহলের অনুমতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া মার্কিন নেতৃত্বাধীন টাস্ক ফোর্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ-অপারেশন আটলান্টাকে সমুদ্রে জলদস্যুতা এবং সশস্ত্র ডাকাতি দমনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপের পর ২০১১ সালের পর অঞ্চলটিতে কমে গিয়েছিল দস্যুদের আনাগোনা।
এ ছাড়া একই সময়ে সোমালিয়ার জঙ্গি সংগঠন আল–শাবাবকে তাড়াতে স্থলভাগে আক্রমন চালায় আফ্রিকান ইউনিয়িনের সামরিক বাহিনী ও মার্কিন বিমান বাহিনী। ২০১২ সালে কেনিয়ার সৈন্যরা সোমালিয়ার কিসমায়ো বন্দর দখল করে। এসব কারণে কমে আসে জলদস্যুতা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আবারও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মহল। সেই সাথে সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ নিজ দেশে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা বাড়াতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছেন। দস্যুদের দমন করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ বলছেন, লোহিত সাগরে হুতিদের আক্রমণের ফলে সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যুতা বাড়ছে। এখনো জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে খুব দেরি হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা সোমালিয়ার সব অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই পশ্চিম স্বীকৃত দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মাহমুদ ও তাঁর সরকারের। নানা গোষ্ঠী দেশটিতে বিবদমান অবস্থায় রয়েছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন–শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার তেমন সক্ষমতা নেই দেশটির সরকারের। স্বাভাবিকভাবেই সমুদ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান দেশটির স্কীকৃত সরকার কাঠামোর পক্ষে প্রায় অসম্ভব, যা দেশটির প্রেসিডেন্টের ভাষ্য থেকে অনেকটাই স্পষ্ট।
সোমালিয়ার জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সবার আগে সোমালিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে হবে। সোমালিয়ার উপকূলীয় জনগণকে জলদস্যুতার প্রলোভন থেকে বাঁচতে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একত্র হয়ে সামুদ্রিক টহল পরিচালনার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা এই জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের বিচারের আয়োতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে সামুদ্রিক টহল পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, আফ্রিকা রিনিউয়াল
আরও পড়ুন:
- গারাকাড উপকূলের আরও কাছে ছিনতাই হওয়া বাংলাদেশি জাহাজ
- জলদস্যুর কবলে পড়া বাংলাদেশি জাহাজের অবস্থান শনাক্ত
- নোয়াখালীর সালেহ আহমদকে ফেরত চায় পরিবার
- জলদস্যুদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ হয়নি: বিএমএমওএ
- নাবিক সাইদুজ্জামানের মায়ের নির্ঘুম চোখে শুধুই সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি
- জলদস্যুদের হাতে বন্দি তারেকুল মা-বাবার আহাজারি
- একমাস আগে বাবা মারা যায় নাবিক আইয়ুবের, ছেলের চিন্তায় মায়ের আর্তনাদ
- ‘এই কথাই হয়তো শেষ কথা, প্রয়োজনে এসএমএস দিও’
- নোয়াখালীর সালেহ আহমদকে ফেরত চায় পরিবার
- ‘কত আদরের ছেলে আমার, দুইদিন আগেও ফোন কইর্যা কইতাছে আম্মা রোজা রাইখ্যো’
- অডিওবার্তায় নাবিক–‘সাহরির জন্য সামান্য খাবার দিয়েছে’