এদিকে হুতি, ওদিকে জলদস্যু, বাণিজ্য জাহাজ যাবে কোন পথে

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ১০:০৬ পিএম

বাংলাদেশের এমভি আবদুল্লাহ ছিনতাই করেছে সোমালি জলদস্যুরা। এখনো বাংলাদেশি নাবিকেরা জিম্মি। তাঁদের উদ্ধারে চেষ্টা চলছে। এ হলো চলমান ঘটনা। কিন্তু এ ঘটনাই ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। কারণ, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সমুদ্রপথ সুয়েজ খাল ব্যবহার করা যাচ্ছে না হুতিদের হামলার কারণে। সে পথ এড়িয়ে আফ্রিকার দীর্ঘ পথ ধরতে গেলে পড়তে হচ্ছে সোমালি জলদস্যুদের পাল্লায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বাণিজ্য জাহাজ তাহলে কোন পথে যাবে? 

গাজায় ইসরায়েলের প্রতিনিয়ত হামলার প্রেক্ষাপটে এক রকম ঘোষণা দিয়েই লোহিত সাগরে বাণিজ্য জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে পছন্দের সমুদ্রপথ সুয়েজ খাল দিয়ে বাণিজ্য জাহাজের চলাচল ভীষণ ঝুঁকিতে পড়ে। ব্যবসায়ীরা নিজেদের আর্থিক ক্ষতি এড়াতে ওই পথ এড়িয়ে তুলনামূলক ব্যয়বহুল পথ হিসেবে আফ্রিকার আশপাশের এলাকা দিয়ে বাণিজ্য তরি পাঠাতে শুরু করে। কিন্তু এবার তারা পড়েছে দ্বিতীয় সংকটে। আর সেটি হলো—সোমালি জলদস্যু।

সোমালি জলদস্যুদের সর্বশেষ শিকার বাংলাদেশ। মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাওয়ার পথে এমভি আবদুল্লাহ নামের জাহাজটি সোমালি জলদস্যুদের পাল্লায় পড়ে। সোমালিয়া থেকে ১০০০ কিলোমিটার পূর্বে থাকা সত্ত্বেও জাহাজটি জলদস্যুদের এড়াতে পারেনি।

জাহাজটিতে থাকা ২৩ নাবিকের সবাই এখনো তাদের হাতে জিম্মি। বর্তমান এই পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে অনেকেরই স্মরণে আসছে আগের কথা, যখন সোমালিয়ার আশপাশের জলসীমা ছিল বিশ্বে সবচেয়ে ভয়াবহ। সে সময়ের সাথে আরও কিছু বিষয় মিলে যাচ্ছে। আর তা হলো—সে সময়েও লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা ছিল এক বাস্তবতার নাম। এবারও এ দুটি বিষয় মিলে যাওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর নৌবাহিনী বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখছে।

জলদস্যুতা নিয়ে কাজ করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ম্যারিটাইম ব্যুরো। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা সাইরাস মুডি ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, ‘সোমালিয়ার জলদস্যুরা লোহিত সাগরের বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে।’

ইকোনমিস্ট জানায়, ২০০৮ সাল থেকে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে কাজ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নৌবাহিনী। তাদের হিসাবমতে, গত বছরের নভেম্বর থেকে সোমালি জলদস্যুদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত তারা তিনটি বাণিজ্য জাহাজে হামলা করেছে। এর বাইরে ছোট নৌযান ছিনতাই করেছে ১৮টি। ছিনতাই করা এসব নৌযান দিয়েই তারা বড় জাহাজে হামলা চালায়। 

প্রসঙ্গত, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে গত বছরের নভেম্বর থেকেই লোহিত সাগর ও এর আশপাশে হামলা শুরু করে হুতি গোষ্ঠী। গত বছরের ১৯ নভেম্বর হুতিরা প্রথম কোনো বাণিজ্য জাহাজ ছিনতাই করে। এসব হামলায় হুতিরা ড্রোনসহ নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

ফলে এটা পরিষ্কার যে, হুতিদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে বিকল্প নৌপথ হিসেবে বাণিজ্য জাহাজগুলো যখন ভারত মহাসাগরকে বেছে নেয় এবং আফ্রিকার আশপাশে বাণিজ্য জাহাজের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করে, তখনই সুযোগটি নেয় সোমালি জলদস্যুরা।

এ পরিস্থিতি এখন ভীষণ রকম উদ্বেগের হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংঘ। পাঁচটি দ্বীপরাষ্ট্র নিয়ে গঠিত ইন্ডিয়ান ওশান কমিশন এবং ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সেফ সিস’ জানায়, জলদস্যুদের খুব বেশি দিন সফলভাবে চাপে রাখা আর সম্ভব হবে না।

কেন এত উদ্বেগ? কারণ, ২০১১ সালে যখন সোমালি জলদস্যুদের তৎপরতা ভয়াবহ মাত্রায় ছিল, তখন অন্তত ২১২টি ছিনতাই চেষ্টা হয়েছিল সোমালিয়ার উপকূলীয় এলাকায়। জিম্মি করা হয়েছিল ১২০০–এর বেশি নাবিককে। মারা গিয়েছিল ৩৫ জন। এসব জিম্মি ও ছিনতাই থেকে তাদের আয় হয়েছিল ৫ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। আর বৈশ্বিক বাণিজ্যকে লোকসান গুণতে হয়েছিল ১৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এটা বিশ্বব্যাংকের তথ্য।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক মাস আগেও সশস্ত্র রক্ষী, নৌবাহিনীর টহল এবং গ্রপ্তার হওয়া জলদস্যুদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারপর কিছুদিন শান্ত। তেমন বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। দীর্ঘ এক দশকের অভিযান শেষ বলে ঘোষণা করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও। সেটা ২০২২ সালের ঘটনা। সে ঘোষণার পর জাহাজ শিল্পের ছয়টি প্রতিষ্ঠানও ঘোষণা করে জানায় যে, সোমালিয়ার আশপাশের সমুদ্রপথ আর তেমন ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কিন্তু এমন আয়াস বেশি দিন টিকল না।

গাজায় ইসরায়েলের প্রতিনিয়ত হামলার প্রেক্ষাপটে এক রকম ঘোষণা দিয়েই লোহিত সাগরে বাণিজ্য জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। ফাইল ছবি

ব্রিটিশ সমুদ্রপথ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান আমব্রের তথ্যমতে, গত বছরের ডিসেম্বরে মাল্টার পতাকাবাহী এমভি রুয়েন ছিনতাই করে সোমালি জলদস্যুরা। ২০১৭ সালের পর এটিই ছিল তাদের প্রথম ছিনতাইয়ের ঘটনা। ফলে সমুদ্রে বাণিজ্য রুটের বদলের সাথে সোমালি জলদস্যুদের তৎপরতার গভীর সম্বন্ধ রয়েছে।

এর দুটি দিক। প্রথমত, গাজা যুদ্ধের জেরে সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর ও এর আশপাশের অঞ্চলে হুতিদের হামলা নিরস্ত করতে ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে পশ্চিমা নৌবাহিনীগুলোকে। ফলে তারা অন্যদিকে মনোযোগ দিতে পারছে না। সোমালিয়ার নিজ সরকারের পক্ষেও পশ্চিমা সহায়তা ব্যাতিরেকে নিজ দেশের জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ফলে তারা অনেকটাই চাপহীন অবস্থায় আছে। দ্বিতীয়ত, লোহিত সাগরে উত্তেজনা এড়াতে এবং নিজ নিজ বাণিজ্যতরিকে নিরাপদ রাখতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের বাণিজ্য জাহাজ বিকল্প পথে পাঠাচ্ছে। ফলে সোমালি জলদস্যুরা সম্ভাব্য শিকার হাতের কাছেই পাচ্ছে।

তৃতীয় যে কারণটি রয়েছে, তার কথা এখন পর্যন্ত অনেকেই বলেছেন। আর তা হলো—জলদস্যুদের জলদস্যু হয়ে ওঠার মূল কারণটি এখনো বিদ্যমান। তাদের বিকল্প কোনো আয়ের সন্ধান যেমন দেওয়া যায়নি, তেমনি তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘ বা পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযানে তাদের শুধু দমনই করা হয়েছে, সে অর্থে পুনর্বাসন হয়নি। ফলে জলদস্যুতার পথ থেকে তাদের ফেরার কোনো কারণ উপস্থিত নেই। এতে হাতের কাছে শিকার পেলে দারিদ্র্যপীড়িত এবং একইসঙ্গে নিজ সমুদ্র অঞ্চল সম্পর্কে ভীষণভাবে অভিজ্ঞ গোষ্ঠী কেন দস্যুতা করবে না, তার কোনো গ্রাহ্য জবাব কারও কাছে নেই।

সে যাক, পশ্চিমা নৌ শক্তি যখন হুতিদের নিয়ে ব্যস্ত, তখন সোমালি জলদস্যুরা অনেকটাই জবাবদিহির বাইরে রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের নৌবাহিনী অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছে। অঞ্চলটিতে তাদের অন্তত এক ডজন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন আছে। এর বিপরীতে ইইউর যুদ্ধজাহাজ আছে দুটি।

নয়াদিল্লি ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক ও ভারতের নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা অভিজিৎ সিং ইকোনমিস্টকে বলেন, পশ্চিম ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় এবং অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারে ভারতীয় নৌবাহিনী। গত জানুয়ারিতেই অঞ্চলটিতে একটি বাণিজ্য জাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা তারা রুখে দিয়েছিল। আর চলতি মাসে তারা এমভি রুয়েন উদ্ধার করেছে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর তরফ থেকে আশ্বস্ত করা হলেও বৈশ্বিক উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। হুতি গোষ্ঠীর হামলা লোহিত সাগরে কমলে সোমালি জলদস্যুদের হামলাও হয়তো কমবে। কিন্তু তা কোনো সমাধান নিয়ে আসবে না। এর পূর্ণাঙ্গ সমাধান আনতে হলে প্রয়োজন সোমালিয়ার সমুদ্রপারের জেলে গোষ্ঠীর আয়ের নিশ্চয়তা। দস্যুতা দমনে বিশ্ব সম্প্রদায় যতটা আগ্রহী, আফ্রিকার একটি প্রান্তিক গোষ্ঠীর দারিদ্র্যের নিদান খুঁজতে ততটা হবে কি? এখন পর্যন্ত উত্তর কিন্তু নেতিবাচকই।

শনিবার সকাল থেকে ইরানে যৌথ সামরিক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। হামলার প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি)...
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এশিয়ার তিন দেশে পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় সফর করছেন। গত সোমবার ভিয়েতমনাম সফরে গেছেন তিনি। অনেকগুলো বিনিযোগ চুক্তি সইয়ের পাশাপাশি রাজধানী হ্যানয়ে দেশটির শীর্ষ নেতা টু ল্যামের...
সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদেও প্রথম মেয়াদের অনেক নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটার নানা লক্ষণ এরই মধ্যে...
ইউরোপে একটি যুদ্ধ চলছে। আরেকটি যুদ্ধ হবে হবে করছে। নিরাপত্তা এক বড় বিষয়ে পরিণত হয়েছে অঞ্চলটিতে। নিরাপত্তা জোট ন্যাটোতে ইউরোপের বড় দেশগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিতে হচ্ছে। সাথে আছে গাজা।
যশোরের শার্শায় একই বাড়িতে বাবা ও দুই শিশু সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেছে শার্শা থানা-পুলিশ। শিশু দুটিকে হত্যার পর তাদের বাবা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। বিষয়টি...
রাজধানীর বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিকে ঘষামাজা করে চলছে আবারও চালুর প্রস্তুতি। তবে সংস্কারের কোনো অনুমতি ছাড়া এ ধরনের সংস্কারকাজ সম্পূর্ণ বেআইনি বলে...
খুলনা ভৈরব নদের জেলখানা ঘাট এলাকায় ট্রলার ও ফেরি সংঘর্ষে হয়েছে। এতে ৩৫ থেকে ৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কেউ নিখোঁজ আছে কিনা তা...
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত দুই দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের চাবাহার ও কোনারাক এলাকায় হামলা হয়েছে বলে...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর