বলিউড কিংবদন্তিদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা শুধু অভিনেতাই নন, বরং একটা সময়কেও তাঁরা প্রতিনিধিত্ব করেন। অভিনেতা ধর্মেন্দ্র তাঁদেরই একজন। তাঁর জীবন তুলে ধরে—‘বিপদে মাথা নত নয়, বরং হেসে এগিয়ে চলা।’
পর্দার মতো ধর্মেন্দ্রর বাস্তব জীবনের গল্পও কম সিনেম্যাটিক নয়! নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে দর্শকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ঘরের ছেলে’। এদিকে, ব্যক্তিজীবনে তিনি পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা আর উত্তরসূরি দিয়ে ঘেরা।
১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার সাহনেওয়াল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ধর্মেন্দ্র। পুরো নাম ধর্মেন্দ্র কেওয়াল কৃষণ দেওল। ছোটবেলায় চলচ্চিত্রের পর্দা ছিল তাঁর কাছে এক জাদুর জানালা! গ্রামের কাদামাখা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন—একদিন তিনিও বড়পর্দায় দ্যুতি ছড়াবেন।
অবশেষে ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিন আয়োজিত প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলে, সেই স্বপ্ন সত্যি হয়! ১৯৬০ সালে পরিচালক গীতা দত্তের ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন। বছর কয়েকের মধ্যেই তিনি ভারতীয় সিনেমার বড় তারকায় পরিণত হন।
প্রথম ছবিতেই নজর কাড়লেও এ অভিনেতা প্রকৃত সাফল্যের দেখা পান ‘শোলা অউর শবনম’ (১৯৬১), ‘বন্দিনী’ (১৯৬৩), ‘ফুল অউর পাথর’ (১৯৬৬) ও ‘সত্যকাম’ (১৯৬৯) হিটের মাধ্যমে।
ষাট ও সত্তরের দশক ছিল তাঁর সোনালি যুগ। শক্তিমত্তা, মাধুর্য ও সংবেদনশীলতার এমন মিশেল বলিউড আগে দেখেনি। ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’ (১৯৭১), ‘ইয়াদন কি বারাত’ (১৯৭৩), ‘শোলে’ (১৯৭৫), ‘চুপকে চুপকে’ (১৯৭৫) ও ‘ড্রিম গার্ল’র (১৯৭৭) মতো ছবিগুলো তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
হেমার সঙ্গে প্রেম
ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর প্রেম যেন বলিউডের চিরকালীন উপাখ্যান। ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তুম হাসিন ম্যায় জওয়ান’ ছবির সেটে তাঁদের প্রথম দেখা হয়। তারপর ‘শোলে’, ‘সীতা অউর গীতা’, ‘ড্রিম গার্ল’র মতো একের পর এক ছবিতে রোমান্সের পারদ ছড়িয়েছেন তাঁরা।
ধর্মেন্দ্রর সংসারে তখন প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌর। তবুও ভালোবাসার কাছে বাঁধা পড়েন তিনি। সমাজের সমালোচনা, বিতর্ক—সব পেছনে রেখে বিয়ে করেন ধর্মেন্দ্র-হেমা। এ বিষয়ে ধর্মেন্দ্র বলেছিলেন, ‘আমি কাউকে আঘাত করিনি, আমি শুধু হৃদয়ের কথা শুনেছি।’
এদিকে, হেমা মালিনী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘তিনি (ধর্মেন্দ্র) একই সঙ্গে শক্তিশালী ও কোমল। ঝড়ের মধ্যেও পাহাড়ের মতো পাশে থেকেছেন।’ তাঁদের সংসারে দুই মেয়ে—ঈশা ও অহনা। মেয়েরা আজও বলেন, ‘‘বাবা এখনও মায়ের উদ্দেশে কবিতা লেখেন, ভালোবাসায় বলেন, ‘মেরি হেমা।’’
শুধু নায়ক নন, জীবনের দার্শনিক
ধর্মেন্দ্রর অভিনয়ে মিশে ছিল এক অদ্ভুত মানবিকতা। সত্যকাম সিনেমায় তিনি আদর্শবাদী যুবক থেকে শুরু করে ‘অনুপমা’র সংবেদনশীল লেখক, প্রতিটি চরিত্রেই যেন তিনি জীবনের রঙ ঢেলে দিয়েছেন। শোলে-তে বীরু চরিত্রে তাঁর সংলাপ আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে, ‘বাসন্তী, ইন কুত্তোঁ কে সামনে মৎ নাচনা।’ বাংলায় অর্থটা দাঁড়ায় এমন, ‘বাসন্তী, এই কুকুরগুলোর সামনে নাচো না।’
তবে পর্দার বাইরে ধর্মেন্দ্র একেবারে অন্য মানুষ। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, স্রষ্টা তাঁকে সব দিয়েছেন-কিন্তু তিনি কখনও দাবিদার হননি। মূলত এটাই ধর্মেন্দ্রর জীবনের দর্শন-বিনয়ে মহত্ত্ব।
এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘আপনি কীভাবে স্মরণীয় হতে চান?’ ধর্মেন্দ্রর চোখে মৃদু হাসি ছিল সেদিন। বলেছিলেন, ‘আমি দেশকে ভালোবেসেছি, মানুষকে ভালোবেসেছি, আমাকে সেই ভাবেই মনে রাখুন।’
সাধারণ জীবনের প্রতি টান
খ্যাতির চূড়ায় থেকেও আজও সাধারণ মানুষের মতোই ধর্মেন্দ্র। খামারে কাজ করেন, ট্রাক্টর চালিয়ে ভিডিও পোস্ট করেন ইনস্টাগ্রামে। ২০২৫ সালে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘ভালো মানুষ হয়ে বাঁচুন, তবেই সাফল্য আপনার পিছু নেবে।’ তাঁর এই সরলতাই তাঁকে কোটি ভক্তের হৃদয়ে অমর করেছে।
চলচ্চিত্রে ধর্মেন্দ্র
এই অভিনেতার জীবন মানেই হিন্দি সিনেমার ক্রমবর্ধমান প্রতিচ্ছবি। সাদা-কালো যুগের সামাজিক নাটক থেকে সত্তরের দশকের অ্যাকশন ব্লকবাস্টার, সব কিছুতেই তিনি ছিলেন সামনের সারিতে।
বলিউডের ‘হি-ম্যান’
দীর্ঘ ৬ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন ধর্মেন্দ্র। তাঁর শক্তিশালী শারীরিক গঠন, রুক্ষ চেহারা এবং অ্যাকশন-নির্ভর চরিত্র তাঁকে বলিউডের ‘হি-ম্যান’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।
পরিবার ও উত্তরাধিকার
ধর্মেন্দ্রর দুই স্ত্রী—প্রকাশ কৌর ও হেমা মালিনী। পুত্র সানি ও ববি দেওল, কন্যা ঈশা, অহনা, বিজেতা ও অজিতা। বর্তমানে তাঁরা প্রত্যেকেই বলিউডে ধর্মেন্দ্রর উত্তরাধিকার বহন করছেন।