সিনেপর্দায় তামিল সুপারস্টার থালাপতি বিজয় ছিলেন গণমানুষের নায়ক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াকু চরিত্রেই তাঁকে বেশি দেখা গেছে। এবার বাস্তবেও রাজনীতিতে নেমে ‘মহানায়কের’ স্বীকৃতি পেলেন। তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)। তাঁর এই জয় শুধু নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং গোটা রাজ্যের ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
রাজনৈতিক দল গঠনের কয়েক বছরের মধ্যে রাজনীতিবিদ বিজয়ের এই উত্থান সহজ ছিল না। জনপ্রিয় তিনি ছিলেন, তবে সেটাই তাঁর এই রাজনৈতিক সাফল্যের একমাত্র কারণ নয়। কৌশলী প্রচারণা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে বিজয়ী হয়েছেন এই সুপারস্টার।
বিজয়ের পারিবারিক নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। সবাই চেনে ‘থালাপতি’ নামে। পরিচালক বাবা এস. এ. চন্দ্রশেখরের হাত ধরেই তাঁর প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু। ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রতি আরও ঝোঁক বাড়ে। নায়ক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন ‘নালায়া থিরপু’ ছবির মাধ্যমে, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর। ধীরে ধীরে তামিল সিনেদুনিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় মুখে পরিণত হন। তিন দশকেরও বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৬৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চরিত্র থেকে চরিত্রে জায়গা করে নিয়েছেন দর্শকের মনে।
পর্দার নায়ক থেকে জনতার মহানায়ক
বিজয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা। পর্দায় তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো সাধারণ মানুষের হয়ে লড়াই করে। এই ভাবমূর্তিই তাঁকে দর্শকদের কাছে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই জনপ্রিয়তা শুধু বিনোদন অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ধীরে ধীরে তা রাজনৈতিকমহলেও গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে।
রাজনীতি ও দল গঠন
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) গঠন করেন বিজয়। শুরু থেকেই তিনি আলাদা পথ বেছে নেন। কোনো বড় দলের সঙ্গে জোট না করে সরাসরি জনতার সামনে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন। এই দল গঠনের পর দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠন শক্তিশালী করার কাজে মন দেন। লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেননি, মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ।
বাজিমাত প্রথমবারেই
সদ্য অনুষ্ঠিত তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার লড়াই করেই বাজিমাত করে বিজয়ের দল। বহু আসনে এগিয়ে থেকে রাজ্যের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় টিভিকে। ভারতের সেই অঞ্চলের রাজনীতিতে যে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, সেটা স্পষ্ট। কারণ তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মূলত দুই প্রধান আঞ্চলিক দলের হাতেই ঘুরেছে—‘ডিএমকে’ ও ‘এআইএডিএমকে’। এই দুই দলের মধ্যেই পালাবদল হয়ে সরকার গঠনের ধারা অব্যাহত ছিল। রাজনৈতিক পরিসর কার্যত তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের ‘এন্ট্রি’তে সেই সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে।
জনপ্রিয়তার নেপথ্যে
বিজয়ের এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো বিজয়ের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। দুর্নীতি, বিতর্ক থেকে নিজেকে দূরে রাখা। যুবসমাজের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন বিজয়। তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ করেছেন তিনি। অনুরাগীদের ভালোবাসা ভোট ব্যাংকে আছড়ে পড়েছে। এ ছাড়াও বিজয়ের জনসংযোগ ছিল অবাক করার মতো।
মুখ্যমন্ত্রীর পথে
তামিলনাড়ুর ক্ষমতার মসনদে বসতে চলেছেন থালাপতি বিজয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়েই এই ধরনের সাফল্য অত্যন্ত প্রশংসাযোগ্য, এমনকি বিরলও বটে। দলের নেতৃত্বের প্রতি মানুষের যে আস্থা রয়েছে, তারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে টিভিকে’র এই সাফল্য।
তারকাখ্যাতি কাজে লাগিয়ে তারকা প্রার্থীরা নির্বাচনে জয় লাভ করেন। এই ধারণা খুবই পরিচিত। তবে বিজয়ের রাজনৈতিক সফর সেই ধারণাকে খানিকটা হলেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। নায়ক বিজয়ের যে জনপ্রিয়তা আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে রাজনীতির ময়দানে কেন্দ্রীয় ব্যক্তির জন্য শুধু এই পর্দার জনপ্রিয়তাই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক কৌশল ও জনসংযোগের চমকই বিজয়কে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে গেল।