যে কারণে গানের রেকর্ডিংয়ে উপস্থিত থাকতেন রাজ্জাক

নায়করাজ রাজ্জাক—চার দশকের অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন তিনি। রুপালি পর্দায় তাঁর দাপট যতটা আলোচিত, ব্যক্তিজীবনের গল্পগুলো আড়াল। আজ তাঁর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ৮৪ বছর। আর এ দিনটিতে চলত উৎসব। 

তেমনটাই মনে করেন সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম। তাঁর কথায়, ‘রাজ্জাক ভাই যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন এই উৎসব চলেছে। এমন উৎসব করার মানসিকতা সব নায়কের মধ্যে ছিল না।’

এই কথার পেছনে আছে এক দীর্ঘ, আবেগঘন ইতিহাস। আছে একটি গান; যে গান দিয়েই ডানা মেলেছিলেন খুরশীদ আলম। সেই গানটি হলো ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’।

খুরশীদ আলম ও রাজ্জাক। ছবি: সংগৃহীতআজ যে খুরশীদ আলমকে বাংলা চলচ্চিত্রের অবিচ্ছেদ্য কণ্ঠ হিসেবে ধরা হয়, তার শুরুটা কিন্তু ছিল বেশ অনিশ্চিত। ১৯৬৯ সাল। প্রথমবার সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। ছবির নাম ‘আগন্তুক’। তখন তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করা এক তরুণ, বেতারে মাত্র সি-গ্রেডের শিল্পী।

মজার ব্যাপার হলো, ‘আগন্তুক’ ছবিতে তিনি প্রথমে একক গান গাওয়ার জন্য ডাক পাননি। ডাক পেয়েছিলেন কোরাসে। গানটি ছিল ‘দেখ ভেবে তুই মন, আপন চেয়ে পর ভালো’। সেই গানের প্রধান শিল্পী ছিলেন নজরুলসংগীতের খ্যাতিমান শিল্পী সোহরাব হোসেন। কোরাসে ছিলেন খুরশীদ আলম, শ্রীপুরের পল্লীগীতির শিল্পী আব্দুর রব এবং মিয়া মহম্মদ বদরুদ্দিন।

কিন্তু সেই রেকর্ডিংয়ের মাঝেই গল্প মোড় নেয়। খুরশীদ আলমের স্মৃতিতে, ‘‘গানের রেকর্ডিংয়ের সময় আজাদ রহমান হঠাৎ আমাকে দিয়ে সিনেমার আরেকটি গান গাওয়ানোর কথা ভাবেন। সেই গানটাই ছিল ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’।’’

সোনালিদিনের নায়ক, রাজ্জাক। ছবি সংগৃহীতএই গানটির কথাকার ছিলেন খুরশীদ আলমের চাচা আবু হায়দার। সুর করেছিলেন আজাদ রহমান। এরপর শুরু হয় কঠিন প্রস্তুতি। প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে গানটি শিখিয়েছিলেন আজাদ রহমান।

রেকর্ডিং চলাকালীন পুরো সময় উপস্থিত ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। কীভাবে গান গাওয়া হচ্ছে, কোথায় কী অভিব্যক্তি দরকার—সবকিছু তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করতেন।

খুরশীদ আলম বলেন, ‘রাজ্জাক সাহেব সবসময় রেকর্ডিংয়ে থাকতেন, যাতে পর্দায় ঠোঁট মেলাতে কোনো সমস্যা না হয়।’

খুরশীদ আলম স্মরণ করেন, ‘উনি নিজের কথা বলা, হাসি, রাগ—সব বুঝিয়ে দিতেন, যাতে গানটা ঠিকভাবে ঠোঁটে মেলানো যায়।’

শেষ পর্যন্ত গানটি রেকর্ড হয়। সিনেমা মুক্তির পর ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’ হয়ে ওঠে সুপারহিট। সেই গান দিয়েই বদলে যায় খুরশীদ আলমের জীবন।

এরপর একে একে আসে ‘প্রিয়তমা’ ছবির ‘আমার এই কলজেটায় চাক্কু মেরে’, ‘অনন্ত প্রেম’-এর ‘ও চোখে চোখে পড়েছে যখনই’, ‘ও দুটি নয়নে’—আরও কত গান। নায়করাজ রাজ্জাক ও খুরশীদ আলমের এই জুটি বাংলা সিনেমায় তৈরি করে এক আলাদা ইতিহাস।