দাঁত কেন আঁকাবাঁকা হয়? সোজা করার উপায় জানুন

আঁকা-বাঁকা দাঁতের সমস্যা মানুষের দাঁতের সমস্যাগুলোর মধ্যে খুবই পরিচিত এবং সাধারণ একটি সমস্যা। আঁকা-বাঁকা দাঁতের কারণে একজন মানুষকে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যাদেরই দাঁত আঁকাবাঁকা তারা যতই ব্রাশ করুক, যে দাঁতটা ভেতরে থাকে সেটা পরিষ্কার করা যায় না। ফলে দাঁত কালো হয়ে যায়। সেখানে স্টেইন পড়ে, পরবর্তীকালে পাথর হয়। তখন জিনজিভাইটিস হয়, গ্রামের ভাষায় বলে পায়োরিয়া। মুখে থেকে দুর্গন্ধ আসা, রক্ত পড়া , পুঁজ আসে। এটা আঁকাবাঁকা দাঁতের একটা বড় সমস্যা।

আবার যাঁদের একটা দাঁত উঁচু থাকে, তাঁদের ওই দাঁতের গোড়া ধীরে ধীরে করাতের মতো ক্ষয় হয়ে যায়। এতে দাঁত শিরশির করে, দাঁতে রুট ক্যানেল করারও প্রয়োজন পড়ে। এ ছাড়া আঁকাবাঁকা দাঁত নিয়ে একজন মানুষ প্রতিনিয়ত হীনম্মন্যতায় ভোগেন। হাসতে বা কথা বলতে গিয়ে আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করেন, যা তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কেন আঁকাবাঁকা হয় দাঁত
শিশুদের মুখে সাধারণত ২০টি দুধদাঁত আসে। এই দুধদাঁত পড়ে গিয়ে যথাসময়ে স্থায়ী দাঁত গজায়। কোনো কারণে যদি দুধদাঁত সময়মতো না পড়ে বা আগেই পড়ে যায়, তাহলে নিচের দাঁতটা ঠিকমতো উঠতে পারে না। তখনই হয়ত সেই দাঁতটা মাঝামাঝি জায়গায় ওঠে, কখনো বাইরে চলে যায়, কখনো ভেতরে চলে যায়। আবার কখনও যেখানে জায়গা পায়, সেখানেই বেড়ে উঠতে শুরু করে। দেখা দেয় আঁকাবাঁকা দাঁত। মা-বাবার এই সমস্যা থাকলেও সন্তানদের দাঁত আঁকাবাঁকা হয়ে বেড়ে উঠতে পারে। আরও কিছু কারণেও দাঁত অবিন্যস্ত ও এলোমেলো হতে পারে। যেমন—

১.  জন্মগত।
২.  দাঁত ও চোয়াল, অর্থাৎ ম্যাক্সিলা ও ম্যান্ডবলের হাড়ের অসামঞ্জস্য।
৩. নানা রকম রোগ, যেমন সিস্ট, টিউমার।
৪. অভ্যাসজনিত কারণ যেমন– ছোটবেলা থেকে আঙুল চোষা। এতে ওপরের মাড়ির দাঁত সম্মুখে চলে আসে। অর্থাৎ ওপরের দাঁত উঁচু হয়ে যায়।
৫. জন্মগত ত্রুটি, যেমন ঠোঁটকাটা ও তালুকাটা সমস্যা।
৬. দুর্ঘটনাজনিত কারণ, যেমন সড়ক দুর্ঘটনায় ওপর ও নিচের চোয়ালের দাঁত ভেঙে অবিন্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
৭.  ওপরের চোয়ালের দুই দাঁতের মাঝের ফাঁকা।
৮. অনেক সময় নির্দিষ্টসংখ্যক দাঁতের চেয়ে অতিরিক্ত দাঁত (সুপারনিউমারারি টিথ) ওঠার কারণে দাঁত অবিন্যস্ত হয়।
৯.  অনেক সময় ওপরের চোয়াল নিচের চোয়ালের চেয়ে বড় হয়। আবার নিচের চোয়াল অতিমাত্রায় বড় হয়ে যায়। যার কারণে দুই চোয়ালের দাঁতের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।

আঁকাবাঁকা দাঁতের চিকিৎসা
প্রথমত, রোগীর ওপিজি এক্স–রে, সেফালোমেট্রি করে কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন। ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ এই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ দন্তচিকিৎসক বা অর্থোডেন্টিস্ট। এই চিকিৎসা রিমুভাল অ্যাপলায়েন্স ও ফিক্সড অ্যাপলায়েন্স—এই দুভাবে করা যায়।

অনেক সময় ওপরের চোয়ালের দুই পাশের ফার্স্ট প্রি-মোলার ওঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। প্রথমে রোগী ও রোগীর অভিভাবককে পুরো বিষয়টি ভালো করে বুঝাতে হবে। ১২-১৫ বছরের মধ্যে চিকিৎসা আরম্ভ করতে পারলে ভালো। রিমুভাল অ্যাপলায়েন্স পদ্ধতিতে প্রথমে রোগীর দাঁতসহ চোয়ালের মাপ নেওয়া হয়। পরে ডেন্টাল ল্যাবরেটরিতে রিমুভাল অ্যাপলায়েন্স তৈরি করে রোগীকে পরানো হয়। এরপর সময়–সময় রিমুভাল অ্যাপলায়েন্স সক্রিয় করে রোগীর চিকিৎসা করা হয়। 

আরেকটি পদ্ধতিতে রোগীর মুখে দাঁতের ফিক্সড অ্যাপলায়েন্স বসিয়ে চিকিৎসা করা হয়। পরে সময় নিয়ে ফিক্সড অ্যাপলায়েন্স সক্রিয় করে দাঁতগুলো সুন্দর করে পরিপাটি করে সাজানো হয়।

প্রতিরোধ
শিশুকালেই যদি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে আঁকাবাঁকা দাঁত হওয়াটা প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুর আঁকা-বাঁকা দাঁত বেড়ে উঠতে দেখলে দেরি না করে অতি দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা উচিত। অল্প বয়সে চিকিৎসা শুরু করলে দ্রুত ও স্থায়ী ফল পাওয়া যায়। এই চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আঁকাবাঁকা দন্ত বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। 

লেখক: ডেন্টাল সার্জন, সিকদার ডেন্টাল কেয়ার

আরও পড়ুুন: