নিউইয়র্কে টাইম ১০০ সামিটে অংশ নিতে গিয়ে বিশেষ এক শাড়ি পরেছিলেন নীতা আম্বানি। এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের ফুলিয়া অঞ্চলে তৈরি একটি জামদানি শাড়ি। শাড়িটি বুনতে সময় লেগেছে পুরো দুই বছর। তৈরি করেছেন পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত বয়নশিল্পী বিরেন কুমার বসাক। তিনি মূলত বাংলাদেশি। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার টাঙ্গাইল থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান।
১৩ বছর বয়সেই ফুলিয়ায় তাঁতশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন বিরেন কুমার বসাক। ১৯৭০-এর দশক থেকে তিনি হ্যান্ডলুম শাড়ি বুনতে শুরু করেন। তখন কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ঘরে ঘরে গিয়ে নিজ হাতে তৈরি শাড়ি বিক্রি করতেন তিনি। মাত্র ১ রুপি পুঁজি নিয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করেছিলেন বসাক।
২০১৩ সালে কারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পান। তাঁর তৈরি শাড়ির ক্রেতাদের তালিকায় রয়েছেন সত্যজিৎ রায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌরভ গাঙ্গুলি, আমজাদ আলি খান, লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে। এমন আরও অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি।
এই শাড়িটি তৈরি করেছে ‘স্বদেশ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এতে ব্যবহার করা হয়েছে মীনাকারি জামদানি কৌশল। শাড়ির নকশায় দেখা যায় উপজাতীয় মোটিফ, মানুষের গল্প, পশুপাখি ও প্রকৃতির নানা চিত্র। প্রতিটি নকশা এত সূক্ষ্মভাবে বোনা হয়েছে, যেন তা একেকটি শিল্পকর্ম।
শাড়ির আঁচলে রয়েছে গল্প বলার মতো দৃশ্য ‘মানুষ, প্রাণী আর গাছপালা’। সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত চিত্রপট। পুরো শাড়িতে হালকা প্যাস্টেল রঙের ডোরার সঙ্গে জটিল নকশার মিশ্রণ তৈরি করেছে ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য। আর পাড়জুড়ে মাছের মোটিফ যা সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের প্রতীক।
শুধু নীতা আম্বানি নন, বলিউডের অনেক তারকাও এখন জামদানির প্রতি ঝুঁকছেন। সম্প্রতি কঙ্গনা রনৌত পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রামে একটি রোডশোতে সাদা জামদানি শাড়ি পরেন। অন্যদিকে গত বছর দুর্গাপূজায় আলিয়া ভাট পিস্তা ও সাদা রঙের ঢাকাই জামদানি পরেছিলেন। সঙ্গে ছিল লখনউয়ের চিকনকারি কাজ।
জামদানি শাড়ির আসল সৌন্দর্য তার বুননপ্রক্রিয়ায়। এতে ফুল বা জ্যামিতিক নকশা তৈরি করা হয় ‘এক্সট্রা-ওয়েফট’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ প্রতিটি নকশা আলাদা করে সুতো ঢুকিয়ে হাতে বোনা হয়। এই কাজ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ, একটি শাড়ি তৈরি করতে মাসের পর মাস লেগে যায়।
জামদানির ইতিহাস বহু প্রাচীন। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতেই এর সূচনা। এটি মূলত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি। এটি ‘ঢাকাই মসলিন’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। ইউনোসকো ২০১৩ সালে জামদানিকে মানবজাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। মধ্যযুগে, বিশেষ করে তুঘলক ও মুঘল আমলে (১৪শ থেকে ১৮শ শতক) জামদানির ব্যাপক প্রসার ঘটে।
ব্রিটিশ শাসনামলে জামদানির জনপ্রিয়তা কমে যায়। ইউরোপে মেশিনে তৈরি নকল কাপড়ের বিস্তার এবং ব্রিটিশদের কঠোর নীতির কারণে দেশীয় বয়নশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে দেশভাগের সময় অনেক কারিগর ছড়িয়ে পড়েন, ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আরও সংকটে পড়ে।
তবে এখন আবার নতুন করে ফিরে আসছে জামদানি। তারকাদের পছন্দ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্যবহার, সব মিলিয়ে বাংলার এই শতাব্দীপ্রাচীন শিল্প আবার আলোচনায় উঠে এসেছে।