ঠেগামুখ: কর্ণফুলীর মতো মানুষও যেখানে এক হয়ে যায়

পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সবুজে ছাওয়া অঞ্চল। মাঝখানে কর্ণফুলী, স্বপ্রাণ সত্তা হয়ে বয়ে চলেছে হাজারো গল্প বলতে বলতে। মাঝখানে আছে ব্যবধান সীমান্তের। আর আছে নো ম্যানস ল্যান্ড। কিন্তু সৌহার্দ্য যখন আত্মার গহন দিয়ে বয়ে চলে কর্ণফুলীর চোরাস্রোতের মতো, তখন সীমান্ত এক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। তেমনটিই মনে হলো ঠেগামুখ গিয়ে। ওপারে মিজোরামের শিলচরে বাজার বসলে যেমন এখানকার মানুষ যায় দরকারি পণ্যটি কিনে আনতে, তেমনি ঠেগামুখ বাজারেও আসে মিজোরামের মানুষ। বছরের পর বছর এই হয়ে আসছে। পাহারা আছে, যেমন থাকে সীমানায়। তবে তা অঘটন থেকে মানুষকে বাঁচাতেই।

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের এক অঞ্চল এই ঠেগামুখ। প্রশ্ন আসতে পারে—এ নাম এল কোথা থেকে? যেতে যেতেই জানা হলো—পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়ার নাম ‘ঠেগা’, যা মিলিত হয়েছে কর্ণফুলিতে। পাহাড়বাসী মাত্রই জানে, জীবনে ছড়ার মূল্য কতটা। কোথাও সরু, কোথাও দাপুটে সেই জলস্রোতগুলোই তো পাহাড়কে রাখে স্বপ্রাণ। কত কত নদীর আত্মা লুকিয়ে আছে পাহাড়ে পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব ছড়ার মধ্যে। ‘ঠেগা’ ছড়াও তেমন। এই ছড়ার নামেই ঠেগামুখের নামকরণ। ভারতের মিজোরামের সীমান্ত ঘেঁষা ঠেগা হয়েই বয়ে আসে কর্ণফুলীর মূল স্রোত। মিজোরামের ব্লু মাউন্টেইন বা নীল পাহাড়ের (লুসাই পাহাড়) স্রোতধারা এসে মিশেছে বাংলাদেশের এই ঠেগামুখ সীমান্তে। নদীর দুপাশে, সীমান্তে, দুই দেশেই চাকমাদের বসতি। তাই সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট।

ছোট কর্ণফুলীর দূরত্ব তো বটেই সীমান্তও এখানে কোনো বাধা হতে পারেনি। নীলকণ্ঠী পাখির মতোই চলাচল করে মানুষ। সীমান্তে তেমন কড়াকড়ি নেই। সীমান্তে পাহারায় থাকা বিজিবি ও বিএসএফ যেন বন্ধু এখানে। ছোট হরিণা থেকে ঠেগামুখ সীমান্তে বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আতিক চৌধুরীর নেতৃত্ব চলছে সীমান্ত সুরক্ষা। জোন অধিনায়কের সহযোগিতা ও আন্তরিকতায় মিলল ঠেগামুখ দেখার সুযোগ। বড় হরিণা, মরা থেগা, থেগাসহ একাধিক সীমান্ত চৌকিতে বিজিবি জোয়ানদের উপস্থিতি। দিন-রাত চলে টহল।

কর্ণফুলীর উজান নদীর মাঝ বরাবর ‘শূন্য রেখা’। ভারত বাংলাদেশের পতাকাবাহী নৌকা চলছে নদীর পথে। বছরের পর বছর এখানে দুই দেশের মানুষ সীমান্তে বসবাস করছে। তবে ছোট হরিণার পর নিরাপত্তার জন্য বাঙালিদের চলাচলের অনুমতি নেই। ছোট হরিণা থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে ঠেগামুখ সীমান্ত। সীমান্তের পাশেই ঠেগামুখ বাজার এবং ঠেগামুখ বিওপি। পরিপাটি ঠেগামুখ ক্যাম্প। গত বছর জুন মাসে ভয়াল স্রোতে ভেসে গিয়েছিল ঠেগামুখ ক্যাম্পের গোলঘর। পরে তা সংস্কার করা হয়।

ছোট কর্ণফুলীর দূরত্ব তো বটেই সীমান্তও এখানে কোনো বাধা হতে পারেনি। ছবি: সমির মল্লিক

ক্যাম্পের গোলঘর থেকে বসেই চোখে পড়ে মিজোরামের নীল পাহাড়, মিজো গ্রাম আর সবুজ দৃশ্যপট। বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় নৌ বন্দরের তালিকায় রয়েছে ঠেগামুখ। রয়েছে ঠেগামুখের বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। হৃদ আর ছোট পাহাড় ঘেঁষা রাঙামাটি। যার বেশ বড় অংশজুড়ে সংরক্ষিত বন, অনাবিষ্কৃত ঝরনা, অদেখা পাহাড় এবং ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস।

ঠেগামুখের গন্তব্য এবারের রৌদ্র ঝলমল দিনের হাত ধরে। কান্ট্রি বোটের ইঞ্জিনের খটখট শব্দে নিরন্তর চলা। জলের দুপাশে সাজানো প্রকৃতি দৃশ্যের চেয়ে বেশি কিছু। হৃদের সবুজাভ জলের রং আগের দিনের বৃষ্টিতে কিছুটা ম্লান হয়েছে। রাঙামাটি থেকে শুভলংয়ের বিরতি শেষ করে সরাসরি বরকল যাত্রা। রাঙামাটি থেকে ছোট হরিণা পর্যন্ত ৭৬ কিলোমিটার জলের পথ। এই পথে কেবল অচেনা পাখি, পাহাড় আর জলের মিলনের সুর।

বরকল বাজার থেকে ছোট হরিণার পথে রওনা দিতে বিকেল প্রায় ছুঁই ছুঁই। এর আগে লংগদু হয়ে আমাদের যাত্রা হতো শুভলং বাজার। সেখান থেকে দুপুর আড়াইটায় বরকলের শেষ লঞ্চ ধরতে হতো। বরকল হয়ে হরিণা যেতে সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। এবার লেকের পানি কমে যাওয়ায় রাঙামাটি থেকেই সরাসরি কান্ট্রি বোটে বরকল। ক্লান্তিহীন প্রায় ১০ ঘণ্টার ভ্রমণ। কাপ্তাই লেকের কোল ঘেঁষে থাকা পাহাড়, দলছুট বাড়ি ও নীল জলরাশির ভিড়। কোথাও কোথাও পাখির ঝাঁক। বরকলের পাহাড়চূড়ায় সূর্যটা কত সুন্দর হতে পারে! সেই সঙ্গে শেষ বিকেলের মায়াবী আলো।

বরকল বাজার পাড়ি দিতে না দিতেই চোখ ধাঁধানো সব দৃশ্যপট। পাহাড়ের কোলে জুমঘর। মেঘের ছায়ায় ঢেকে আছে গ্রামগুলো। কাশবন ঘেঁষা পাহাড়ের কোলজুড়ে রংধনুর রেখা সবুজ পাহাড়কে যেন আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। শেষ বিকেলের শান্ত জলপথ। সন্ধ্যার সোনালি উজ্জ্বল আকাশ! এ যেন পূর্ণিমার আলোয় ডুবে থাকা নীরব-নিঝুম পাহাড়। কর্ণফুলীর দুধারে এমন নিরবচ্ছিন্ন পাহাড়ের সারি আর কোথাও বোধহয় পাওয়া যাবে না। তবে লেকের পানি কম হওয়ায় কোথাও কোথাও আটকে যায় বোটের তলা। শেষ বিকেলে ছোট হরিণার আগেই ভূষণ ছড়ায় নামতে হলো। পানি কম হওয়ায় ওদিকটায় যাওয়া সম্ভব হবে না।

ভূষণ ছড়ায় নেমে ভাড়ায় চালিত বাইকে ছোট হরিণা ঘাট। তারপর নৌকায় পার হলেই ছোট হরিণা বাজার। নেমেই ক্যাম্পে ছোট হরিণা বিজিবি জোন অধিনায়কের আমন্ত্রণে চা আর ঝাল খাবারের আয়োজনে সামিল হয়েছি। ক্যাম্পের ভেতরে বাঁশ দিয়ে সাজানো দারুণ শৈলীর বৈঠকখানা। সেই দীর্ঘ নৌ যাত্রার পর অসাধারণ সন্ধ্যার ভোজ। এত দুর্গমেও অসাধারণ খাবারের স্বাদ। ক্যাম্প থেকে বিদায় নিয়ে বাজারের দিকে রওনা হলাম আমাদের রাতের থাকার জায়গায়।

নিজ নিজ দেশের পতাকা লাগিয়ে এভাবেই চলাচল করে নৌকাগুলো। ছবি: সমির মল্লিক

পাহাড় আর নদী ঘেঁষা ছোট হরিণা বাজার। ধবধবে জোছনায় আলোকিত পুরো সীমান্ত। নদীর জলে ধুয়ে যাচ্ছে চাঁদের আলো। কী মুগ্ধ করা রাত! পাহাড় ঘেঁষে থাকা চাঁদের আলোয় রূপালি জলের ধারা। তীব্র স্রোতে ভেসে যাওয়ার এই তো সময়। পরদিন সকাল হতেই ঠেগামুখে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম আমরা। যাত্রার সঙ্গী বিশেষ ইঞ্জিন চালিত বার্মিজ বোট। দেশি বোটের চেয়ে এর গতি অনেকটাই বেশি। তীব্র স্রোতের বিপরীতে ছুটে চলে আমাদের বোট। সামনে যেতেই দেখা মেলে সুউচ্চ টারশিয়ান যুগের পাহাড়। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে বসতি। এবার বড় হরিণা ক্যাম্পে ক্ষণিকের বিরতি।

ক্যাম্পের উল্টো দিকে জিরার খামার। প্রায় এক ঘণ্টা চলার পর দেখা মেলে মিজোরাম সীমান্তের। বিএসএফের নিরাপত্তা চৌকি। সুদূরে উঁচু পাহাড়ের সীমানা। পথে পথে মিজোদের যাতায়াত। কর্ণফুলীর পাড় ঘেঁষে অচেনা মিজো গ্রামের নান্দনিক বসতবাড়ি। ওপারে সীমান্তে মেলে নাগরিক জীবনের সকল সুবিধা। মিজোরামে পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ সবই আছে। কোথাও কোথাও ভারতীয় পতাকাবাহী নৌকায় মিজোদের যাতায়াত। শনিবার মিজোরামের সীমান্ত ঘেঁষা শিলচরে বসে বাজার। সেখান থেকেই সদাই করে ফিরছে তারা। শুধু মিজোরাম নয়, শিলচর হাটে বাংলাদেশ থেকে পাহাড়িরাও যায়। আবার বাজার শেষ করে ঠেগামুখে ফিরে আসে। ওপারে থাকা মিজোগ্রামের বাসিন্দারাও এপার (ঠেগামুখ) থেকে বাজার করে নিয়ে যায়। মাঝখানে কেবল একটি নদীর দূরত্ব।

ঠেগামুখ বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। বাজারটা সরকারিকরণ হয় ২০০৩ সালে। সব মিলিয়ে ১৫-২০টি দোকান। সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার বাজার বসে। সেদিন দূর-দূরান্তের বাসিন্দারা বাজারে আসে। দুই দেশের মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম থাকে বাজার। সেখনকার এক দোকানদার রুমা চাকমা বলেন, ‘আট বছর ধরে এখানে দোকান করছি। ভালোই বেচাকেনা হয়। সীমান্ত কাছের হওয়ায় বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য থাকে।’ আরও জানালেন, ‘দুই পারের মানুষের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।’

ঠেগামুখ বাজার থেকে নিত্যপণ্য কিনে মিজোরামে ফিরে যায় সেখানকার বাসিন্দারা। ছবি: সমির মল্লিক

আবার ঠেগামুখ বাজার থেকে নিত্যপণ্য কিনে মিজোরামে ফিরে যায় সেখানকার বাসিন্দারা। মনেই হয় না দুটি আলাদা দেশ, মাঝখানে আছে সীমান্তের বেদনা। বছরের পর বছর এখানে এভাবেই চলে লেনদেন। দীর্ঘ সময় ঠেগামুখ বাজারে কাটিয়ে আবার রওনা হলাম ছোট হরিণার পথে। হরিণা ক্যাম্পে সিওর আমন্ত্রণে দুপুরের উদরপূর্তি। নদীর বোয়াল, কাতলসহ বিভিন্ন উপাদেয় খাবার মধ্যাহ্নভোজ শেষে বিকেলের মায়াবী আলোয় কর্ণফুলী নদীর স্রোতে ভেসে চলা। দিন শেষে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নেমে যাচ্ছে শেষ বিকেলের সূর্য। তার পূর্বাকাশে পাহাড়ে হেলান দিয়েছে পূর্ণিমার ঝকঝকে বড় চাঁদ।

চাঁদের আলোয় ডুবে থাকে চিত্রপটের মতোই সুন্দর হরিণা, শ্রীনগর, নীলকণ্ঠ, মিজোরামের পাহাড় এবং ঠেগামুখ।

প্রয়োজনীয় তথ্য: জলযানে রাঙামাটি থেকে বরকল। সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। বরকল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ ছোট হরিণা। তবে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় সময় আরও বেশি লাগতে পারে। ছোট হরিণায় থাকার তেমন ভালো আয়োজন নেই। থাকতে হবে দোতলা বোর্ডিংয়ে। শৌচাগারের সুবিধা নেই। তবে খাবারের ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। বাজারের বাথুয়ায় রাখাইনে খাবারের ষোলো আনা বাঙালি স্বাদ পাওয়া যায়। তবে ঠেগামুখ যাওয়ার আপাতত অনুমতি নেই। বিশেষ উপায়ে অনুমতি মিললে যেতে পারবেন। বার্মিজ বোটে সময় লাগবে দুই ঘণ্টা।