এমন উদার, মহৎ, সর্বংসহা মা কোথাও দেখিনি

সারা বিশ্বে এখন শুধু দিবসের ছড়াছড়ি। কোন দিন কোন দিবস, তা মনে রাখাই কঠিন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিবস যেমন আছে, তেমনি গুরুত্বহীন দিবসও আছে। গুরুত্বহীন এসব দিবসের নাম শুনে অনেককে হাসাহাসিও করতে দেখা যায়। কিছু কিছু দিবস আছে, যা বড়ই অদ্ভুত, যেমন—হতাশা দিবস! খুঁজলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো দিবস পাওয়া যাবে। ওজন দিবস, পাসওয়ার্ড দিবস ধরনের দিবসের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, আগামীতে নানা দিবস, নানী দিবস, আমাশা দিবস, ট্যাবলেট দিবস, ক্যাপসুল দিবস, তাপ দিবস, চাপ দিবস, মদন দিবস, আইজুদ্দিন দিবস পালন করা হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না!

তবে এই দিবস পালনের ভিড়ে একটি দিবস, সত্যিই আলাদা তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়। সেই দিবসটি হলো মা দিবস! এই দিবসটির পেছনে ‘মা’ শব্দটি যুক্ত থাকার কারণেই সম্ভবত এটি এমন মহিমামণ্ডিত হয়েছে। যদিও দিন-ক্ষণ মেনে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যায় না। মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রতিদিনের। তারপরও একটা বিশেষ দিন শুধু মায়ের জন্য। বিষয়টি ভাবলেই মনের মধ্যে একটা শিহরণ জাগে। আবেগ-অনুভূতি-ভালোবাসা আর উপলব্ধিতে মনটা দ্রবীভূত হয়ে ওঠে।

আমি সৌভাগ্যবান যে আমার মা এখনো বেঁচে আছেন। নব্বই পেরিয়েও মা এখনো বেশ টনটনে। বছর পাঁচেক আগে পড়ে গিয়ে গ্রোয়েনের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। ভেতরে লোহালক্কড় দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে। তারপর থেকে একা একা সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না। ওয়াকারের সাহায্য নিতে হয়। ওয়াকারের সাহায্যে ঘর-বারান্দা-উঠানে চলতে পারেন। চেয়ারে বসে এখনো তরকারি কাটেন। ফোন এলে কল রিসিভ করতে পারেন। এক দশক আগের চোখের ছানি অপারেশনের পর এখনো সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পান। এখনো সবকিছু মনে রাখতে পারেন। শুধু শ্রবণযন্ত্রটাই একটু দুর্বল হয়েছে। এ ছাড়া শরীরের সব কলকব্জাই সচল। 

আমার মা সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। অনেক-দুঃখকষ্ট সয়েও যেভাবে আমাদের বড় করেছেন, পরিবার সামলেছেন, তা সত্যিই বিরল। মাত্র তেরো বছর বয়সে মায়ের বিয়ে হয়েছিল। একেবারেই অক্ষরজ্ঞানহীন আমার মাকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। কারও সঙ্গে ঝগড়া না করা, হিংসা, ঈর্ষা না করা, নির্লোভ-নিরাসক্তভাবে জীবন যাপন করা, নারী-পুরুষ, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সমান চোখে দেখা, নিজে কম-খেয়ে, কম-পরে অন্যকে সাহায্য করা, বাসায় কেউ এলে আদর-আপ্যায়ন-যত্ন করা, পরিবারের সবাই মিলেমিশে থাকা—এমনই দুর্লভ সব গুণ মা ধারণ করেছেন। সারা জীবন এসব গুণের চর্চা করেছেন। সব ধরনের মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা আমরা মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি। 

অথচ আমার মায়ের যাতায়াতের পরিধি খুব একটা বেশি নয়। অন্তত বাড়ির কাজকর্ম সামলানোর পর এদিক–ওদিক একটু ঘুরে আসার সময় কখনো পাননি। এমনকি কোনো আত্মীয় বাড়িতেও মাকে কখনো যেতে দেখিনি। আমরা দুই ভাই ঢাকায় থাকি। আমাদের পীড়াপীড়িতে চিকিৎসার জন্য তিনি দুবার ঢাকায় এসেছিলেন বটে। কিন্তু এখানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি। মা কোনোদিন তেমনভাবে কোথাও ঘোরেননি। তারপরও কীভাবে এমন সব মানবিক গুণ আয়ত্ত করেছেন, সেটা আমার কাছে এক পরম বিস্ময়!

আমার মার কথা ভাবলে সত্যিই বুকের ভেতরটা নিদারুণ কষ্টে ভরে ওঠে। আমরা ১১ জন ভাইবোন। এই ১১ সন্তানকে তিনি কী নিপুণ দক্ষতায় ‘মানুষের মতো মানুষ’ বানানোর চেষ্টা করেছেন! নিজে নিরক্ষর হয়েও সাধ্যমতো সবার লেখাপড়ার চেষ্টা করেছেন। জীবনে এমন কোনো বিপদ নেই, যার মুখোমুখি আমার মা হননি। দেখেছেন মৃত্যুর মিছিল। শৈশবে বাবাকে হারিয়েছেন। নিজের মা ও শাশুড়ির মৃত্যু, চোখের সামনে অজ্ঞাত ঘাতকের হাতে সন্তান খুন হওয়া, স্ত্রী-সন্তান রেখে আরেক সন্তানের অকাল মৃত্যু, একাধিক নাতি-নাতনির মৃত্যু, স্বামীর মৃত্যু, বিধবা ছেলের বউকে নিজের পরিবারের একজন করে রেখে দেওয়া, মেয়ের জামাইয়ের অকাল মৃত্যু, প্রতিবন্ধী দুই যমজ নাতনির জন্ম ও বড় হতে দেখা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে এক ছেলের দেশান্তরী হওয়া, আরেক মেয়ের দেশান্তর, চরম অভাব, দারিদ্র্য—সবকিছুই তিনি দেখেছেন! সমস্ত প্রতিকূলতা, দুর্যোগ, শোক সামলেছেন নিজস্ব নিয়মে। 

ছোটকাল থেকে দেখেছি মাকে সবার পরে ঘুমাতে। আবার দেখেছি সবার আগে উঠতে। সংসারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। অথচ কখনো অভিযোগ করেনননি।

সংসারে চরম টানাটানির মুহূর্তেও দেখেছি নিজে আধ-পেটা খেয়ে অধিকতর দরিদ্র প্রতিবেশীদের গোপনে খাবার বিলিয়ে দিতে। নিজে কখনো কোনো সাধ-আহলাদ করেননি। ভালো একটা কাপড় দিলে পরতে চাননি। অথচ অন্যকে দেওয়ার ব্যাপারে আমার মাকে কখনো কৃপণ হতে দেখিনি। সবচেয়ে ভালোটা অন্যকে বিলিয়ে দেওয়ার মহত্ব আমার মায়ের মতো আমি দ্বিতীয় কারও মধ্যে দেখিনি। সব রকম সংকীর্ণতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ আর স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠেও যে বেঁচে থাকা যায়, সেটা আমি শিখেছি আমার মায়ের কাছ থেকে। 

গত প্রায় নব্বই বছরেরও বেশি সময় ধরে মা আমাদের সংসারে বটবৃক্ষ হয়ে আছেন, থেকেছেন। কোনো বই না পড়ে, পুঁথিগত কোনো বিদ্যা ছাড়াও যে মানুষ বৃহৎ ও মহৎ হতে পারে, সেটা আমার মাকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। 

কৈশোরে অনেক সময়ই মায়ের অবাধ্য হয়েছি, মাকে উপেক্ষা করেছি। সিনেমা দেখার জন্য প্রায়ই মায়ের কাছে টাকার জন্য বায়না ধরতাম। অভাবের সংসারে সিনেমা দেখার টাকা দেওয়ার মতো বাস্তবতা ছিল না। তাই টাকা না দিয়ে মা ধমক লাগাতেন। কিন্তু টাকা না পেয়ে মায়ের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছি। অনেক সময় দেখেছি, মা ধমক দেওয়ার পর আড়ালে চোখের জল ফেলতেন। এই অশ্রু যে সন্তানের বায়না মেটাতে না পারার অক্ষমতাজনিত, সেটা তখন বুঝিনি! আজ যখন বুঝি, তখন সত্যি নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হয়! মাকে বুঝতে না পারা, কষ্ট দেওয়া, অবাধ্য হওয়ার জন্য মাঝে মাঝে খুবই অনুশোচনা জাগে। যদিও জানি, আমার মায়ের কোনো সন্তানের ব্যাপারেই কখনো কোনো অভিযোগ ছিল না, এখনো নেই।

আমার মা এখন মাঝে মাঝে নাতি-নাতনিদের বায়না মেটাতে আমার কাছে টাকা চান। হয়তো পাঁচ শ টাকা চেয়েছেন। আমি এক হাজার টাকা দিয়েছি! মা কিছুতেই বাড়তি পাঁচশ টাকা নিতে চান না! আমি যখন জোর করি, তখন মায়ের চোখে আবার অশ্রু! 

মাকে আমরা এখনো যখন কোনো শাড়ি কিনে দিই, আসল দামটা বলি না। কারণ, তিন শ টাকার বেশি দিয়ে আমরা শাড়ি কিনেছি বললে তিনি সেটা পরতে চান না। মন খারাপ করে বসে থাকেন। বলেন, কতজনের কত অভাব। এত দাম দিয়ে আমার শাড়ি কেনার দরকার কী!

আমার মা বৌমা-নাতি-নাতনিদের নিয়ে এখনো খুব ভালো আছেন। বৌমারাও তাঁর মেয়ে। মেয়েদের সঙ্গে তিনি বৌমাদের কখনো আলাদা করেননি। আমার মা এলাকার সবার কাকিমা কিংবা দিদিমা। বাড়ির পাশ দিয়ে যারাই যায়, তারা মায়ের সঙ্গে দেখা করে যায়। অনেকে বেশ দূর-দূরান্ত থেকেও মাকে দেখতে আসে। মা যেমন সবাইকে ভালোবাসেন, অন্যরাও মাকে ভালোবাসেন। নিরক্ষর-দীন-হীন আমার মায়ের এমন ‘রাজসিক’ জীবনযাত্রা দেখে গর্বে আমাদের মন ভরে যায়! 

সন্রতান–সন্ততির সাথে মাধবীলতা সরকার। ছবি: লেখকের পারিবারিক অ্যালবাম থেকেপ্রত্যেক সন্তানের কাছেই হয়তো তার মা সবচেয়ে সুন্দর ও মহৎ! কিন্তু এই একটি ব্যাপারে আমার একটা আলাদা অহঙ্কার আছে! আমার মায়ের মতো যে সর্বংসহা মা, তাঁর চেয়ে উদার, মহৎ, সুন্দর কোনো ব্যক্তিত্ব আমি আজও দেখিনি! 

মাঝে মাঝে বিভিন্ন টেলিভিশনে, গণমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনি নিয়ে আলাপ করতে শুনি। আমি জানি, আমার মাকে নিয়ে কখনো কোথাও কোনো আলোচনা বা অনুষ্ঠান বা ফিচার লেখা হবে না! কিন্তু আমি এও জানি, যাদের কথা গণমাধ্যমে আলোচনা হয়, আমার মায়ের মহত্ব, জীবনবোধ ও জীবনসংগ্রাম তার চেয়ে ঢের বেশি আকর্ষণীয়, তাৎপর্যপূর্ণ। এমন আলোচনা না হলেও বা ক্ষতি কী? আমি তো অন্তত এমন মায়ের সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে বেঁচেছিলাম! হ্যাঁ, নীতি-আদর্শ-মহত্ব নিয়ে বুক উঁচিয়ে!

মাকে আমি ভালোবাসি। শ্রদ্ধা করি। আমার এ ভালোবাসা একদিনের জন্য নয়, প্রতিদিনের। জানি, তারপরও মায়ের প্রতি ঋণ শোধ হবে না!

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন: