ঘন হয়ে রোদ নামে মাটির বাড়ির উঠোনে। সেই উঠোনে পাটি বিছিয়ে নকশি কাঁথা সেলাই করেন পাঁচ ফুট শরীরের ছোট্ট এক নারী, মোছাম্মৎ মুশফিকা শবনম বিজলি—আমার মা। তাঁর নকশি কাঁথায়, শারীর আঁচলে, সুঁচের ডগায় নকশা আঁকে শীতের সকালের হলুদ রোদ। তিনি যে শুধু সুঁই-সুতোয় কাপড় বেঁধে রাখতেন, তা নয়, সংসারটাও বেঁধে রাখতেন পরম মমতায়। কীভাবে বেঁধে রাখতেন, তা বোঝার বয়স তখনো হয়নি আমাদের।
পরে শুনেছি, মা যখন আমার বাবার সংসারে বউ হয়ে আসেন, তখন আমার স্কুল মাস্টার আব্বার বেতন ছিল দেড় শ টাকা। সেই টাকায় কীভাবে সংসার চলে, তা জানতেন না গণিতের শিক্ষক রুহুল আমিন মাস্টার। সারা জীবন ছাত্র-ছাত্রীদের হিসাব শেখালেও সংসারের হিসাবটা কোনোদিন করতে পারতেন না। ওই হিসাব রাখতেন ‘ম্যাট্রিক ফেল’ মোছাম্মৎ মুশফিকা শবনম। তিনি তাঁর জীবনের প্রতি বিন্দু আয়ু ক্ষয় করে আমাদেরকে জীবনের সব পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিয়ে গেছেন।
তাঁর হিসাবজ্ঞান কতটা টনটনে ছিল, একটা ঘটনা বলি। একবার কী এক জরিপের কাজে লোক এল বাড়িতে। মাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন?
—ছয়জন।
—নাম বলেন।
মা তিনজনের নাম বলার পর আর বলতে পারেন না। জরিপকারী জিজ্ঞেস করেন, ‘আরও তিনজনের নাম বলেন খালাম্মা।’ মা বলেন, ‘ওই তিনজনের নাম নাই।’
—নাম নাই মানে? নাম রাখেন নাই? তাহলে কী বলে ডাকেন?
—নাম রাখার আগেই ওরা মারা গেছে।
যে সন্তানেরা জন্মের পরপরই মারা গেছেন, নাম রাখার সুযোগ পর্যন্ত দেয়নি, সেই সন্তানদেরও কখনোই হিসাব থেকে বাদ দেননি আমার মা।
আমার হিসাবী মা কোনোদিন বাড়তি খরচ করেননি। কখনো আমার মাকে নিজের শখের জিনিসপত্র কিনতে দেখিনি। গ্রামে গ্রামে ‘ইন্ডিয়ান শাড়ি’ ফেরি করতে আসা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে নিজের প্রয়োজনীয় শাড়িটুকু কিনেছেন। আর আমাদের জন্য কেনাকাটা করতেন ‘বগুড়া শহর’ থেকে। আমাদের হাঁচি-কাশি হলেও ছুটে যেতেন বগুড়ায় ‘বড় ডাক্তারের’ কাছে। কোনোদিন আমার জন্য বাটার জুতা-স্যান্ডেল ছাড়া কেনেননি।
রুহুল আমিন মাস্টারের মাত্র দেড় শ টাকার বেতনের মধ্যে কীভাবে এতকিছু করতেন মুশফিকা শবনম? এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে সেই দৃশ্যগুলো মনে পড়লে বিস্ময় লাগে। একটা প্রায় দরিদ্র সংসারকে কীভাবে টেনে নিয়ে যেতেন? আমাদের গ্রামীণ নিম্ন মধ্যবিত্ত মায়েদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা হলে হয়তো সেই গূঢ় তত্ত্ব বের হয়ে আসবে।
এখন বড় হয়ে আমার ম্যাট্রিক ফেল মায়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা একটু বোঝার চেষ্টা করি আর অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রই। কী উদয়াস্ত পরিশ্রমটাই না করতেন।
আমাদের একটা সেলাই মেশিন ছিল। সেই সেলাই মেশিনেই আমাদের জামা-কাপড়, নিজের ব্লাউজ-পেটিকোট সেলাই করতেন মা। শুধু সিনেমার গল্পের সঙ্গে মানুষের জীবনের গল্প মেলে না বলে আমার মা ঢাকাই সিনেমার নায়িকা শাবানার মতো সেলাই মেশিন ঘোরাতে ঘোরাতে ‘বড়লোক’ হয়ে যেতে পারেননি।
মা শুধু সেলাই মেশিনের কাজই জানতেন না, নকশি কাঁথায় ফুল তুলতে জানতেন, আরও নানা ধরনের সেলাইয়ের কাজ জানতেন। তখন আড়ংয়ের নাম শুনিনি আমরা, কিন্তু মার হাতে ঠিকই ফুটে উঠত আড়ংয়ের নকশা।
ছোটবেলায় মা একটা উলের কানটুপি বুনে দিয়েছিলেন। একটা নীল রঙের সোয়েটার বুনে দিয়েছিলেন। খুব ইচ্ছে করে, হিমহিম কুয়াশার ভোরে সেই কানটুপি আর সোয়েটার পরে স্কুলে যাই। দেহের খাঁচা খানিকটা বেড়ে যাওয়ায় ওই পোশাকগুলো আর শরীরে আঁটে না বলে ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারি না।
তবে মার হাতে ফুলতোলা একটা শীতের চাদর এখনো আমি গায়ে দিই। প্রতি শীতে ওই চাদর শরীরে জড়িয়ে আমি যে উষ্ণতা পাই, তা হাজার টাকা দামের ওভারকোটের মধ্যেও পাই না।
এভাবে মা নিজ হাতে আমাদের প্রয়োজনীয় পোশাক বানিয়ে দিয়ে সংসারের খরচ কমাতেন। পরে জেনেছি, অর্থনীতির ভাষায় এরই নাম ‘ব্যয়সংকোচন নীতি’। আর বাড়তি অর্থ সংস্থান করতেন হাস-মুরগি বিক্রি করে আর ডিম বিক্রি করে। প্রচুর হাস-মুরগি পালতেন মা। আর প্রচুর গাছ লাগাতেন। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কামরাঙা, লটকন, আমড়া, কলা, লেবু, কদবেল, সজনে… কত রকমের গাছ যে লাগিয়েছেন মা! সেসব গাছের ফল বিক্রি করেও সংসারে অর্থের জোগান দিতেন।
বাড়ির চারপাশজুড়ে সেসব গাছ এখনো আছে। সেদিন বাড়ি থেকে ছোটবোন ছবি তুলে পাঠাল। আম-কাঁঠাল-লটকনে ছেয়ে গেছে গাছগুলো। শুধু যে মানুষটা গাছগুলো লাগিয়েছিল, তিনিই নেই!
বুকের মধ্যে প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হলো আমার। মনে পড়ল আট মাস আগের এক বৃষ্টির সন্ধ্যা। পপুলার হসপিটালের উল্টো দিকে সিটি কলেজের পাশে একটা ওষুধের দোকানের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে আছি। ঘন হয়ে সন্ধ্যা নামছে। আর বৃষ্টি নামছে প্রবল। শহর ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো বৃষ্টি। আমার হাতে এক গাদা মেডিকেল রিপোর্টের ফাইল।
রাস্তার ওপারে পপুলার হসপিটালে মোছাম্মৎ মুশফিকা শবনম মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর সারা শরীরে। কিডনি বিকল হয়ে গেছে। ডায়ালাইসিস চলছে। এর মধ্যে হয়েছে স্ট্রোক। একটা পুরোনো রিপোর্ট দেখা দরকার, যেটি ছিল বাসায়, ডাক্তার বললেন, দ্রুত রিপোর্টটা নিয়ে আসুন। আমি সেই রিপোর্ট নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। মনে মনে ভাবছি, মা আবার ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে। তাঁকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাব, মাটির উঠোনে পাটি পেতে দেব, মা আবার শীতের রোদ গায়ে মেখে নকশি কাঁথা বুনবেন।
বৃষ্টি একটু কমলে যখন হসপিটালে গেলাম, ততক্ষণে স্ট্রোক তাঁর কথা বলার শক্তি কেড়ে নিয়েছে!
মার সাথে আমার শেষ কথা হয়েছিল ওই পপুলার হসপিটালেই। ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না। কথা জড়িয়ে আসত। তবু অনেক কষ্টে অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘ভাত খাইছিস, বাবা?’
সারা জীবন আমার ভাত খাওয়া নিয়ে টেনশন করে গেছেন মা। জীবনের শেষ বেলায়, যখন আয়ু ফুরিয়ে আসছে তাঁর, যখন কথা বলার মতো একবিন্দু শক্তি নেই, তখনো তাঁর মস্তিষ্কে সক্রিয় একটিমাত্র ভাবনা—তাঁর খাওয়া-দাওয়ায় অবহেলা করা ছেলেটা খেয়েছে কি না!
ছেলেটা এখনো খাওয়া-দাওয়ায় চরম অনিয়ম করে। কিন্তু তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কেউ নেই।
এভাবেই আমাদের মায়েরা সংসারের চাকা সচল রাখতে রাখতে নিজেরাই একসময় বিকল হয়ে যান। ছেলেমেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে নিজের চিন্তা করার সময় পান না। যে মানুষটা এসএসসি অব্দি পাস করতে পারেন না, সেই মানুষটাই তাঁর ছেলেমেয়েদের জীবনের সব পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিতে জীবন ক্ষয় করে ফেলেন। এই করতে করতে কোন ফাঁকে তাঁদের প্রাণবায়ু নিভে যায় পাঁচ পয়সার মোমবাতির মতো। শুধু সংসারজুড়ে ছড়িয়ে থাকে শীতের রোদের মতো টুকরো টুকরো স্মৃতি।
হায়! নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।
লেখক: সহসম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
আরও পড়ুন:



