‘পুলিশের গুলিতে পুলিশ খুন’, ‘মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন সেই কনস্টেবল কাওছার’, ‘ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা’, ‘সাবেক আইজিপি বেনজীরের স্ত্রী ও মেয়েদের সম্পত্তিও ক্রোকের নির্দেশ’, ‘সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ’—এই হচ্ছে গত এক মাসে সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরের বাছাই শিরোনাম। কী নেই! পুলিশের সাবেক শীর্ষকর্তা মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের অকল্পনীয় সম্পদ, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সম্পদ দখলে পুলিশেরই আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের ব্যবহার, পুলিশ সদস্যের গুলিতে পুলিশ সদস্য খুন, হত্যাকারী পুলিশ সদস্যের মানসিক অসুস্থতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, ঘুমের বড়ি খেয়ে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা—সবই আছে। এত এত নেতিবাচক ঘটনায় পুলিশের নাম জড়িয়ে যাচ্ছে যে, প্রশ্ন উঠছে–আসলে কী হচ্ছে?
এমনিতে পুলিশের সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের একটা দূরত্ব আছে। এটা আজকের সমস্যা না। হয়তো ব্রিটিশ, হয়তো মুঘল আমলেও এমনটাই ছিল। আর দুর্নীতি নিয়ে পুলিশের বদনাম অনেক দিনের। গত কয়েক বছরে দেশের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে উঠে আসা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বরাবরই শীর্ষ তিনে ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ।
ফলে পুলিশে দুর্নীতি ও এর ব্যাপকতার বিষয়টি এক রকম ওপেন সিক্রেট বলা চলে। রাস্তায় চলতে গেলে বিভিন্ন সড়কে যেভাবে গাড়ি থামিয়ে রীতিমতো ‘টোল’ আদায়ের মতো করে টাকা তোলা হয়, এবং এমন বহু স্থিরচিত্র খবরের কাগজগুলোয় যেভাবে নিয়মিত বিরতিতে প্রকাশ হয়, তাতে এটি আর আড়ালের কোনো ঘটনা নয়। তবে এর মাত্রা ঠিক কতটা হতে পারে, তার একটি নজির স্থাপন করেছে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সম্পদের পরিমাণ। তাঁর সম্পদ দেখে বিস্ময় প্রকাশে বাধ্য হয়েছেন উচ্চ আদালতও।
এই হলো পুলিশের শীর্ষ কর্তা, যিনি বাহিনীতে থাকার সময় নানা কারণে প্রশংসিত হয়েছিলেন, তাঁর অবস্থা। দুর্নীতির উদাহরণ স্থাপনে তিনি শীর্ষ কর্তার মতোই কাজ করেছেন বলতে হবে।
এই খবর ও এই দুর্নীতির তদন্ত এবং বেনজীরের দেশে না থাকা, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নির্ধারিত তারিখে তাঁর উপস্থিত না হওয়া, ফের সময় চাওয়া ইত্যাদি যখন আলোচনায়, তখন পুলিশ আবারও আলোচনায় এল। এবারও একটি নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়ে, যা শুধু নেতিবাচকই নয়, হৃদয়বিদারকও বটে। রাজধানীর বারিধারায় কূটনীতিক এলাকায় দায়িত্বরত কনস্টেবল কাওছার আলীর গুলিতে নিহত হন আরেক পুলিশ কনস্টেবল মনিরুল হক। জুনের প্রথম দিনই এ ভয়াবহ ও কপালে দুর্ভাবনার ভাঁজ ফেলার মতো ঘটনাটি ঘটে।
এমনিতেই বাহিনীর এক সদস্যের গুলিতে আরেক সদস্যের নিহত হওয়া ভীষণ দুর্ভাবনার উদ্রেক করে। এর সাথে যুক্ত করুন কাওছারের পরিবার অভিযোগ। সেখানে বলা হচ্ছে, কাওছার মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং সে সম্পর্কে পুলিশ প্রশাসন জানত। এই অভিযোগ রীতিমতো হতবুদ্ধিকর। কাওছারের মা নিজেই এই অভিযোগ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কাওছার মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল এবং তাঁকে পাবনায় মানসিক হাসপাতাল থেকে দুবার চিকিৎসা নিতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, পুলিশের পক্ষ থেকেও তাঁর মানসিক সুস্থতার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাওছার নেশাগ্রস্তও ছিলেন।
স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি গুরুতর কিছু অসঙ্গতির দিকে ইঙ্গিত করে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে শুরুতেই বলা হয়, এ ধরনের কোনো কিছু সম্পর্কে তাঁরা ওয়াকিবহাল ছিলেন না। পরে অবশ্য এ বয়ান পাল্টেছে। বলা হয়েছে যে, তাঁরা জানতেন। তবে সুস্থতার সনদ থাকাতেই তাঁকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল কূটনীতিক এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়, যেখানে তাঁর কাছে ছিল অত্যাধুনিক অস্ত্র।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই সর্বশেষ বয়ানকে আমলে নিলে বলতে হবে, এমন সংবেদনশীল একটি পেশায় থাকা পুলিশ সদস্যদের মানসিক সুস্থতার পরীক্ষা-পদ্ধতি এবং সেখানে দুর্নীতির উপস্থিতি থাকা, না থাকার বিষয়টি নিয়ে জরুরি অনুসন্ধান প্রয়োজন। যদি অসুস্থ কারও পক্ষে সুস্থতার সনদ নিয়ে বাহিনীতে যোগ দেওয়া যায়, তবে এটি সাধারণ মানুষ তো বটেই, তাঁর সহকর্মীদের জন্যও নিরাপদ নয়। নিরাপদ যে নয়, তা তো নিহত মনিরুলই প্রমাণ করে দিয়েছেন।
এখানেই শেষ নয়। মাত্র দুদিন আগে নেত্রকোণায় আরেক পুলিশ সদস্য শতাধিক ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এই খবর পুলিশ সদস্যদের মানসিক সুস্থতার প্রশ্নটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। এমন নয় যে, পুলিশ সদস্যদের আত্মহননের খবর এই প্রথম। গত বছরও একাধিক পুলিশ সদস্য আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাজের চাপ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও ব্যক্তিগত নানা কারণে অস্থিরতায় ভোগেন পুলিশ কনস্টেবলরা। পুলিশের বিরামহীন কাজ, পদোন্নতি ও বদলিতে কোন কাঠামো না মানাসহ নানা কারণে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আত্মহত্যা বা অনিয়ন্ত্রিত আচরণের ঘটনা ঘটছে। অস্ত্রবহনকারী সব সদস্যের বিশেষ প্রশিক্ষণের তাগিদ দিচ্ছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা। শুধু বিশেষ প্রশিক্ষণ নয়, এখানে আসলে মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এ ধরনের পেশায় থাকা মানুষদের জন্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা আছে।
মুশকিল হলো–এ ধরনের ঘটনায় প্রথমেই বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা আখ্যা দিয়ে দায়িত্ব সেরে ফেলার একটি প্রবণতা দেশের ঊর্ধ্বতনদের জন্য নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের হাতে পুলিশ খুন বা পুলিশের আত্মহত্যা ইত্যাদি প্রতিটি ঘটনাকেই এরই মধ্যে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সাবেক আইজিপির ভয়াবহ দুর্নীতি ও তাঁর সম্পদের তালিকা দেখে উচ্চ আদালতের চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো মন্তব্যের পরও তা ‘ব্যক্তিগত দুর্নীতি’ হিসেবে আখ্যা পাচ্ছে। এটিই মূলত দুর্ভাবনার মূলে। কারণ, এই পৃথকীকরণের প্রবণতা বলে দিচ্ছে যে, আমরা সংকটকে স্বীকার না করে অনেকটা চোখ বুজে এর সমাধান খুঁজছি। কিন্তু অন্ধ হলে তো প্রলয় বন্ধ থাকে না।
মনে রাখা জরুরি যে, নিম্ন পদের পুলিশ সদস্যদের মানসিক অসুস্থতা বা বিষণ্নতা যেমন বাস্তব, তা থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও বাস্তব। এমনকি এই মানসিক অসুস্থতা বা বিষণ্নতার কার্যকারণও উপস্থিত। ঠিক তেমনি দেশের পুলিশের নানা স্তরের সদস্যরা যে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং এর মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ছেন, তাও বাস্তব। আর এই দুর্নীতি বা এর মাধ্যমে গড়া সম্পদ যে তিনি তাঁর পদ ও পোশাকটি ব্যবহার করেই করছেন, তাও অস্বীকারের জো নেই। ফলে এটি স্বীকার করে নিয়ে এর মীমাংসার পথে হাঁটাই শ্রেয় হবে। তাহলেই বহুল উচ্চারিত–দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবায়নের একটা পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। না হলে প্রতিনিয়ত নেতিবাচক খবরের পাঁকে পড়ে ভুগতে হবে পুলিশ প্রশাসনকেই। আর পুলিশ প্রশাসনের ভোগা মানে তো জনগণেরই ভোগান্তি।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:
- সাবেক আইজিপি বেনজীরের সাভানা ইকো রিসোর্ট বন্ধ ঘোষণা
- বেনজীরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ছিল না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- সাবেক সেনা ও পুলিশ প্রধানের দুর্নীতিতে দেশের সুনাম নষ্ট: ফখরুল
- ‘বেনজীরের দুর্নীতি ব্যক্তিগত, পুলিশ দায় নেবে না’
- বেনজীর গ্রেপ্তার হবেন কিনা আদালত তা দেখবেন: কাদের
- হিসাব জব্দের আগেই শত কোটি টাকা ‘তুলে নিয়েছেন’ বেনজীর
- বিদেশে বেনজীরের সম্পদের খোঁজে বিএফআইইউকে দুদকের চিঠি
- আজিজ–বেনজীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত হবে: কাদের
- সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ
- বেনজীর ও তাঁর পরিবারের আয়কর নথি দুদকের হাতে
- বেনজীরের সম্পত্তি অনুসন্ধানের রিপোর্ট ২ মাসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ
- সাবেক আইজিপি বেনজীরের সম্পদ অনুসন্ধানে নামছে দুদক
- বেনজীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চেয়ে রিট