ফ্রান্স যেভাবে ইউরোপের ‘ব্রাজিল’ হয়ে উঠল

সম্প্রতি বেলজিয়ামের ডিফেন্ডার থমাস মুনিয়ের একটি বড় বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ফ্রান্সের বর্তমান ফুটবলারদের গভীরতা এতটাই বেশি যে, তারা চাইলে এমন তিনটি আলাদা দল নামাতে পারবে— যার প্রতিটিই বিশ্বকাপ জেতার ক্ষমতা রাখে! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, পরিসংখ্যান কিন্তু মুনিয়েরের পক্ষেই কথা বলছে। দলটির অনেক তরুণ তুর্কি মূল দলে জায়গা না পেলেও ফুটবলে দুনিয়ায় ঠিকই কাঁপন ধরাচ্ছেন। কিন্তু কীভাবে? কীভাবে ফ্রান্স ফুটবলবিশ্বের সবচেয়ে গভীর এবং দুর্ভেদ্য এই ট্যালেন্ট পুলে পরিণত হলো? আজকের খোঁজার চেষ্টা করব ফরাসি ফুটবলের সেই গোপন ফর্মুলা।

সাফল্যের গল্পটা একদিনের নয়

ট্রান্সফার-মার্কেট ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ জনের মূল দলে জায়গা না পাওয়া ফরাসি খেলোয়াড়দের নিয়ে যদি একটি বিকল্প একাদশ বানানো হয়, তবে শুধু সেই দলটির বাজারমূল্যই হবে প্রায় ৪১৮ মিলিয়ন ইউরো! কি বিশ্বাষ হচ্ছে না? আরও অবাক হবেন, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগাল বা নেদারল্যান্ডসের মূল দলের চেয়েও বেশি দামী এই দল।

এই সাফল্যের গল্পটা কিন্তু রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে চলা এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০—টানা ৪০ বছর বৈশ্বিক ফুটবলের বড় মঞ্চে ফ্রান্স ছিল ব্যর্থ। জিনেদিন জিদান বা কিলিয়ান এমবাপ্পেদের যুগের আগে ফ্রান্সের শোকেসে বড় কোনো ট্রফিই ছিল না। এই ব্যর্থতা থেকে মুক্তি পেতে সত্তরের দশকের শুরুতে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন প্রধান জর্জেস বোলন একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ট্রফি জিততে হলে ফুটবলার আমদানির মানসিকতা ছেড়ে নিজেদের মাটিতেই বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে।

এই ভাবনার ওপর ভিত্তি করেই জন্ম নেয় 'সেন্টার্স ডি ফরমেশন' বা ফুটবল ট্রেনিং একাডেমি। ফরাসি সরকার এই প্রকল্পকে জাতীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে মূল্যায়ণ করে এবং অর্থায়ন শুরু করে। ১৯৭৪ সালে প্রথম একাডেমি খোলার পর, ফ্রান্সের মূল কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিখ্যাত 'ক্লেয়ারফন্টেইন'। পুরো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল তো বটেই, ফ্রান্সের অধীনে থাকা দ্বীপগুলো থেকেও বাছাই করে সেরা সেরা ক্ষুদে প্রতিভাদের নিয়ে আসা শুরু হয় এখানে।

ব্ল্যাক-ব্লাঙ্ক-বুর বিপ্লব

শুরুতে এই প্রকল্পের ফল ছিল মিশ্র। ১৯৮৪ সালে মিশেল প্লাতিনির হাত ধরে ফ্রান্স ইউরো এবং অলিম্পিক জিতলেও, ১৯৯০ এবং ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে তারা কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু ফরাসি ফেডারেশন তাদের দীর্ঘমেয়াদি একাডেমি প্রজেক্ট থেকে পিছু হঠেনি।

অবশেষে এল ১৯৯৮ সাল! নিজেদের মাটিতে ফ্রান্স শুধু বিশ্বকাপই জিতল না, বরং বিশ্বকে দেখাল এক নতুন রূপ। ফ্রান্সের সেই দলটিকে বলা হতো ‘ব্ল্যাক-ব্লাঙ্ক-বুর’, যার অর্থ কালো, সাদা এবং আরব।

তৎকালীন ফরাসি অধিনায়ক ও গোলরক্ষক বার্নার্ড লামা বলেন, ‘আগের প্রজন্মের প্লাতিনি বা টাইগানাদের অনেক প্রতিভা ছিল, কিন্তু আমাদের দলটির বিশেষত্ব ছিল—আমরা সবাই একাডেমির কঠোর শৃঙ্খলা থেকে উঠে এসেছিলাম এবং আমাদের জেতার তীব্র ক্ষুধা ছিল। আর সাথে আমাদের ছিল জিনেদিন জিদানের মতো এক অতিমানবীয় প্রতিভা।’

ইউরোপের ব্রাজিল

ফরাসি ফুটবলের এই অবিরাম প্রতিভা সরবরাহের পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক হলো অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন। ফ্রান্সের সাবেক তারকাদের মতে, আফ্রিকা, ফ্রেঞ্চ গায়ানা বা মার্তিনিক থেকে আসা মানুষগুলো ফরাসি সংস্কৃতিতে দুটি জিনিস যোগ করেছে—মিউজিক এবং স্পোর্টস। আজকের উসমান দেম্বেলে, দেজিরে দুয়ে কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পে—এরা কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসেননি, এরা ফ্রান্সেই বড় হয়েছেন, বিশেষ করে প্যারিসের শহরতলি বা সাবার্বগুলোতে।

এখানকার ফুটবল সংস্কৃতি আমূল বদলে গেছে। ফুটবল বিশ্লেষকরা বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ফুটবল প্রতিভা তৈরি হয় দুটি জায়গা থেকে—একটি ব্রাজিলের সাও পাওলো, অন্যটি ফ্রান্সের প্যারিস। প্যারিসের অপেশাদার এবং প্রাইভেট একাডেমিগুলোর ছোট ছোট শিশুরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায় ফুটবল খেলে। ৮-৯ বছর বয়সেই তারা কনক্রিটের কোর্টে শরীর খাটিয়ে, প্রেশারের মধ্যে ড্রিবলিং শেখে। যার ফলে ১২ বছর বয়সের মধ্যেই তাদের খেলার ধরন হয়ে ওঠে পেশাদারদের মতো।

আশির দশকেই ফ্রান্সকে বলা হতো ইউরোপের ব্রাজিল, আর আজকের দিনে এসে ফরাসিরা সেই নামের প্রতিই যেন শতভাগ বিচার করেছে।

ফরাসি প্রশিক্ষণের 'গোপন ফর্মুলা'

কিন্তু শুধু প্রতিভা থাকলেই তো হয় না, তাকে ঘষেমেজে হীরা বানাতে হয়। ফরাসি একাডেমিগুলোর মূল শক্তি হলো তাদের অনন্য ট্রেনিং মেথডোলজি। এখানকার স্কাউট ও কোচদের মূল দর্শন হলো—'খেলোয়াড়ই প্রজেক্টের কেন্দ্রবিন্দু।' একাডেমিতে তরুণদের শুধু ফুটবলই শেখানো হয় না, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, একদম ছোট বয়সে বাচ্চাদের পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয় না, এতে তারা মানসিকভাবে শক্ত থাকে। ক্লেয়ারফন্টেইনের ট্রেনিংয়ে রাস্তার ফুটবলের স্বাধীনতা এবং ইউরোপীয় ট্যাকটিকসের এক দারুণ মিশ্রণ ঘটানো হয়। এখানে প্রচুর ওয়ান-অন-ওয়ান এবং টু-অন-টু ড্রিল করানো হয়। বলের ওপর নিখুঁত কন্ট্রোল না থাকলে এই একাডেমিতে টিকে থাকা অসম্ভব।

একই সাথে ছোট বয়সেই তাদের শেখানো হয় কীভাবে চাপের মুখে বল পজিশন ধরে রাখতে হয়। ফলস্বরূপ, ফ্রান্স এমন সব ফুটবলার পাচ্ছে যারা শারীরিকভাবে যেমন শক্তিশালী, টেকনিক্যালি তেমনই ক্ষুরধার।

যে দেশের রিজার্ভ বেঞ্চের শক্তি অন্য যেকোনো দেশের মূল দলের চেয়ে শক্তিশালী, সেই দেশকে রুখবে কে? জিনেদিন জিদানের যুগ থেকে শুরু করে আজকের কিলিয়ান এমবাপ্পের প্রজন্ম—ফ্রান্স প্রমাণ করেছে, তাদের ফুটবলের পাইপলাইন কখনো শুকিয়ে যাওয়ার নয়। দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা এই নিখুঁত কাঠামোর কারণেই আজ বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে ফ্রান্সের এই একচ্ছত্র আধিপত্য।

ফ্রান্সের এই অফুরন্ত ট্যালেন্ট পুল কি তাদের ২০২৬ বিশ্বকাপেও ট্রফি এনে দিতে পারবে? নাকি অন্য কোনো দেশ থামিয়ে দেবে ফরাসিদের এই জয়রথ? এটি জানতে অপেক্ষা আরও কিছুদিনের।