ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি তাঁর ছোট ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন। কয়েক মাস পর অবশ্য সেই অনুষ্ঠান। এর আগেই একটি প্রি–ওয়েডিং অনুষ্ঠান করা হয়েছে সম্প্রতি। তাতে খরচের বাহার এবং বিভিন্ন অঙ্গনের সেলিব্রেটিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে এবং এ–সংক্রান্ত সংবাদ ও ভিডিও পড়তে পড়তে ও দেখতে দেখতে আমরা সবাই কিছুটা ক্লান্তই বটে। কতকাল আর পাশের বাড়ির ধুমধাড়াক্কা দেখে সময় কাটানো যায়! একসময় তো নিজেরও নাচতে ইচ্ছে হতে পারি, নাকি?
এই একটি বিষয় মনে হলেই বুক চিন চিন করে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। আম্বানির ছেলের প্রি–ওয়েডিংয়ে আমাদের দেশের পক্ষ থেকে কেউই অংশ নেয়নি। অথচ শাহরুখ–সালমান থেকে শুরু করে জাকারবার্গ বা বিল গেটস—কে ছিলেন না ওই অনুষ্ঠানে! তবে কি প্রি–ওয়েডিং অনুষ্ঠানের মতো বিয়েতেও আমরা কেউ ডাক পাব না? আসলেই কি আমাদের সেলিব্রেটির অভাব?
আগেই বলে দিচ্ছি, এটা আম্বানিদের ভুল। এই বঙ্গ মুলুকে সেলিব্রেটি ও প্রভাবশালী তারকা ব্যক্তিত্বের অভাব নেই কোনোভাবেই। অন্তত কারও বিয়েতে গিয়ে একটু ঢংঢাং বা নাচাগানা করার মতো অনেক তারকা ব্যক্তিত্বই আমাদের দেশে আছে। সমস্যা হলো, আম্বানিরা ওঁদের চিনতে পারেনি!
আসুন তবে, এবার জেনে নেওয়া যাক কাদের কাদের আম্বানিদের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়াই উচিত। মনে রাখবেন, এঁরা না গেলে আম্বানিদের বিয়ের অনুষ্ঠান রং হারাবে অনেকটাই। এমনকি তা পুরোপুরি সাদাকালোও হয়ে যেতে পারে!
এই যেমন ধরুন, আমাদের এমন উপস্থাপক তো আছেনই, যিনি উপস্থাপনার মঞ্চে উল্টোপাল্টা কাজ করে ফেসবুক–ইউটিউবের ভিউ বাড়িয়ে দিতে পারেন অনায়াসে। কখনো আজাইরা প্রশ্ন করা, কখনো আপত্তিকর শরীরী ভাষা প্রকাশ করা, আবার কখনো সাক্ষাৎকার দিতে আসা প্রাপ্তবয়স্ককে অযাচিত স্পর্শ করে এরপর আবার গলা উঁচু করে কথা বলা—এমন ঘটনা উনি হরহামেশাই ঘটিয়ে থাকেন। নিশ্চিত করতে পারি যে, উনি অস্কারের মঞ্চে উপস্থাপনা করলে ২০২২ সালের মতো চড়–কাণ্ড ঘটানো স্রেফ ওয়ান–টু’র ব্যাপার। তার চেয়েও উপরে গিয়ে প্রয়োজনে গণধোলাই খাওয়ার পরিস্থিতিও তিনি অবলীলায় তৈরি করতে পারবেন—এই বিশ্বাস আমাদের আছে। আর বিতর্ক মানেই কিন্তু কনটেন্ট হিট খাবে ফেসবুক–ইউটিউবে। সুতরাং আম্বানি পরিবার যদি ফেসবুক–ইউটিউবে কিছু (!) করতেই চায়, তবে আমাদের উপস্থাপনা জগতের ওই নয়নমণিকে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায়ন্তর নেই!
এবার ভাবুন নাচের প্রসঙ্গে। অনন্ত আম্বানির প্রি–ওয়েডিংয়ে সালমান, শাহরুখ ও আমির খানের গলা জড়াজড়ি করে গা দোলানোর ছবি ও ভিডিও এরই মধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে। এর জন্য ওনারা নাকি ৪ থেকে ৫ কোটি রুপি করেও পেয়েছেন। বুঝুন একবার, অর্থের কি নিদারুণ অপচয়! শুধু পা–কোমর দোলানোর জন্য এত খরচের মানে হয়! অথচ আমাদের দেশে এমন নায়কও আছেন, যিনি কোনো ফুট স্টেপস না করেই কেবল জায়গায় দাঁড়িয়েই শরীরের সকল অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ কাঁপাতে পারেন। একই ভঙ্গিমা বারে বারে রিপ্লে করেই তিনি ১৫ থেকে ৩০ মিনিট কাটিয়ে দিতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা পাশের দেশের খান’দের মতো কোটি কোটি রুপি নিয়ে কাজে ফাঁকি তিনি দেন না। বরং নাচের সাথে দেন ডিগবাজি ফ্রি!
দেখুন, আমরা সয়াবিন তেলের সঙ্গে কোলেস্টরল ফ্রি পেয়ে অভ্যস্ত জাতি। ফ্রি আমরা যেমন নিই, তেমন দিই। ঠিক এই নীতিতেই আম্বানিদের বিয়েতে আমাদের ওই নায়ক গেলে নাচের সঙ্গে সঙ্গে ডিগবাজিও ফ্রি’তে দিয়ে আসতে পারবেন। তা আম্বানিদের কি ফ্রি’তে কিছু পেতেও ইচ্ছে করে না?
চলুন, এবার গানের প্রসঙ্গে যাই। আম্বানিরা ইংরেজি গানের জন্য রিহান্নাকে নিয়ে এসেছিল। হিন্দিসহ অন্যান্য ভাষার গানের জন্যও নিশ্চয়ই কাউকে না কাউকে এনেছিল। কিন্তু, একবার ভাবুন তো! দর্শকসারিতে থাকা সবাই নানা ভাষার গান গাওয়ার জন্য একজন গায়ককে একের পর এক অনুরোধ করে যাচ্ছেন, আর সেই গায়ক বিনা বাক্যব্যয়ে কখনো বাংলা, কখনো হিন্দি, কখনো ইংরেজি, কখনো সোয়াহিলি, কখনো মিশরীয় গোপন ভাষা অথবা কখনো এলিয়েনদের অর্থ না বোঝা বা নাম না জানা ভাষায় (আদৌ ভাষা কিনা কে জানে!) তিনি গান গেয়েই যাচ্ছেন, গেয়েই যাচ্ছেন! মানে ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো ইনস্ট্যান্ট ডেলিভারি হবে গানের। সুর, লয় বা তালে না মিললেও আমাদের সেই ‘হিরো’র পারফরম্যান্সে আম্বানিরা যে দাঁতকপাটি খাবেনই, তা নিশ্চিত! এরপরও যদি এমন গায়ক বা ক্ষেত্রবিশেষে নায়ক আম্বানিদের বিয়েতে ডাক না পান, তবে তা যে দুঃখজনক—সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।
দেখুন, উপস্থাপনা, নাচ, গান—সব ক্ষেত্রেই কিন্তু বিকল্প উপায় দেখানো হয়ে গেছে। এর বাইরে আপনি বলতেই পারেন যে, ‘হাজার কোটি রুপির বেশি খরচ করে আম্বানিরা তো নানা ধান্দাও (ব্যবসায়িক আর কি!) করেছে। ওসব কি আর আমাদের দিয়ে হবে?’
এবার শুনুন। দয়া করে মন ছোট করবেন না। আমাদের ঘাটতি নেই কোনো কিছুতেই। উপস্থাপনা, নাচ বা গানের ব্যাপারে তো জানলেনই। এর বাইরে খেলার মাঠ থেকে বের হয়ে বা দুই ইনিংসের বিরতিতে ছুটি নিয়ে গিয়েও শো–রুম উদ্বোধন করার মতো সামর্থ্য আমাদের তারকাদের আছে। স্রেফ আমাদের অহমিকা নেই বলে মাইক বাজাই না! আমরা বিশ্বাস করি যে, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়। অর্থাৎ, আমাদের সামর্থ্য নিয়ে বলাবলির কাজটা সাধারণ মানুষই করবে। সুনাম তো এভাবেই ছড়ায়!
আর টাকা–পয়সার কথা তুললেন তো? ওসব আমাদের হাতের ময়লা। ওসব ক্ষেত্রেও আমাদের এমন সব তারকা ব্যক্তি আছেন, যারা আম্বানিদের বিয়েতে গিয়েই জামনগরেই কুমিরের খামার খুলে বসতে পারবেন অবলীলায়। সেই কুমির পাড়বে খালি সোনার ডিম! খুব বেশি অনুরোধ করলে হয়তো রূপাতে নামতে পারে। কিন্তু অরিজিনাল ডিম কখনোই পাড়বে না! বলুন তবে, লাভটা কার হবে?
যাক, অনেক কথা বলা হলো। এরপরও যদি আমরা আম্বানিদের বিয়েতে ডাক না পাই, তবে আসলে দিনশেষে আমাদের কোনো ক্ষতি নেই। মানীর মান পাহাড় সমান। কী আর হবে, আম্বানিরাই ঠকবে!