শান্তি কোথায় বা কীসে, তা নিয়েই আজ অনুসন্ধান হবে। এর জন্য প্রয়োজন সুচারু বিশ্লেষণ। এর আগে বিচার শব্দটিও বসাতে পারেন। বিচার না করলে আর বিশ্লেষণ কীভাবে করবেন? আসুন, প্রস্তুত হওয়া যাক। শাহরুখ খানের কথার মতো সিটবেল্ট বেঁধে নিতে পারেন, আবার প্যান্টের বেল্টও টাইট করে নিতে পারেন। যেটা সুবিধা হয় আর কি! এতটুকু স্বাধীনতা তো আপনারা চাইতেই পারেন। পেতেও পারেন।
যাই হোক। যেখানে খুশি বেল্ট বাঁধুন, টাইট করুন। এখন এসব হাবিজাবি কথা বাদ দিয়ে চলুন প্রকৃত প্রসঙ্গে অবগাহণ করা যাক। আমার বা আপনাদের সময়ের তো কিছুটা হলেও দাম আছে, নাকি?
শিরোনামের বক্তব্যটি আমরা ভাগে ভাগে বিচার–বিশ্লেষণ করে দেখব। প্রথমেই ঢোকা যাক ‘কাজ করে দেখেছি’র মধ্যে। জীবনে কাজ তো কিছু করতেই হয়। কাজ না করলে যাদের পেট ভরে না, তাদের কাজ না করে উপায় নেই। সূতরাং কাজ করা তাদের কাছে অন্তত শান্তি লাভের মতো কিছু নয়। কারণ যে জিনিস কেউ বাধ্য হয়ে করে, তাতে কি আর শান্তি মেলে! শান্তি না থাকলে সুখও থাকে না। তখন স্বাভাবিভাবেই আরামও নেই, মজাও নেই।
আবার কারও কারও কাজ না করলে মন ভরে না। তারা আসলে মাদকের মতোই কাজের প্রতি আসক্ত। এসব মানুষের জীবন মানেই কাজ। এরা ঘুমকেও কাজ হিসেবেই দেখে। কিন্তু এত কাজ যারা করে, তাদের জীবনে তো শান্তি সিঁধ কেটেও ঢুকতে পারবে না। ফলে শান্তি এসব মানুষের জীবনে ওই অর্থে থাকে না। কেউ কেউ অবশ্য ঢং করে কিছুটা বলে থাকেন—‘কাজই আমার জীবন, কাজেই আমার শান্তি’! আসলে ওসব বোগাস আলাপ। খেয়েদেয়ে ওনাদের কোনো কাজ নাই, তাই কাজ করে আর কি!
অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্তে উপনীত আমরা হতেই পারি যে—‘কাজ করে দেখেছি, কাজে শান্তি নেই’! (প্রমাণিত)
এবার চলুন, ‘কাজ না করেও দেখেছি’ নিয়ে একটু জ্ঞানচর্চা করা যাক। কাজ না করে অনেকেই থাকেন। বছর চল্লিশের এক বাড়িওয়ালার কথা বলি। ওনার বাসায় বেশ কয়েক বছর ভাড়াটে হিসেবে থাকার সুযোগ হয়েছিল। ওই কয়েক বছরে কোনোদিন ওনাকে কাজে যেতে দেখিনি। বেশির ভাগ সময়ই উনি বাসাতেই থাকতেন। পরে জানলাম, ওনার ভাড়াটে অনেক। ভাড়ার টাকাতেই দিন চলে যায়। তাই তিনি সামর্থ্য থাকতেও কাজ করেন না। কাজ না করেই দিব্যি চলে তার জীবন।
এমন রাজকপাল অবশ্য সবার ভাগ্যে জোটে না। তারপরও অনেকে কাজ না করেই জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন। এমন মানুষ আপনি অফিসেও পাবেন সহকর্মী হিসেবে। আবার পরিবারেও পাবেন। পরিবারের ভেতরে দেখবেন, কোন কোন সদস্য একেবারে পায়ের ওপর পা তুলে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। ওর জন্য দেখা যাবে, আরেকজন খেটে মরছে। তাদের আরাম ও আলস্য দেখলে আপনার মনে হতেই পারে যে, আরব্য রজনী আলাদিনের দৈত্যের দেওয়া ইচ্ছাপূরণের বর পাওয়া ছাড়া আর কেউ এতটা আয়েশে জীবন কাটাতে পারবে না! অফিসের এমন সহকর্মীকে দিনের পর দিন দেখলেও এমনটা মনে হতে পারে অবশ্য। এমন মানুষ দেখলে ঈর্ষা জাগতেই পারে এই ভেবে যে—এদের জীবনে হয়তো শুধু সুখ আর শান্তি!
আদতে বিষয়টা পুরোপুরি তেমন নয়। কাজ একেবারে না করতে করতেও কিন্তু একসময় আপনি একঘেয়েমিতে ভুগতে পারেন। তখন হয়তো মনে হতে পারে—কাজ না করে আর কয়দিন থাকা যায়? তার ওপর আবার কথায় আছে—‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। অর্থাৎ, কাজ না করতে করতে আপনি শয়তান হয়ে যেতেই পারেন। মনে রাখবেন, এটি কিন্তু প্রেমিক–প্রেমিকাদের মজা করে ‘অ্যাই শয়তান’–এর শয়তান নয়। আক্ষরিক অর্থেই শয়তান!
এছাড়া কাজ না করার অনেক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি আছে। দেখা গেল, আপনার ওজন বেড়ে গেল, এর কারণে আবার হাঁটু–কোমরে ব্যথা হলো। হতেই তো পারে। এসবে ভোগা শুরু হলে কিন্তু আর শান্তি থাকবে না। সূতরাং একটু ভাবলেই দেখবেন—‘কাজ না করে দেখেছি, ওতেও শান্তি নেই’—এই বক্তব্যটি অনেকাংশেই সত্য। অর্থাৎ, এই বক্তব্যটির ডানপাশে আগের সম্পাদ্য–উপপাদ্যের মতো ‘প্রমাণিত’ শব্দটি চাইলে লিখতেই পারেন।
এবার শান্তির খোঁজ করা যাক। সবই তো দেখা হলো। কাজ করেও দেখা হলো, না করেও বোঝা হলো। আসলে শান্তি কোথায়? বিশ্বাস করুন, শান্তি আসলে কাজ করার ভানে! মানে আপনি আক্ষরিক অর্থে কাজ সেভাবে করলেন না, কিন্তু শরীরী ভাষায় কাজ করার ভাবভঙ্গি তুলে ধরলেন। কী অসাধারণ, তাই না? এমন মানুষ আপনি আশপাশেই প্রচুর পাবেন। অফিসে পাবেন, ব্যবসায় পাবেন, নিজের ঘরেও পাবেন। এরা কাজ সেভাবে করবে না। কিন্তু এদের ব্যস্ততা খালি চোখে দেখার পর আপনার সাদা মন বিষম খেয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে উঠবে—‘এমন কর্মবীরও হওয়া যায়!’
এমনটায় কিন্তু বেজায় শান্তি। কাজ করার মতো শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রম এতে পাওয়া যায় না। আবার দেখনদারিও হলো। কাজ করার মানসিক প্রশান্তিটা থাকল। কেউ আপনাকে তখন কর্মহীন বলতে পারবে না, অলসও বলতে পারবে না। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই বরং। এই উদাহরণের পর আপনারা আমার সঙ্গে দ্বিমত করতেই পারবেন না। আপনারা ফেসবুক বা ইউটিউবে একটা ছোট ভিডিও নিশ্চয়ই বিভিন্ন সময়ে দেখেছেন। ভিডিওটা অনেকটা এরকম—গাড়ি থেকে বস্তা নামানো হচ্ছে, আবার তোলা হচ্ছে। কিছু মানুষ টেনে নিয়ে যাচ্ছেন সেসব বস্তা বা মালামাল। আর একজন ব্যক্তি এসব মালবাহী মানুষের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে কেবল একবার এদিক যাচ্ছে, আরেকবার ওদিক যাচ্ছে। বস্তায় হাত দেওয়ার ভান করলেও দিচ্ছে না। বস্তা ঘাড়েও নিচ্ছে না। অন্যদের ঘাড়ে ঠিক তুলেও দিচ্ছে না, বস্তায় হাতের স্পর্শ দিচ্ছে শুধু। তবে সেও অন্যদের মতো ঘাম মুছছে ঠিকই। মুখের ভাবও কাজ করে উল্টে দেওয়ার মতো!
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। ঠিক এমনটাই হতে হবে। একবার এমনটা করেই দেখুন না। দেখবেন, মনে শুধু শান্তি আর শান্তি!
অতএব, ‘কাজ করে দেখেছি, কাজ না করেও দেখেছি, শান্তি শুধু কাজ করার ভানে!’ (প্রমাণিত)



