রম্য রচনা

ইশ্, পাগলে খাইসে বিষ!

কথায় আছে – ‘ছাগলে কিনা বলে, পাগলে কিনা খায়!’

এই রে, ভুল হয়ে গেল। সরি, সরি। কথাটা হবে বোধহয়, ‘পাগলে কিনা বলে, ছাগলে কিনা খায়!’ গুগল মামা চেক করে জানিয়েছে, আমার আগের কথাটা ভুল ছিল। এখনেরটা মোটামুটি ঠিক যে আছে, তা শতভাগ না হলেও দ্বিশতভাগ নিশ্চিত। এতদিন ধরে মানুষ দু পেয়ে স্বজাতীয় পাগল এবং চার পেয়ে ছাগল সম্পর্কে নিশ্চয়ই ভুল একটা বিবৃতি দিয়ে আসতে পারে না। তবে দিনকাল যা পড়েছে, ছাগল ও পাগল – দুই-ই এর বিরোধিতা করতে পারে চাইলে।

সমস্যা হলো, ছাগলের কথার পাঠোদ্ধার আমরা করতে পারি না। আর পাগলকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাগল বলা হয় দেখেই হয়তো তার কথা বুঝতে পারলেও, সেসবকে পাত্তা দিতে রাজি থাকি না। অর্থাৎ, নিজেদের সুস্থ-সবল দাবি করা মানুষদের বক্তব্য হচ্ছে, পাগল মানুষ বলেই যা-তা খেতে পারে না। বরং যা-তা বলতে পারে। আর ছাগল মোটা ও বেশি ওজনের মস্তিষ্কের মানুষগোত্রীয় নয় বলেই, যা-তা খেতে পারে। তবে মানুষের হিসাবে যা-তা খেলেও, ছাগল ঘুষ খায় না। খাওয়ার সুযোগই পায় না। ছাগলকে টুপি পরিয়ে এই যা-তা খাদ্যটি যে মানুষ নিজের পেটের জন্যই রেখে দিয়েছে!

প্রতিবেদনের ছবি।

ঘুষের চলন এ দেশে বা এ পৃথিবীতে কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা করা কঠিন শ্রমের বিষয়। প্রচলিত আছে যে, এই ঘুষ খাওয়া একটি আদিম খাদ্য। অনেক আগে থেকেই মানুষ খায় এবং খেয়েই চলেছে। আর এই ঘুষের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে অনিয়ম। অর্থাৎ, ঘুষ দেওয়াই হয় অনিয়ম করার জন্য বা ঢাকার জন্য। অনিয়ম সম্পন্ন হওয়ার আগেই তা প্রকাশ্যে চলে এলে অবশ্য ঝামেলা। 

যেমনটা হয়েছে ঝালকাঠিতে। সেখানকার নলছিটি উপজেলার সরমহল গ্রামের সিংহবাড়ির এলাকায় সেতুর কাজ শেষ হয়েছে, কাজ হয়েছে সংযোগ সড়কেরও। এর মাধ্যমে কুশঙ্গল ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম সংযুক্ত হবে। ছিল শুধু উদ্বোধনের অপেক্ষা। ঠিক তখনই ধসে পড়েছে সেতুর সংযোগ (অ্যাপ্রোচ) সড়ক। স্থানীয়দের বক্তব্য, কাজের শুরু থেকেই সংযোগ সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ করে আসছিলেন তারা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অভিযোগ অস্বীকার করে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ী করেছে।

এটি অবশ্য দাবি করাই যাবে না যে, এখানে ঘুষের লেনদেন হয়েছে। তবে কিছু অনিয়ম যে হয়েছে, তা একেবারে নিশ্চিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেঙে পড়বে না বা ধসে যাবে না, তেমনটা ভেবেই মানুষ মাটির রাস্তা বা বাঁশের সাঁকো বাদ দিয়ে পাকা সেতু ও রাস্তা বানায়। সেখানে একটুখানি ঝড়-বৃষ্টি হলে তা যদি উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়ে, তাহলে বলতেই হয় ‘রাস্তামে বহুৎ কুছ কালা হ্যায়’!

কোনো কোনো বিশেষ-অজ্ঞ অবশ্য বলছেন, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট রাস্তাকে কাঠগড়ায় তোলা প্রয়োজন। একমাত্র সেটিই সত্য তথ্য দিতে পারবে। বলতে পারবে, তার বডিতে বেশি কালো মিশিয়েছে, নাকি সাদা! এসব বিশেষ-অজ্ঞদের কথায় পাত্তা দেওয়ার কিছু নেই যদিও। কথায় তো আছেই, পাগলে কি না বলে…।  

অবশ্য প্রকল্প বাস্তবায়নকারী এলজিইডি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে কঠোর অবস্থান। বলে দিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী কাজ না করলে, রাস্তা হলেও বিল পাবে না, বিল পাবে না, বিল পাবে না। সুতরাং নো চিন্তা!

চিন্তার আগমনেই মনে পড়ে গেল, ডিম আর মুরগির কথা। এদের কারণে এই ঘর্মাক্ত শরীরেও কাঁপুনি ওঠে। এদের বাজারদর তো একেবারে বিখ্যাত নিলামকারী সংস্থা সথেবি’র হাতুড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়। দাম এই বাড়ছে, তো এই কমছে। কখনো মুরগি দাম বাড়ায়, আবার কখনও ডিম। চলতি সপ্তাহে গত কয়েক দিন ধরেই ডিমের দাম বেড়েই চলেছে। ৬ মাসের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে বেড়েছে ৫০ টাকা। চলতি সপ্তাহে খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়। সে হিসেবে একটি ডিমের দাম পড়ছে ১৪ টাকারও বেশি। ক্রেতাদের অভিযোগ, কারসাজি করে বাড়ানো হচ্ছে ডিমের দাম। কারসাজি মানেই আবার অনিয়মের কথা মনে করিয়ে দেয়। ওদিকে দাম নিয়ন্ত্রণে মুখোমুখি অবস্থানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। একজন আরেক জনের ওপর দায় দিয়েই দায়িত্ব নাকি সারা হচ্ছে।

প্রতিবেদনের ছবি।

আর এই সুযোগে ডিম কিন্তু মুরগিকে পেছনে ফেলে রেসে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। এ নিয়ে ডিম ও মুরগি সম্প্রদায়ের সঙ্গে আগে থেকেই কিছু গোপন সূত্র তৈরি করা ছিল এই অধমের। মুরগি সম্প্রদায়ের সঙ্গে অলিখিত ও অশ্রাব্য এক আলোচনায় জানা গেল, ডিমের এভাবে বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় তারা যারপরনাই ক্ষুব্ধ। তাদের বক্তব্য, এভাবে অভিভাবককে কলা দেখিয়ে সন্তানেরা যা খুশি তাই করতে পারে না। অবশ্য ডিম সম্প্রদায় তাদের খোলসের ভেতর থেকে একাধিক শব্দোত্তর তরঙ্গে পাঠানো পাল্টা বার্তায় জানিয়েছে – ‘এখন যৌবন যার, দাম বাড়ানোর তার শ্রেষ্ঠ সময়!’ ডিম পাড়া বুড়োদের আর মার্কেট নিচ্ছে না, তাই সুযোগের কেবল সদ্ব্যবহার করেছে তারা। একই সঙ্গে মুক্ত বাজার অর্থনীতির সঙ্গে মুরগিদের মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে তারা। 

এদিকে যেসব মানুষ ডিমের বাজার সামলাচ্ছে, সেই বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে ডিমের সরবরাহই নাকি কম। এই তথ্য জানতে পেরে ডিম সম্প্রদায় এক অনানুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের বাজার নষ্ট করার জন্য মুরগি সম্প্রদায় হীন স্বার্থে সুপরিকল্পিতভাবে ডিম পাড়া কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। নিজেদের দাম বাড়ানোর জন্যই নাকি মুরগিরা এমন করছে বলে ধারণা তাদের। এ ব্যাপারে মনুষ্য সম্প্রদায়ের হাত আছে কিনা, জানতে চাইলে ডিম সম্প্রদায় বলেছে, ওদের হাত সবখানেই আছে। এরাই যত নষ্টের মূল। তবে এতে দিনশেষে মানুষেরই লস হবে। ডিম খাওয়া যেমন কঠিন হয়ে উঠবে, কাউকে ডিম দেওয়াটাও হয়ে উঠবে ব্যয়সাপেক্ষ।

যাক, এত কথা শুনে আপনাদের কি মনে হচ্ছে? নিশ্চয়ই আমাকে পাগল ভাবছেন। তা ভাবতেই পারেন। যুক্তিতে যখন মুক্তি মেলে না, তখন পাগল হওয়া ছাড়া আর উপায়ই কি বলুন। আর এহেন পাগলের লেখা পড়ে এতক্ষণ সময় নষ্ট হওয়ায় কোনো এক বিখ্যাত টিভি নাটকের বিখ্যাত অভিনয়শিল্পীর জবানে স্বগতোক্তির মতো করে অব্যক্ত ক্ষোভে আপনি বলতেই পারেন, ‘ইশ্, পাগলে খাইসে বিষ!’

সত্যি বলছি, রাগ করার সময় আমার নেই। পাগল খালি হাসে, কাঁদে না। 

আরও পড়ুন: