আর ক’দিন পরই ঈদুল আযহা। শুরু হয়ে গেছে পশুর হাট নিয়ে আলোচনাও। অনেকেই এবার গরু‑ছাগলের খবর নিচ্ছেন। কেউ নায়কের নামে গরু আনছেন, আবার কেউ হাটে গরু ঢোকাচ্ছেন ‘সুলতান’ হিসেবে। সব মিলিয়ে হইহই কাণ্ড, রইরই ব্যাপার। এর মধ্যে আবার চমক হিসেবে কেউ কেউ আনছেন কোটি টাকার বেশি দামের গরু‑ছাগল। আর সেসবের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়েই চলে আসে দাম বেশি হওয়ার কারণ বর্ণনা। সেই প্রসঙ্গেই এবার পশুর হাটের জ্বালাময়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে উঠে এসেছে বংশমর্যাদার বিষয়টি।
গরু‑ছাগলের দাম বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে কোনো কোনো বিক্রেতা দাবি করেছেন, তাঁদের গরু‑ছাগল নাকি উচ্চ বংশের! এমনকি গুগলে সার্চ দিলেও নাকি তাদের বংশের পরিচয় বের হয়ে আসবে। মানে, একেবারে তুঘলকি ব্যাপার! উইকিপিডিয়ায় যেমন আগের দিনের রাজা‑বাদশাহদের বংশলতিকা থাকে, তেমন নাকি এদেরও আছে। আর তা দেখেই ক্রেতারা বুঝে যাবেন গরুর অভিজাত ব্লাডলাইন!
কিন্তু এভাবে বংশমর্যাদা বুঝে, জেনে গরু‑ছাগল কেনার বিষয়টি এ দেশের মানুষের জন্য নতুন অবশ্যই। ফলে কিছু গাইডলাইন তো লাগেই। ‘সরস’–এর পক্ষ থেকে তাই যোগাযোগ করা হচ্ছিল গরু‑ছাগলের বংশমর্যাদা সম্পর্কে অভিজ্ঞ একজনের সাথে। টেলিপ্যাথিতে যোগাযোগের পর তিনি ‘হ্যালো’র বদলে ‘হাম্বা’ দিয়ে আলাপ শুরু করেন। ধীরে ধীরে নানা কথার পর তাঁর সাক্ষাৎকার চাওয়ার চাহিদাপত্র পেশ করা হয়। তিনি তা দিতে রাজি হলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছার কথা জানান। একই সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারকে ‘কাল্পনিক’ ও ‘অর্থহীন’ হিসেবে অভিহিত করতে হবে বলে শর্ত দেন। সেসব মেনেই তাঁর সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়।
গরু‑ছাগলের বংশমর্যাদা সম্পর্কে চেনা‑জানার বিষয়ে ওই ‘গো‑ছা’ বিশেষজ্ঞ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। সেগুলোই এবার সবিস্তারে পাঠকদের সামনে বর্ণনা করা হলো:
প্রথমত, গরু দশাসই বা বিশাল আকারের কিনা দেখতে হবে। যদি দেখেন গরু মিনি হাতি সাইজের, তবে শুরুতেই ভেবে নেবেন যে, সেটির বংশমর্যাদার উর্বর ইতিহাস আছে। উচ্চ বংশের গরু‑ছাগল যে রোগাপটকা হবে না, তা নয়। তবে দেশের হিসাবে এসব ভাবনা ভিন্ন হয়। বাংলাদেশে যেহেতু বড় বড় জিনিসের কদর বেশি, তাই এখানে বংশমর্যাদা জানার আগে সাইজ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। আগে দেখনদারি, পরে গুণবিচারী। ওটাই ৫০ শতাংশ, বাকিটা করে নেওয়া যাবে।
দ্বিতীয়ত, গরু‑ছাগলের দাঁড়ানোর স্টাইল লক্ষ্য করতে হবে। গরু‑ছাগল চার পায়ের ওপরই দাঁড়াবে, তবে তাতে স্টাইল ফুটে বের হচ্ছে কিনা, সেটি অনুভব করতে হবে। প্রয়োজনে ওই সময়টায় নিজে গরু‑ছাগলের মনোজগতে প্রবেশ করতে হবে। কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে গরু‑ছাগলও ভাবতে পারেন। দেখবেন, ধীরে ধীরে বুঝতে পারবেন। শরীরে একটা ভাব আসবে। যদি বুঝতে পারেন যে, গরু বা ছাগলটির দাঁড়ানোটা অভিজাত, তাহলেই নিশ্চিত হয়ে যাবেন যে সেটির বংশ অতি উচ্চ।
তৃতীয়ত, গরু‑ছাগলের বডিতে কোনো সিল‑ছাপ্পড় আছে কিনা খেয়াল করুন। এগুলো নানা ভাষায় থাকতে পারে। মানুষের মতো গরুর জাতও কিন্তু এক দেশ থেকে আরেক দেশে গেছে। ফলে ইজিপ্টের গরুও এ দেশে চলে আসতে পারে। অথবা অস্ট্রেলিয়া‑নিউজিল্যান্ড থেকে তো আসতেই পারে। তাই অচেনা ভাষা দেখে বা অচেনা প্রতীক দেখে ভড়কে যাবেন না। বরং সেসব নিয়ে ইন্টারনেটে সার্চ দিন, গুগল মামাকে জিজ্ঞেস করুন। ওই মামা জানে না, এমন কিছু নাই। নিশ্চিত গরুর ঠিকুজি‑কুষ্ঠি বের করে দেবে। আর তাও দিতে না পারলে চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করুন। না পেলে ও বানিয়ে দেবে!
চতুর্থত, গরুর চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। গরুর দিকে তাকিয়ে থাকুন, চোখে চোখ রাখুন। যদি চোখ নামিয়ে নেয়, তাহলে বুঝবেন বংশ ভালো হলেও উচ্চ না। আর যদি দেখেন চোখে চোখ রেখে কিছুটা জোরে জোরে হাম্বা, হাম্বা বলে ডেকেই যাচ্ছে, তাহলে বুঝবেন জমিদার বংশ! একটা অভিজাত ‘ভাব’ তবে আছেই। প্রয়োজনে নিজেও হাম্বা হাম্বা বলে গরুর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করুন। যদি দেখেন আপনার বলা দুইবার হাম্বার বিপরীতে একবার আওয়াজ দিচ্ছে, তাহলে বুঝে যাবেন যে বংশ উঁচু। কারণ কথা বুঝেশুনে বলছে! এভাবে নিজেকে দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে তুলনামূলক বিচার করে গরু‑ছাগলের বংশমর্যাদা বুঝে ফেলতে পারবেন।
পঞ্চমত, গরুর বলা ‘হাম্বা’ শুনতে ‘হ্যাম্বা’র মতো লাগে কিনা খেয়াল করুন। তেমনটা হলে বুঝে নিতে হবে যে, গরু বিদেশি, ইংরেজি টানে ডাকছে। ছাগলও যদি ‘ভ্যা ভ্যা’ না করে ‘ভ্যাঁ ভ্যাঁ’ করে, তাহলে বুঝে নিতে হবে সেটির ফরাসি বা স্প্যানিশ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে। অর্থাৎ, বিদেশি ব্লাডলাইন আছে এবং তা ব্লু ব্লাডও হতে পারে। আর আমাদের দেশে বিদেশি যেকোনো কিছুই নিশ্চিত ভালো বলেই ধরে নেওয়া হয়। সুতরাং আপনি প্রাথমিকভাবে গরু‑ছাগলটির বংশের উচ্চতা সম্পর্কে আন্দাজ করে ফেলতে পারবেন। এরপর শুরু হবে সেটি মাপা। এ ক্ষেত্রে স্লাইড ক্যালিপার্স ব্যবহার করলে ভালো ফল পেতে পারেন!
পরিশেষে জানাতেই হয় যে, আমাদের ‘গো‑ছা’ বিশেষজ্ঞ এর বেশি টিপস দিতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, উপযুক্ত জনসমর্থন সাপেক্ষে তিনি পুনরায় টিপস দেওয়ার বিষয়ে ভাববেন। তবে একটি বাড়তি সতকর্তা তিনি শুনিয়েছেন। বলেছেন, গরু‑ছাগলের বংশমর্যাদা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি মনোদৈহিক। এতে অনেক সময়ই ক্রেতা বা বিক্রেতাকে গরু‑ছাগলের মনোজগতে প্রবেশের প্রয়োজন হয়। তাই গরু‑ছাগল বেচা‑কেনার পর যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুখ থেকে ‘হাম্বা হাম্বা’ বা ‘ভ্যা ভ্যা’ শোনা যায় কিছু সময়ের জন্য, তবে ঘাবড়ানো যাবে না। বরং ধীরে ধীরে মনুষ্য সমাজের সঙ্গে মেশার সময় দিতে হবে। সমর্থন দিতে হবে। তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে!
তাহলে আর দেরি কেন? চলুন, চিনে ফেলা যাক বংশমর্যাদাসম্পন্ন গরু‑ছাগল!



