ঝাউতলা রেললাইনের পাশে নার্গিসের জীবন যেভাবে কাটে

এ পৃথিবীতে এখন শুধু যুদ্ধ-যুদ্ধ রব, কোলাহল, বিষণ্নতা আর একাকিত্ব। এর মধ্যে বয়ে যায় আমাদের নিজস্ব যুদ্ধ, শূন্যতা, আমিত্ব। মন খারাপের বায়না হয়ত নিজেকেই মেটাতে হয়। আর খুঁজে ফিরতে হয়, ‘কীভাবে বেঁচে থাকা যায়?’ শীর্ষক প্রশ্নের উত্তর। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সুবাদে শহর থেকে শাটল ট্রেনে আসা যাওয়া করতে হয়। এই ট্রেন যাত্রার দুধারে থাকে অসংখ্য বস্তি। বস্তির মানুষদের প্রতিদিনকার জীবনযাপন পাখির চোখ দিয়ে দেখি শাটল ট্রেনের জানলা থেকে। শাটলের জানালার সিটে বসার সুযোগ কালে-ভদ্রে কয়েকবার হলেও মন পড়ে থাকে বস্তির পাশে মানুষগুলোর বিচিত্র চোখে। সে চোখে হতাশা, মায়া, শান্তি, চঞ্চলতা—সবই আছে। বড়দের সুযোগ হয় সচেতন থাকার, ছিটকে পড়ে শিশুরাও। হারিয়ে যায় যারা, তারা আর ফিরে আসে না, যারা আসে তাদের থেকে যায় হাজারও কষ্টের বোঝা।

অনেকদিন ধরে খুঁজে ফিরছিলাম সে গল্পকে, যে গল্পকে বন্দী করে রাখব, যা আমি দেখি।  সেদিন খুঁজে পেলাম বেঁচে থাকা মায়ের এক গল্প।  সেই গল্পের সঙ্গী ‘নার্গিস’।

আর্তুর র্যাঁবো তার দোযখে এক মরশুম–এ জানিয়েছিলেন নিগারের পরিচয়। যাদের তথাকথিত সফলতা নেই, পুঁজিবাদ যাদের নাকচ করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে সে পুঁজিবাদের অন্যতম বাহকই হয়ে যান নিগারেরা।

আমার গল্পের সাথি নার্গিসের বাড়ি চট্টগ্রামের ঝাউতলা রেললাইনের পাশে একদম নিচু জায়গায়। বাইরে অনেক ঝোপঝাড়, কোলাহল। পর্দা সরিয়ে ঢুকলাম কামরায়। সেখানে সাজানো আছে খাট, হুইল চেয়ার, ছোট ট্রাংক, একটা ছোট টেলিভিশন ও কিছু হাঁড়ি-পাতিল। ঘরের রুম ঘেঁষে আছে পর্দাবিহীন স্নানঘর, আর সেখানকার ছোট ছোট খুপড়িতে সাদা পায়রা।

প্রথম দিনে ভীষণ মেজাজে গোটা-গোটা চোখে নার্গিস, তাঁর বোন, বোনের মেয়ে ও নার্গিসের চার মাসের সন্তানের উদ্বেগ চোখে পড়ে।
নার্গিস ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রামের ষোলশহরের বস্তিতে থাকতেন। সে সময় তিনি মাঝে–মধ্যে ভিক্ষা করতেন। একদিন খেলতে খেলতে একা ট্রেনের কাছাকাছি চলে যান। কিন্তু অপর পাশ থেকে আসা ট্রেনের শব্দ তাঁর কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। এতে তাঁর ডান হাত, বাম পা পিষে যায় সেখানেই। এরপর অনেক সময় পেরিয়েছে। কোনোমতে ভিক্ষা করে কিছু অর্থ জমান। কিন্তু যে স্বামীর হাত ধরে সংসার করার কথা, সে স্বামী নার্গিসের সব জমানো অর্থ বাড়িতে পাচার করে দিতেন।

চট্টগ্রামের ঝাউতলা রেললাইনের পাশে নার্গিসের জরাজীর্ণ ঘর। ছবি: লেখকনার্গিসের বয়স এখন পঁচিশ পেরিয়েছে। এই বয়সে একটাই সম্বল, চার মাসের সন্তান। অনেক কষ্টে নার্গিস সন্তানকে মানুষ করছেন। সেটা আমাদের মতন করে নয়। নিজের মত করেই, অসংখ্য ঝুঁকি নিয়ে। প্রতিদিন সকালে তাঁর বোন ও বোনের সন্তানেরা এসে কুলকুচা করানো, খাবার খাওয়ানোর কাজটা করেন। এরপর সন্তানকে একটু পরিষ্কার করিয়ে দুপুরে খাবার-গোসলের পর্ব শেষ করে দেন। তবে সারাদিন নার্গিসের সন্তান কেঁদে যায়। কখনো দুধের অভাবে, কখনো মায়ের কোলের অভাবে, কখনো গরমে।

নার্গিসের ঘরে একটাই বাতি। সকাল থেকে রাত অবধি সে বাতি তিনি জ্বালিয়ে রাখেন। যখন ছবি তুলতে বাতিটা একটু বন্ধ করি, তখন নার্গিস খুব রেগে গেলেন। কারণ অন্ধকার নার্গিসের পছন্দ নয়। এই সাদা বাতি তাঁকে উজ্জীবিত রাখে, সাহস দেয়, অন্ধকারের ভয় কাটায়।

নার্গিসকে দেখতে অনেকেই আসেন। সেই তালিকায় বেসরকারি থেকে শুরু করে সরকারি লোক—সবাই থাকেন। কেউ একটা কাগুজে ফর্ম নিয়ে আসে। এতে প্রতিবন্ধী কোটায় যৎসামান্য সহায়তা পান নার্গিস। নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে নার্গিস বলেন, ‘এর আগে অনেক মানুষ আসছে আপা, আমার কোনো উন্নতি হয় নাই। আপনি আসলে এসব দিয়া কী করবেন? আমারে কী দিবেন? আমার ওষুধের খরচটা অন্তত দিয়েন।’ 

নার্গিসের কথা একদম সোজাসাপটা, সে কারণে কিছুটা রুক্ষও বোধ হয়। আসলেই বাস্তবতায় আমরা নার্গিসকে কেবল পুঁজি করেছি, নার্গিসের কোনো উন্নতিতে আমাদের হাত নেই। হ্যাঁ, নার্গিসের প্রিয় একজন ডাক্তার সাহেব আছেন। যিনি ঘুরে ঘুরে বস্তিতে চিকিৎসা দেন। প্রায়ই বস্তিতে আসেন নার্গিসকে দেখতে। ওষুধ, আর ছোট বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস তিনি দিয়ে যান। কেবল এই ডাক্তারকে দেখলেই নার্গিস প্রাণভরে হেসে ওঠেন।

নার্গিসের পানের বাটা। ছবি: লেখকনার্গিস জানেন না, তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ কী! কীভাবে মানুষ করবেন, তাও জানেন না।  নার্গিস পান খান। সেই পানের বাটাও তাঁর মতো খানিকটা রুক্ষ, কর্কশ। বহুকাল ধরে এক আঙিনায় পড়ে থেকে তাতে পড়ে গেছে কালসিটে, পরিমাণে তা সামান্যও নয় মোটেই।
নার্গিসকে মহৎ, সংগ্রামী, স্বচ্ছ, সরল, বাস্তবিক—কোনো বিশেষণেই বিশেষায়িত করা যায় না। তিনি কেবল একটি সত্যের নাম। বেঁচে ফেরার নাম। আমাদের কাছে সফলতার যে গল্পগুলো হরহামেশা আসে, সেই তালিকায় নার্গিসরা থাকেন না। সংগ্রামের যে চিত্র, তাতেও নার্গিস নিজেকে বেশি প্রকাশ করেন না। তাঁর কাছে রেললাইনের মতো এ জীবন সমান্তরালভাবে কেবল চলছে। নিজের সন্তানকে মানুষ করার তলোয়ারও তাঁর মাথার ওপর হাড়িকাঠের মতো হুমকিরূপে নেই। ইচ্ছে করেই রাখেননি। কেবল উজ্জ্বল আলোতে ভাবনায় মগ্ন তিনি। এ ভাবনার কথা আমরা জানতে পারব না, জানতে চাইও না। নার্গিসের বেঁচে ফেরা জীবনটিকে যাপনের এ গল্প নতুন আলোতে পথ দেখায় কেবল।

লেখক: শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।