শ্রমিক হয়েও যাঁরা প্রান্তিক অবস্থানে আছেন

আপডেট : ০১ মে ২০২৪, ১০:০৪ এএম

‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।’ 
—সুভাষ মুখোপাধ্যায়

আজ মে মাসের প্রথম দিন। আজকের দিনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একটি দিবসের ইতিকথা। দিবসটি হলো ‘মে দিবস’। মে দিবসের ঘটনার সঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই কবিতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পৃথিবীব্যাপি ধনী গরীবের বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। ধনী আর দরিদ্রের বৈষম্য দূর করতে চাইলে প্রতিবাদ, সংগ্রাম করতে হবে। তা না হলে শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই কবিতায় সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন। 

পৃথিবীব্যাপি ধনী–গরীবের বৈষ্যমের অন্যতম ভুক্তভোগী শ্রমিক শ্রেণি। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিবস হলো ‘মে দিবস’। কর্মঘন্টাকে আট ঘণ্টা করার সঙ্গে সম্পৃক্ত মে দিবসের কাহিনি। ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। সেই সূত্র ধরে বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মে দিবস পালন করা হয়।

মে দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন। এখন চলছে ২০২৪ সাল। সেই ১৮৮৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল, মানে ১৩৮ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুর। কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। শ্রমিকেরা পাচ্ছে না তাদের শ্রমের ন্যায্য মজুরি। মাস শেষে তারা যে বেতনটুকু পান, তাতে পরিবার নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও পাচ্ছেন না।

অথচ এই শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতির মূল হাতিয়ার। শ্রমিক শ্রেণি দেশের রপ্তানিতে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ করেও মানবেতর জীবন পার করছে। শ্রমিকদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে পা মাড়িয়ে সুবিধা গ্রহণ করছে মালিক গোষ্ঠী। দেশে কোটিপতির সংখ্যা নেহাত কম না। দুঃখের বিষয় হলো শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে কোটিপতিদের এই বিশাল অর্থপ্রাপ্তি। শ্রমিকেরা মাসশেষে হাড়ভাঙা খাটুনির পরে মনভাঙা মজুরি পান। শ্রমিকের শ্রম শোষণ করে কেন এই অন্যায় আচরণ?

একজন মানুষের সঙ্গে শ্রমের সম্পর্ক অনেক গভীর। সেই শ্রমের সঙ্গে শ্রমিকের সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িত। আবার শ্রমিকের সঙ্গে মজুরি শব্দের যোগাযোগ আরও বেশি দৃঢ়। একজন শ্রমিক নিজের শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপাজন করেন। আর সেই শ্রম দিয়ে নির্ধারণ করা হয় শ্রমিকের মজুরি।

শ্রমিকদের একে তো কম বেতন প্রদান করা হয়। তার মধ্যে প্রাপ্য বেতনভাতা ও বোনাস মালিকপক্ষ পরিশোধ করে না। অনেক সময় দেখা যায়, বেতন-ভাতা বকেয়া রেখে দিনের পর দিন সরকার ও মালিক পক্ষ আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা চালিয়ে যান। মালিক পক্ষের আশ্বাসের বন্যায় ভেসে যায় শ্রমিক পক্ষ। কিন্তু মাসের পর মাস চলে গেলেও সেই আশ্বাস পূরণ হয় না। 

প্রতিবছর মে দিবস আসে আবার মে দিবস চলে যায়। কিন্তু শ্রমিকদের ভাগ্য আর পরিবর্তন হয় না। আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণি জানে না, তার অধিকার কতটুকু? শোষক শ্রেণি শ্রমিকদের তাদের অধিকারের কথা জানতে দেয় না। শ্রমিকশ্রেণি আগেও শোষিত ছিল, আর এখনো একি অবস্থানে আছে। শ্রমিক বলতে শুধু শ্রমজীবী মানুষদের বুঝে থাকেন, তাহলে ভুল করবেন। শ্রমিক মানে শ্রমের বিনিময়ে যাঁরা অর্থ উপার্জন করেন। আমাদের দেশে একেক প্রতিষ্ঠান একেক ধরনের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে। কোনো কোনো অফিসে কর্মঘণ্টা ৬ ঘণ্টা আবার ৮ ঘণ্টাও হয়ে থাকে। মালিকপক্ষ নিজেদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য এই কর্মঘণ্টা ঠিক করে। শ্রমিকদের ভালো–মন্দের বিষয় এখানে নগণ্য থাকে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ থেকে জানা যায়, দেশের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার ২৫ দশমিক ৩৪। ২০২২ সালে এই হার ছিল ২৫ দশমিক ৭৮। এর পাশাপাশি ২০২৩ সালে পুরুষদের অংশগ্রহণের হার ছিল ৪৮ দশমিক ১১ আর ২০২২ সালে ছিল ৪৭ দশমিক ২৭। এতে খুব সহজেই বুঝতে পারা যায়, দেশের শ্রমশক্তিতে নারীদের অবস্থান অনেক কম। নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা অনেক পিছিয়ে থাকব। 

শ্রমিক বলতে নারী–পুরুষ উভয়ইকে বোঝালেও নারী শ্রমিকেরা অনেক বেশি প্রান্তিক অবস্থানে আছেন। নারী শ্রমিকেরা সমান কাজ করেও মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে; যেমন– কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, ইটভাঙার শ্রমিক, চা শ্রমিক হিসেবে নারী শ্রমিকেরা পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করলেও মাসশেষে কম মজুরি পাচ্ছেন।

নারী শ্রমিকেরা সমান কাজ করেও মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ফাইল ছবি গাজীপুরের সেলফ ইউনোভিটিব ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় আয়েশা আক্তার (ছদ্মনাম) সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন। আয়েশার সঙ্গে কাজ করেন পুরুষ শ্রমিকেরা। কিন্তু কারখানার নারী শ্রমিকদের থেকে পুরুষ শ্রমিকদের বেতন ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি। আয়েশা মাস শেষে বেতন পান ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু একই কাজ করে তাঁর চেয়ে বেশি বেতন পাচ্ছেন পুরুষ শ্রমিকেরা। 

আয়েশা আক্তারের মতো আরেকজন পপি বেগম (ছদ্মনাম)। পপি বেগম গার্মেন্টসে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। তাঁর বেতন বেতন ১৪ হাজার ২০০ টাকা। আলী গার্মেন্টসেও নারী শ্রমিকদের থেকে পুরুষ শ্রমিকদের বেতন ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা বেশি। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে আয়েশা, পপির মতো নারী শ্রমিকেরা মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না। আবার নারী শ্রমিক হওয়ার কারণে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হন নানাভাবে। 

কর্মক্ষেত্রে নারীদের অবদানকে ছোট করে দেখা হচ্ছে। অথচ সংবিধানে আছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিককে-এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা’। শ্রমিক, তিনি নারী বা পুরুষ হন না কেন? তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা, সম্মান দেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য আমাদের মন–মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। তা না হলে মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে পড়ব।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘সামগ্রিক অর্থে মে দিবসের চেতনায় যদি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখা হয়. তাহলে অনেকগুলো বিষয় দেখতে হবে। এর মধ্যে মজুরি, কর্মঘণ্টা, সামাজিক নিরাপত্তা, শ্রমিকদের অধিকারের মতো বিষয়গুলো রয়েছে। দেশের শ্রমিকদের আমরা দুভাগে ভাগ করি। এক প্রাতিষ্ঠানিক আর অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক। সমস্ত শ্রমশক্তির মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক হলো ৮০ ভাগের বেশি। এই ৮০ ভাগ শ্রমশক্তি কিন্তু কোনো আইনের সুরক্ষা মধ্যে পড়ে না এবং তাদের জন্য মজুরির কোনো মানদণ্ড নেই। কারণ, বাংলাদেশে জাতীয় নিম্নতম মজুরির মানদণ্ড নেই। যা আছে সেটা সেক্টরভিত্তিক। এ কারণে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের আইনি অধিকার নাই। যার মাধ্যমে তারা সংগঠিত হয়ে নিজেদের অধিকার,দাবি দাওয়া উত্থাপন করতে পারে না। এমনকি তাদের ন্যায্য মজুরির কথা বলতে পারেন না।’

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, শ্রমিকের আয় বৈষম্য কমানোর একটাই পথ। সেটা হচ্ছে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি করা এবং শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করা। শ্রমিকদের সুরক্ষায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। শ্রম আইনকে (নারী–পুরুষ) সর্বজনীন করতে হবে। জাতীয় নিম্নতম মজুরির একটা মানদণ্ড ঠিক করতে কবে, যার নিচে কাউকে মজুরি প্রদান করা যাবে না। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার পরিবেশ প্রস্তুত করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকেরা ঠিকাভিত্তিক কাজ করেন। এতে তাঁরা বৈষম্যের শিকার হন। এ জন্য আইনের সংশোধন প্রয়োজন। নারী শ্রমিকের মজুরি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যেন দিনশেষে কারো মজুরি কম না হয়।

সৌন্দর্যশিল্প খাতের ৯৯ জন উদ্যোক্তার উঠে আসার গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘চলো এগিয়ে যাই’ বই। সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞ এবং উজ্জ্বলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা আফরোজা পারভীনের পরিকল্পনা ও সম্পাদনায়...
বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর সরকারি চাকরিতে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সবশেষ তথ্য বলছে, ৬৪ জেলার মধ্যে ২১ জেলার দায়িত্ব সামাল দিচ্ছেন নারী জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। পাশাপাশি বেড়েছে...
হয়তো আপনার পরিচিত কোনো স্কুলপড়ুয়া মেয়ের ফেসবুক আইডি থেকে অদ্ভুত কিছু বার্তা পেলেন। অবাক হবেন না, হয়তো আপনার পরিচিত সেই মেয়েটি সাইবার অপরাধের নির্মম শিকার। এমন ভুয়া আইডি তৈরি করে বিভিন্নজনকে পাঠানো...
ডা. জুবাইদা রহমান বলেছেন, কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ও মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করে রাষ্ট্রকে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে হবে। নারী উদ্যোক্তা ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর ২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেছেন, বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা পালন করে। শহীদ জিয়া নারীদের ঘর থেকে বের করেছিলেন। তার আগে মেয়েরা ঘরে বন্দি...
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানিতে টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে আগুন লেগে অন্তত ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রায় এক...
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট আকস্মিক পরিদর্শনকালে এক চিকিৎসককে নিজ কক্ষে ধূমপান করতে দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ওই চিকিৎসকের কক্ষও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায়...
আটকের পর মুক্তি পেয়েছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নেহা বোরা। শুক্রবার আটক করার পর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সহিংসতার...
লোডিং...
পঠিত নির্বাচিত

এলাকার খবর