বর্তমানে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে, যেখানে নিজের ঘরের নারীর শ্রমের কোনো স্বীকৃতি নেই। সেখানে ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প কারখানা বা কৃষি জমির মালিক নারীর শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করবে, এই আশা তো দুরাশাই হবে। তবু পেটের দায়ে নারীদের নিজ ঘরে শ্রম দেওয়ার পরে বাইরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করতে হয়।
যারা ঘরের বাইরে কাজ করতে যান, তাদের না থাকে তেমন শিক্ষা, না থাকে কাজের দক্ষতা। কিন্তু এই অশিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিত এবং অদক্ষ নারী শ্রমিকের শ্রমকে পুঁজি করে দেশের আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে অগণিত ক্ষুদ্র শিল্প। আর এসব কারখানার শিল্প মালিকেরা নারী শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করে মুনাফা লুটছে। এর হিসাব কি কেউ রাখছে?
এমন অনেক ক্ষুদ্র শিল্প কারখানার নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে উঠেন তারা। এরপর ঘরের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি রান্নার কাজ শেষ করেন। তারপর বাড়ির সকলের খাওয়ার ব্যবস্থা করে এবং নিজের খাবার পোটলায় বেঁধে সাতটা সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে পড়েন কারখানার উদ্দেশ্যে। আর বাড়ি ফিরেন সেই সন্ধ্যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নন্দনপুর বিসিক শিল্প এলাকায় নামেমাত্র মজুরিতে কাজ করেন অনেক নারী শ্রমিক। মনোয়ারা তাঁদের মধ্যে একজন। গত পনেরো ষোলো বছরে বিভিন্ন কারখানায় করেছেন তিনি। তার মধ্যে আছে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিল, পলিথিন ব্যাগ, জালি ব্যাগ বা ভারী কাপড়ের তৈরি শপিং তৈরির কারখানা। এসব কারখানার মালিকপক্ষ উপযুক্ত মজুরি দেওয়া তো দূরের কথা, তাদের ন্যূনতম মজুরিও দেয় না, যা দিয়ে তাদের দুবেলা পেটভরার খাবার জুটবে। অথচ তাদের শ্রম শোষণ করছে ষোলো আনার জায়গায় বত্রিশ আনা। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা সাতটা পর্যন্ত মানে দশ থেকে এগারো ঘণ্টার ডিউটি করতে হয়। এই ডিউটির মাঝখানে তারা দুপুরে খাওয়ার জন্য বিরতি পান মাত্র বিশ মিনিট। পাছে শ্রমিকেরা ফোনালাপে কাজের সময়ের অপচয় করে, তাই মোবাইল ফোনও সঙ্গে রাখতে দেয় না। আরো কষ্টের বিষয় হচ্ছে, সপ্তাহে তাদের নেই কোনো ছুটির দিন।
অথচ মাস শেষে মজুরি পান মাত্র তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। ধৈর্য ধরে বছরের পর বছর নীরবে খেটে গেলেও কারও কারও মজুরি হয় সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকা। মজুরি বাড়ানোর কথা বললে জবাব একটাই—‘না পোষালে চলে যাও’। কিন্তু টাকার অভাবে অনেকেই চলে যেতে পারে না। তাই না পোষালেও কষ্ট সহ্য করে থেকে যেতে হয়। যাদের সংসারে রোজগার করার লোক থাকে, তাদের কেউ কেউ কাজ ছেড়ে চলে যান। কারণ সারাদিন কারখানায় কাটালে ঘর সংসার অচল হয়ে পড়বে। তাদের পক্ষে এই সামান্য টাকার জন্য দিনের সবটা সময় ব্যয় করা পোষায় না। কিন্তু মনোয়ারার মতো যাদের কোনো সম্বল ও সংসারে রোজগার করার কেউ নেই, তারা কাজ ছেড়ে যেতেও পারেন না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিভিন্ন পাড়া, মহল্লায় মোমবাতি, চানাচুর এবং আচার তৈরির কারখানায় প্রতিদিন তিতাস নদীর ওপার থেকে সকালে দলে দলে তরুণী ও মধ্যবয়স্ক অনেক নারী কাজ করতে আসেন। আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে যান। মোমবাতি, আচার বা চানাচুর যেকোনো কারখানার বেতন সেই তিন থেকে চার হাজার টাকা, বেশি হলে পাঁচ বা ছয় হাজার। তাদের কোনো ছুটির দিন নেই, মজুরি বৃদ্ধির সুযোগ নেই। কত কম দামে শ্রমিক খাটিয়ে মুনাফা লুটে নেওয়া যায়, মালিকপক্ষ শুধু তার হিসাব কষেন। মজুরি বাড়াতে বললে সেই একই কথা—‘না পোষালে চলে যাও’। সংসার চালাতে গেলে চিকিৎসা খরচ, ছেলে–মেয়ের বিয়ে, মেয়ের বিয়ের যৌতুক, বৌ–ঝির ডেলিভারির–সিজারিয়ান অপারেশনের ঋণ আছে। সেইসব ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি আছে। এই কিস্তি পরিশোধের জন্য নিরুপায় হয়ে নারী শ্রমিকেরা তাদের শ্রম, ঘাম আর জীবনের অমূল্য সময় অল্পমূল্যে বিকিয়ে দেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাশেই কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলা শহর শিল্প এলাকা হিসেবে বিখ্যাত। ছোট–বড় অগণিত শিল্প কারখানা ছড়িয়ে রয়েছে ভৈরব পৌর এলাকাসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে। খাদ্যদ্রব্য থেকে জুতা, সাবান, মোমবাতি, আগরবাতিসহ নানারকম সামগ্রী উৎপাদন হয় এসব কারখানায়। এখানেও কমদামে কেনা হয় নারীদের শ্রম। ভৈরবের বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন এমন নারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা সকাল সাতটা থেকে থেকে রাত আটটা বা নয়টা পর্যন্ত বিভিন্ন শিফটে কাজ করেন মাসে চার/পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে। কয়েক বছর কাজে লেগে থাকলে কারও মজুরি ছয় থেকে সাত হাজার টাকা হয়। আবার কিছু কারখানায় ওভারটাইম করলে কিছু টাকা পাওয়া যায় বটে, তবে অধিকাংশ কারখানায় ছুটির দিন থাকে না। এসব কারখানায় নিয়োগপত্রও দেওয়া হয় না। আবার মালিকের বা ম্যানেজারের মুখের কথায়ই চাকরি চলে যায়।
এসব কারখানায় আরও রয়েছে নারী–পুরুষের মজুরি বৈষম্য। ভৈরবের একটি বিস্কুট কারখানায় নারী–পুরুষ উভয়েই কাজ করেন। সেখানে অনেক পুরুষকর্মীদের বেতন নারী কর্মীদের দ্বিগুণ। যেসব কাজে বেতন বেশি, সেসব কাজে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয় না। এমন না যে পুরুষটি অনেক বেশি শিক্ষিত বা দক্ষ, আর নারী সেই কাজ করতে পারবেন না। আসলে নারী শ্রমিককে নারী বলে আরো বেশি শোষণ করা যায়। কারণ এই শোষণের বিরুদ্ধে তারা কোনো প্রতিবাদ করে না।
ইতিহাস বলে, সব কালেই পৃথিবীর সকল দেশেই শ্রমিক শোষণ ছিল। এই শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফলে প্রতি বছর মহান মে দিবস পালিত হয়। কিন্তু পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমিক শোষণ আজও অব্যাহত আছে। আমাদের দেশে সেই শোষণের মাত্রা আরো প্রকট।
তবে বড় বড় শহরে বড় বড় শিল্প কারখানার শ্রমিকগণ সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন সময় তাদের দাবি–দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ করে, সভা- সমাবেশ করে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং এসব খবর মিডিয়ায় শিরোনাম হয়। তাই দেশের মানুষ জানে তাদের বঞ্চনার কথা। কিন্তু মফস্বলে গ্রামে–গঞ্জে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট কারখানায় কর্মরত অগণিত কর্মীরা সংগঠিত হতে পারেন না। মিডিয়াতেও কখনো এদের সমস্যা নিয়ে কোনো খবর হয় না। তাই বছরের পর বছর এসব শ্রমিক মুনাফালোভী কারখানা মালিকদের কাছে স্বল্পমূল্যে তাদের মহামূল্যবান সময় বিকিয়ে দিয়ে দেশের জিডিপিতে অবদান রাখেন। তাদের সেই অবদান ও বঞ্চনার কথা অদৃশ্য থেকে যায়। তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন নেই ? এঁরা কি দেশের নাগরিক নন?