নিভৃতচারী এক নারী ধনকুবেরের গল্প

‘টাকা কামাতে কামাতে একসময় মানুষ এমন পর্যায়ে চলে যায়, যেখানে নিজের বিচারবুদ্ধির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে’, মায়ের কাছ থেকে শোনা এ কথা হয়ত সব সময় মাথায় রাখেন ফ্র্যাঙ্কোয়া বেটেনকোর্ট মেয়ার্স। তাই তো নিজের অর্থকড়ির ব্যাপারে সারাজীবন সতর্ক থেকেছেন।

২০১২ সালে ফরাসি পত্রিকা ল’ মন্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সত্যিটা হলো টাকাপয়সা মানুষকে পাগল করে দেয়!’

বিশ্বের বৃহত্তম প্রসাধন কোম্পানি ল’রিয়েলের উত্তরাধিকারী ফ্র্যাঙ্কোয়াই এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী নারী।

ফোর্বসের রিয়েল টাইম বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় আগেই উঠে এসেছে তাঁর নাম। গত ২৬ সেপ্টেম্বর বহুজাতিক চেইন সুপারশপ ওয়ালমার্টের উত্তরাধিকার অ্যালিস ওয়ালটনকে হটিয়ে আরও একবার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী নারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের বিলিয়নিয়ার সূচক অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফ্র্যাঙ্কোয়া বেটেনকোর্টের মোট সম্পদের পরিমাণ রেকর্ড একশত বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।

বিলাস বৈভবে বেড়ে উঠলেও ফ্র্যাঙ্কোয়ার জীবনযাপনে সে ছাপ কখনো পড়েনি। এটিই তাকে অন্যান্য ধনকুবের বা তাদের উত্তরাধিকারের চাইতে পৃথক করেছে। প্যারিসের প্রাসাদোপম বাড়িতে থেকেছেন তাঁর মা-বাবা। অথচ নিজের জন্য ফ্র্যাঙ্কোয়া বেটেনকোর্ট মেয়ার্স বেছে নিয়েছেন বড় জানালার একটি দুই তলা ভবন।

মায়ের সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কোয়া, স্বভাবে দু’জনে ছিলেন দুই মেরুর। ছবি: সংগৃহীত

১৯০৯ সালে চুল রং করার একটি বিশেষ পণ্য আবিষ্কারের মাধ্যমে ল’রিয়েল প্রতিষ্ঠা করেন ফ্র্যাঙ্কোয়ার নানা ইউজিন শুলার। তাঁর মৃত্যুর পর ল’রিয়েলের হাল ধরেন লিলিয়ান, উত্তরাধিকার সূত্রে যে দায়িত্ব পরে ফ্র্যাঙ্কোয়ার ওপর বর্তায়। তবে অন্য দশজন উচ্চবিত্তের সন্তানের মতো তাঁর শৈশবও আনন্দঘন ছিল না।

২০১৭ সালে মা লিলিয়ান বেটেনকোর্টের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ল’রিয়েলের মালিকানা পান। এর আগে লিলিয়ানই ছিলেন বিশ্বের সব থেকে ধনী নারী।

মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করা হতে পারে এই ভয় থেকে ফ্র্যাঙ্কোয়ার বাবা-মা একটা সময় পর তাকে আর স্কুলে যেতে দেননি। বাড়িতেই পড়ানো হতো। এতে খুব ছোট বয়সেই তাঁর মধ্যে একাকিত্ব পেয়ে বসে। বড় হতে হতে চারুকলার শিক্ষার্থী ফ্র্যাঙ্কোয়া সিদ্ধান্ত নেন, জাঁকজমকে কখনো গা ভাসাবেন না।

মায়ের সঙ্গে আদর্শগত দ্বন্দ্ব ছিল ফ্র্যাঙ্কোয়ার। ‘সোশ্যাল বাটারফ্লাই’ লিলিয়ান বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ডিজাইনার কাপড় পরতে পছন্দ করতেন, অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে সেশেলসে কিনে নিয়েছিলেন একটি গোটা দ্বীপ। কৈশোরে পা দেওয়ার পর মায়ের সঙ্গে নিজেকে গুটিয়ে রাখা ফ্র্যাঙ্কোয়ার সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

ফ্রান্সভিত্তিক কোম্পানি ল’রিয়েল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুতকারী কোম্পানি। এর প্রস্তুতকৃত সুগন্ধি, শ্যাম্পু, বডিলোশন, হেয়ার কালার ও অন্যান্য প্রসাধন সরঞ্জাম বিশ্বের বহু দেশে পাওয়া যায়। অথচ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান স্বত্বাধিকারী একেবারেই জনসমক্ষে আসতে পছন্দ করেন না। সাক্ষাৎকার প্রদানে উৎসাহী নন, দিনের মধ্যে ঘণ্টাতিনেক তাঁর কেটে যায় শুধু পিয়ানো বাজিয়ে। বই পড়তেও ভীষণ ভালোবাসেন তিনি। শুধু তাই নয়, বাইবেল এবং গ্রিক মাইথোলজি নিয়ে দু’টি বইও লিখেছেন তিনি। এর মধ্যে স্টাডি অব বাইবেল বইটি ৫ ভলিউমের।

চিরাচরিত জাম্পস্যুট, শাল আর চশমায় ফ্র্যাঙ্কোয়া। ছবি: সংগৃহীত

ছোটবেলা থেকেই ভালো-মন্দের পার্থক্য করা শিখেছিলেন সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ফ্র্যাঙ্কোয়া। বন্ধু এবং জীবনসঙ্গী বাছাইয়ে সে ছাপও রেখেছেন। ল’এম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কেবল আমার অর্থবিত্তের জন্য আমাকে বিয়ে করতে চাইতো, তাহলে তা নিশ্চয়ই আমার চোখ এড়াত না। আমি আমার জীবনসঙ্গীর জন্য তাই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি।’

মাস দুয়েক আগে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির পুত্র অনন্ত আম্বানির বিয়ের এলাহি খরচ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলো। অন্য সময়ও ধনকুবের আর তারকাদের বিলাসী জীবনযাপন, চলাফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে আলোচনার শেষ থাকে না।

 

অথচ ফ্র্যাঙ্কোয়া বেটেনকোর্ট মেয়ার্স এখানেও আলাদা। ফ্যাশন দুনিয়ার অংশ হয়েও গাঢ় রঙের জাম্পস্যুট, কাশ্মীরি শাহতুষ শাল এবং সত্তর দশকের একটি চশমার ফ্রেমই তাঁর সিগনেচার স্টাইল। পেশাগত যোগ না থাকলে সামাজিক কোনো অনুষ্ঠান বা পার্টিতেও তাকে দেখা যায় না।

বেড়াতে ভালোবাসেন ফ্র্যাঙ্কোয়া। তবে সুইজারল্যান্ডের লাক্সারি রিসোর্টের বদলে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে তুষারে ছেয়ে থাকা নিরিবিলি গ্রাম মেজে’ভ তাঁর বেশি পছন্দ। ফরাসি ভাষায় যাকে বলে, ‘যদি আনন্দে থাকতে চাও, তবে নিভৃতে থাকো।’

তথ্যসূত্র: এল পাইস, ফোর্বস