ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের পশ্চিম কালিমানতাংয়ের একটি জেলা কেটাপাং। এখানেই ফায়ার ফাইটারের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিয়মিত টহলের কাজে বের হন সিতি নুরাইনি। ‘পাওয়ার অব মামা’ নামে জেলার নারীদের নিয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবী দমকল ইউনিটের সমন্বয়ক তিনি। স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্য ও জীবিকা রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০২২ সালে এই স্বেচ্ছাসেবী প্রকল্প গড়ে ওঠে।
ব্রিটিশ বন্যপ্রাণী সুরক্ষা এবং সংরক্ষণে নিয়োজিত অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যানিমাল রেসকিউয়ের ইন্দোনেশিয়ার সহযোগী ‘ইয়াসান ইন্টারন্যাশনাল অ্যানিমেল রেসকিউ ইন্দোনেশিয়া’র (ইয়ারি) একটি প্রকল্প হলো এই ‘পাওয়ার অব মামা’।
বনের পাশেই ছোট কাঠের নীড়ে থাকেন সিতি নুরাইনি। তিনি সানস্ক্রিন হিসেবে চাল আর পোলাও পাতা বেটে মুখে মাখেন। সিতি নুরাইনির ধারণা এটি ব্যবহার না করলে সূর্যের তাপে মুখ পুড়ে যাবে।
একবার এক কৃষকের জমিতে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইয়ারির পরিচালক কারমেল সানচেজ বোর্নিওর প্রথম অল-উইমেন ফায়ার ফাইটিং স্কোয়াড গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। সংগঠনের কর্মীরা সেই কৃষককে আগুন নেভাতে বললেও তিনি রাজি হননি। কিন্তু যখন তাঁর স্ত্রী তাকে অনুরোধ করে আগুন নেভাতে বলেন, তখন ঠিকই সেই কৃষক আগুন নিভাতে রাজি হন।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে নারীদের এই জোরালো ভূমিকা অনুধাবন করতে পেরেই সানচেজ স্বেচ্ছাসেবী দল গঠনের আগ্রহ পান। ইয়ারি এই স্বেচ্ছাসেবী নারীদের আগুন নেভানোর প্রশিক্ষণ, টহলের তত্ত্বাবধান এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।
শুরুতে এই দলে মাত্র ৪৪ জন স্বেচ্ছাসেবক নারী ছিলেন, বর্তমানে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ জনে। ১৯ বছরের তরুণী থেকে শুরু করে ৬০ বছরের নারীও রয়েছেন এই দলে। এদের অধিকাংশই গৃহিণী, তবে সম্প্রতি তরুণ কর্মজীবী নারীদের এখানে যোগ দিতে বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার এই অঞ্চলটি দাবানলপ্রবণ। পাশাপাশি এখানকার বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে পিট ল্যান্ডের উপস্থিতি, যেখানে কার্বন জমা থাকে। পৃথিবীর মাত্র ৩ শতাংশ জমি পিট ল্যান্ড, অথচ সমস্ত বনাঞ্চলে যত কার্বন জমা আছে তাঁর দুইগুণ এখানেই সঞ্চিত।
বিপুল পরিমাণ কার্বনের উপস্থিতির কারণে শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চলে তাই অগ্নিকাণ্ড বা দাবানলের শঙ্কা বেড়ে যায়। এতে বনে থাকা প্রাণীকুল, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং আশেপাশের অঞ্চলে বসবাসকারী জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়ে।
এ বনে কেটাপাংয়ে প্রোবোসিস বা লম্বা-নাকযুক্ত বানর, পিগমি বা বেঁটে হাতি, সূর্য ভালুক, ওরাংওটাংয়ের মতো বৈচিত্র্যময় প্রাণীরা বছরের পর বছর সহাবস্থান করে আসছে। কিন্তু ক্রমাগত বন নষ্ট হওয়ায় এরা এখন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে। দাবানল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা থেকেও ‘পাওয়ার অব মামা’র উদ্ভব।
ফিরে যাই সিতি নুরাইনির ছোট্ট নীড়ে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে ঘুম থেকে ওঠেন এই স্বেচ্ছাসেবী। ভাত রেঁধে, ঘরদোর গুছিয়ে সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যে মোটরবাইকে চেপে বেরিয়ে পড়েন বনের উদ্দেশ্যে। সিতিকে সঙ্গ দিতে থাকেন আরও ছয়জন নারী কর্মী। তাদের সবার পরনে থাকে বাদামি হিজাব, ফুলহাতা পোশাক আর হাঁটু পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের রাবারের জুতা।
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ করা মূল উদ্দেশ্য হলেও দলটির সদস্যরা বহুমুখী কাজে ভূমিকা রেখে চলেছেন। শুষ্ক মৌসুমে তাঁরা প্রতিদিন কেটাপাংয়ের দাবানলপ্রবণ এলাকাগুলো টহল দিয়ে বেড়ান। কোথাও অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা থাকলে তা শনাক্ত করে পূর্ব- সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেন। প্রয়োজনে ড্রোনের ব্যবহারও করে থাকেন তাঁরা।
আগুন লাগার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠের তৈরি বিশেষ ধরনের নৌকা বা ক্যানুতে করে ঘটনাস্থলে পৌঁছান এই নারীরা। বিশেষ ধরনের মেশিনের মাধ্যমে প্রচলিত হোসপাইপ দিয়ে পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানো তাঁরা।
কৃষিতেও অবদান রাখছেন এই দলের সদস্যরা। মাটি বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি সাধন না করেই অর্গানিক উপায়ে কৃষিজ উৎপাদন এবং মাটির গুণগত মান বৃদ্ধিতে কৃষকদের নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন তাঁরা। মাটি যেন অতিরিক্ত অম্লীয় না হয়ে যায় সে বিষয়ে কৃষকদের নজর রাখার পরামর্শ দেন সিতিরা।
জলাবদ্ধতা, দাবদাহ আবার কখনো প্রচণ্ড ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করতে হয় বলে ইতিমধ্যে এসব নারীর বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবু এই অগ্নিযোদ্ধারা থেমে যাননি। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে তাদেরকে ইন্দোনেশিয়ার ‘ক্লিন এয়ার চ্যাম্পিয়নশিপ অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত করা হয়েছে।
পুরো ইন্দোনেশিয়াতেই এখন সিতি নুরানিদের কাজকে প্রশংসার চোখে দেখা হচ্ছে। নারীর প্রতি যে গৎবাঁধা ধারণা ছিল, সেখান থেকে ক্রমশ বেরিয়ে আসছে বিভিন্ন সম্প্রদায়। এই স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা পরিবেশগত সচেতনতার পাশাপাশি তাই দেশটির লৈঙ্গিক বৈষম্য নিরসনেও ভূমিকা রাখছেন।
তথ্যসূত্র: গুড নেচার, বিবিসি


আফগানিস্তান কি নারীদের জন্য কারাগার হয়ে উঠছে?
লৌহমানবী মুনিবা মাজারি
ইরানের কট্টর শাসন যাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি
সেই দীপ্তিই এখন দেশের গর্ব
