নৌপথে প্রথম নারী হিসেবে যিনি পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন

জোয়ান ব্যারেটের। ছবি: সংগৃহীত১৭৪০ সালে জন্ম ফরাসি উদ্ভিদবিদ জোয়ান ব্যারেটের। তিনি প্রথম নারী হিসেবে সাগরপথে পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে অমর হয়ে আছেন।

তবে এই বিশ্বভ্রমণ তাঁকে করতে হয়েছিল পুরুষের ছদ্মবেশে! বিশ্বময় ঘুরে ছয় হাজারেরও বেশি উদ্ভিদের নমুনার নমুনা সংগ্রহ করে ফ্রান্সে নিয়ে যান তিনি।

ফ্রান্সের ছোট এক গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারে জোয়ানের জন্ম। কৃষক-শ্রমিকের মেয়ে হিসেবে জোয়ান ব্যারেটের জীবনটা হতে পারত চরম দারিদ্র্যপূর্ণ। যে সমাজে তাঁর বেড়ে ওঠা সেখানে নারীদের জন্য সাক্ষরতা এবং আয়ুষ্কাল উভয়ের হারও ছিল কম।

কিন্তু ১৭৬০ সালের দিকে জোয়ানের জীবনে আসেন ইতিহাসবিদ এবং বিজ্ঞানী ফিলিবার্ট কমার্সন। দুইজনের সামাজিক অবস্থান ছিল একেবারেই আলাদা। যাদের কখনো দেখাই হওয়ার কথা নয়, এমন দু’টি মানুষক কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল উদ্ভিদপ্রীতি।

‘ভেষজ নারী’ হিসাবে স্থানীয়ভাবে জোয়ান নিজের আলাদা পরিচিত গড়ে তুলেছিলেন। বিভিন্ন ধরণের ভেষজ উদ্ভিদের অবস্থান, বৈশিষ্ট্য এবং ব্যবহার সম্পর্কে দারুণ জ্ঞান রাখতেন তিনি।

এসব উদ্ভিদের খোঁজে তৎকালীন ডাক্তার, শল্যবিদ, শিক্ষাবিদ এবং রসায়নবিদরা তখন জোয়ানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

পুরুষের সাজে বিশ্বভ্রমণ

১৭৬৬ সালে তিন বছরের জন্য ফিলিবার্ট কমার্সনকে একটি জাহাজের ‘এক্সপিডিশন বোটানিস্ট’ হিসেবে কাজ করার আমন্ত্রণ জানানো হয়। ততোদিনে জোয়ান ব্যারেটের সঙ্গে ফিলিবার্টের একটি রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

পাশাপাশি জোয়ান ছিলেন লেগ আলসারে ভোগা ফিলিবার্টের নার্স এবং বৈজ্ঞানিক সহকারী। ফিলিবার্ট তাঁর এই ভ্রমণে তাই তাকেও নিতে চাইলেন।

কিন্তু ফরাসি নৌবাহিনীতে নারীদের পদচারণ তখন নিষিদ্ধ। জাহাজের নাবিক হিসেবে নারীদের মেনে নেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।

দু’জনে মিলে তাই একটা বুদ্ধি আঁটলেন। জাহাজে উঠবেন জোয়ান, তবে নারী নয়, পুরুষের বেশে! জোয়ানের তখন পরিচয় হলো ‘জিন’।

আঠারশ শতকে একটি পুরুষবেষ্টিত জাহাজে সমুদ্রের মধ্যে জোয়ানকে কত রকম বিব্রতকর ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে সেটি হয়তো আমরা ভাবতেও পারবো না!

১৭৬৭ সালের জুনে তাঁদের বহনকারী জাহাজটি ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর একটি বন্দরে ভিড়ে। সেখানে তাঁদের সাক্ষাৎ হয় অভিযানের দ্বিতীয় নৌযানের ক্রুদের সঙ্গে।

এই নৌযানের নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাডমিরাল লুই অ্যান্টোইন ডি বোগেনভিল। এখান থেকে জোয়ান এবং ফিলিবার্টের মূল কাজ শুরু হয়। প্রতিদিন নতুন নতুন পাথর, শেলস আর উদ্ভিদ প্রজাতি চষে বেড়াতেন এই জুটি।

তাদের অনুসন্ধানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান বাগানবিলাস। আমাদের অনেকেরই ভীষণ পছন্দের এই ফুলটির ইংরেজি নাম (বোগেনভিলিয়া)। তাঁদের নৌযানের প্রধান নাবিক অ্যান্টোইন ডি বোগেনভিলের নামেই রাখা।

জোয়ানের এই অভিযানে সঙ্গী হিসেবে ছিল তিন শতাধিক পুরুষ। একসময় তাঁর ছদ্মবেশ ধরেও ফেলে এরা, কিন্তু সেজন্য জোয়ানের বিশ্বভ্রমণ থেমে যায়নি। বরং বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে শক্তি এবং সাহস প্রদর্শনের জন্য জাহাজের ক্রুদের কাছ থেকে দারুণ সম্মান লাভ করেন তিনি।

ফ্রান্সে ফেরার পর তিনি সরকারিভাবে সম্মানিত হন। এ ছাড়া জোয়ানকে দেওয়া হয়েছিল বার্ষিক পেনশন।

দুঃসাহসী অভিযাত্রীদের প্রসঙ্গ উঠলে পুরুষ অভিযাত্রীদের তুলনায় নারীদের নাম কমই আসে। জোয়ান ব্যারেটও বিস্মৃত ছিলেন বহু বছর। পুরুষের ছদ্মবেশ এবং জাহাজের সঙ্গে জড়িত নানা চটকদার গল্পের আড়ালে বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের কথা ঢাকাই পড়ে ছিল।

অবশেষে ২০১২ সালে নাইটশেডের একটি প্রজাতির নামকরণ তাঁর নামে করা হয়। পাশাপাশি ২০১৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন তার সম্মানে প্লুটোর একটি পর্বতশ্রেণীর নামকরণ করেছে।

তথ্যসূত্র: রয়্যাল মিউজিয়ামস গ্রীনিচ